পুকুরের জল ও মাটির রাসায়নিক অবস্থা এবং সার প্রয়োগ

পুকুরের জল ও মাটির রাসায়নিক অবস্থা এবং সার প্রয়োগ

জলের pH ক্রম

দ্রবীভূত গ্যাসসমূহ

পুকুরের জলে দ্রবীভূত

অন্যান্য গ্যাসসমূহ

দ্রবীভূত অক্সিজেন

মাটি

দ্রবীভূত কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড

সার প্রয়োগ

মাটি-ক্ষারত্ব বা টোটাল

কালিনিটি

মাটির পুষ্টিকর পদার্থের ভিত্তিতেসার প্রয়োগ বিধি

   

পুকুরের জল ও মাটির রাসায়নিক অবস্থা এবং সার প্রয়োগ

পুকুরের জলের রাসায়নিক পরিচয়- ২ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস এবং ১ভাগ অক্সিজেন গ্যাস মিলে জল

জলে কতিপয় গ্যাস এবং কঠিন পদার্থ দ্রবীভূত থাকে এই উপাদানগুলির জন্য অবিশুদ্ধ কিন্তু জলে কিছু গ্যাস দ্রবীভূত থাকে তা মাছের পক্ষে শুধু অপরিহার্য নয়, এই দ্রবীভূত গ্যাসের কম বেশীর উপর মাছের মরা বাঁচা এবং বড় হওয়া একান্তভাবে নির্ভরশীল জলে কঠিন পদার্থ দ্রবীভূত হয়ে জলের উত্পাদন শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে

দ্রবীভূত গ্যাসসমূহ

জলে যে সমস্ত গ্যাস দ্রবীভূত থাকে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী দরকারী অক্সিজেন এই অক্সিজেনের জন্য জলে রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে পুঁটি মাছ পর্যন্ত বাঁচতে পারে অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র থাকায় জিওল মাছ বাতাস থেকেও শ্বাসকার্য করতে পারে

দ্রবীভূত অক্সিজেন

জলের উপরিভাগ বায়ু দ্বারা আলোড়িত হয় জলে অক্সিজেন বায়ু থেকে দ্রবীভূত হয় জলজ উদ্ভিদের ক্লোরোফিল নামক সবুজ রঙ আছে এই ক্লোরোফিল জলে দ্রবীভূত কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড ও আলোর শক্তি থেকে শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যবস্তু তৈরী করে  উদ্ভিদের খাদ্যবস্তু তৈরী করাকে ফটোসিনথেসিস বলা হয় দিনে জলজ উদ্ভিদ কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে রাত্রিবেলায় ঠিক বিপরীত জলে উদ্ভিদ বেশী কিংবা জলজ উদ্ভিদ পচলে, অক্সিজেন কম হতে পারে পুকুরে বেশী জৈব সার দিলে অক্সিজেন কম হয় কারণ পচণ ক্রিয়ার দহনের জন্য অক্সিজেন ব্যয় হয় উত্পাদনক্ষম জলে ৫-১০ পি.পি.এম বা প্রতি লিটার ৫-১০ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত থাকে

দ্রবীভূত কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড

কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড পুকুরের জলে সহজেই দ্রবীভূত হয় মাছ চাষের পুকুরের জলে কাবর্ন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান অতি সামান্য মাত্রার অধিক ক্ষতিকর কাবর্ন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান বেশী থাকলে মাছের শ্বাস গ্রহনের অসুবিধা হয় জলে কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড দ্রবীভূত হয় :

১) বায়ু মন্ডল

) জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর শ্বসন ক্রিয়া

৩) পুকুরের তলদেশের জৈব পদার্থের ব্যাকটেরিয়া ঘটিত পচনক্রিয়া 

৪) ভূমির জল ধারা থেকে বৃষ্টির প্রতি লিটার জলে প্রায় ০.৩ মি.গ্রা.-০.৬ মি.গ্রা. কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড পাওয়া যায় মাছ চাষের পুকুরে প্রতি লিটার জলে ৬মিলিগ্রাম এর বেশী কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড না থাকলে ভাল হয়কাবর্ন ডাই-অক্সাইড বিভিন্নভাবে কমতে পারে যেমন :

১) সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায়

২) পুকুরে জলে আলোড়নের মাধ্যমে 

৩) জলের তলদেশ থেকে বুদবুদ উঠলেও কাবর্ন ডাই-অক্সাইড কমে   

সুতরাং মাছ চাষের ক্ষেত্রে জলে কাবর্ন ডাই-অক্সাইড অল্প থাকলে শুভ নইলে অশুভ

মাটি-ক্ষারত্ব বা টোটাল  আলক্যালিনিটি

পুকুরের জলের লক্যালিনিটি নির্দ্ধারিত হয় জলে উপস্থিত মোট হাইড্রোক্সাইড, কাবর্নেট এবং বাই কাবর্নেট পদার্থগুলি থেকে লক্যালিনিটি কম হলে বুঝতে হবে পুকুরের উত্পাদন শক্তি কম নূতন কাটা পুকুরে লক্যালিনিটি কম হয় উত্পাদনক্ষম পুকুরের জলের মোট লক্যালিনিটি ৭৫ হতে ১৫০ পি.পি.এম হয়

জলের pH ক্রম

পুকুরের জলের pH ক্রম জানতে পারলে, পুকুরে মাছ চাষের অবস্থা জানতে পারা যায় জল সিডও নয়, ক্ষারও নয়, জল প্রসম H+ আয়ন এবং OH- আয়নের গাঢ়ত্ব সমান যে দ্রবণে H+ আয়ন বেশী তা সিডিক্ তেমনি OH-  আয়ন হইলে ক্ষারীয় পুকুরের জলে দুই আয়ন সমান নয় ও pH সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয় ১-১৪ পর্যন্ত বিশুদ্ধ জল প্রসম অর্থাত pH 7.0 সিডিক দ্রবণের pH 7.0 এর কম এবং ক্ষারীয় pH 7.0-এর বেশী হবে  সাধারণত উত্পাদনক্ষম জলের pH ক্রম ৭.৫ হতে ৮.০

পুকুরের জলে দ্রবীভূত অন্যান্য গ্যাসসমূহ

বাতাস থেকে মিশ্রিত নাইট্রোজেন সাধারণত তিন অবস্থায় থাকে

উত্পাদকতা নির্ভর করে জলে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণের উপর অজৈব পদার্থ-নাইট্রোজেন ও তার যোগ জলে নাইট্রোজেন নাইট্রেট, নাইট্রাইট হিসাবে দ্রবীভূত থাকে জলে উত্পাদনক্ষম নাইট্রেটের পরিমান থাকে ০.২-০.৫ পি.পি,এম পুকুরের উত্পাদন শক্তি বজায় রাখার জন্য ফসফরাস অবশ্যই দরকার এটা ফসফেটরূপে নির্ধারণ করা যায় ফসফেটের জন্য ফাইটোপ্লাংটন প্রচুর জন্মায় সাধারণত উত্পাদনক্ষম জলে ০.২-০.৫ পি.পি.এম ফসফেট থাকে

জলে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ আরও থাকে, যেমন- ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, সিলিকা এবং লোহা

মাটি

পুকুরের তলাকার মাটি জলের নীচে থাকার জন্য বায়ু কম থাকে পুকুরের চারপাশের জমির জল এবং পুকুরের প্রাণী উদ্ভিদ মরে তলায় সঞ্চিত হবার জন্য পুকুরের তলায় জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায়

পুকুরের তলায় নরম এবং কালো কাদা মাটি থাকলে পুকুরের উত্পাদন ভাল হয় বালী এবং কাঁকর বেশী থাকলে ভাল হয় না

মাটি বিভিন্ন প্রকার যেমন, বালি, পলি, অতি সূক্ষ্ম এঁটেল কাদা

মাটির pH ক্রম এবং জলের pH ক্রম জানা থাকলে মাছ চাষের সুবিধা হয় মাটির pH ক্রম কম থাকলে চূণ প্রয়োগ করতে হয় মাটিতে ৬.৫-৭.৫ pH   থাকলে ফলন ভাল হয়

ফসফেটস্- পুকুরের তলায় সামান্য ফসফেটস্ থাকলে ভাল হয় ফসফেটস্ ব্যবহার যোগ্য হওয়া চাই ব্যবহার যোগ্য ফসফেটস্ এর সাথে পুকুরে মাছের উত্পাদনের যোগ আছে প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ৬.১৬ মিলিগ্রাম প্রাপ্তিযোগ ফসফরাস থাকলে মাছ চাষ ভাল হয়

নাইট্রোজেন - পুকুরের তলার মাটিতে অতি সামান্য নাইট্রোজেন দরকার তলাকার মাটিতে যে জৈব পদার্থ থাকে তা জীবাণুরা ভেঙ্গে দিয়ে এমোনিয়া নাইট্রোজেন তৈরী করে এমোনিয়া থেকে নাইট্রেট নাইট্রোজেন হয় ব্যবহার যোগ্য নাইট্রোজেন বেশী থাকলে মাছের উত্পাদন ভাল হয় প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ৩০-৫০ মিলিগ্রাম প্রাপ্তিযোগ্য নাইট্রোজেন থাকলে ফলন ভাল হয়

পটাসিয়াম- পুকুরের মাটির পটাসিয়ামের জন্য জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি বিশেষ করে নিমজ্জমান উদ্ভিদের বৃদ্ধি দ্রুত হয় মাছ চাষের পুকুরে পটাসিয়াম ছড়াবার দরকার হয় না

সার প্রয়োগ

পুকুরে মাছের স্বাভাবিক খাদ্য বা প্রাকৃতিক খাদ্য কিভাবে তৈরী হয় জানা দরকার অবশ্য বাইরে থেকে খাবার দিয়ে পুকুরে মাছের খাদ্য যোগানো হয়, জলে অজৈব পুষ্টিকর উপাদান অতি, সামান্য মাত্রায় দ্রবীভূত থাকে সূর্যের আলো উত্তাপ যোগায়, আবহ মন্ডল থেকে গ্যাস এই শক্তিসমূহ জলে খাদ্য উত্পাদনের সাহায্য করে ক্লোরোফিল, ফাইটোপ্লাংকটন এবং সবুজ জলজ উদ্ভিদ ও জলের জীবাণু জলজ প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ করে জলের জীব ও উদ্ভিদ মরে জলে পুষ্টিকর উপাদান দ্রবীভূত করে এবং কিছু অবশিষ্টাংশ জমে থেকে জলে সরল খাদ্য থেকে ক্রমে উচ্চতর খাদ্য তৈরী হয়  আবার জীবাণুর সাহায্যে সরল খাদ্য তৈরী হয়

পুকুরে উত্পাদন শক্তি সহজে বুঝতে পারা যায় না নানারকম পরীক্ষায় উত্পাদন শক্তি জানা যায় যেমন-পুকুরের গভীরতা, জলজ-উদ্ভিদ প্লাংকটনের পরিমাণ, ক্লোরোফিলের পরিমাণ, তলদেশে ক্ষুদ্র প্রাণী ইত্যাদি

কিন্তু মাছ চাষে প্রাকৃতিক খাদ্যের উপর নির্ভর করা ঠিক নয় সেজন্য সার প্রয়োগ করা দরকার সার প্রয়োগে উত্পাদন শক্তি আরও বৃদ্ধি পায় সারের প্রয়োগে মাছের ফলন অধিকতর হয়

সার দুই প্রকাররাসায়নিক ও জৈব সার

জৈব সার- প্রধান জৈব সার হচ্ছে গোবর এবং মহুয়া খৈল জৈব সারগুলি বেশীর ভাগ নাইট্রোজেন জাতীয় সার গোবর জীবাণুর সাহায্যে পচিয়ে গোবরের নাইট্রোজেন ফসফরাস পটাশ জলে মিশিয়ে প্লাংটন বৃদ্ধির সহায়ক হয় গোবর পুকুর পাড়ে গর্ত করে জমিয়ে তারপর নালার সঙ্গে পুকুরে যোগ করে দেওয়া যায়

পুকুরের কোণায় বাঁশের বেড়া দিয়ে অল্প জায়গায় গোবর জমিয়ে রাখলে পর্যায়ক্রমে পুকুরের জলে গোবর মিশে যায় তাছাড়া, মাছ চাষের পরিমাণ মত গোবর ব্যবহার করা যায় মহুয়া, সরিষার খৈল জৈব সার হিসাবে ব্যবহার হয় সরিষার খৈল সার হিসাবে এবং মাছের খাবার হিসাবে ব্যবহার হয় মহুয়া খৈল প্রথমে বিষ এবং পরে সার হিসাবে সাহায্য করে মহুয়া খৈলে পুকুরের উত্পাদন শক্তি বাড়ে

সবুজ সার- শুকনো পুকুরে ধনচা চাষ করে, পুকুরে জল ভর্তি হয়ার পর ঐ ধনচাগুলি পচে এবং জলে সার তৈরী হয়

কম্পোষ্ট সার- গাছের পাতা, পুকুরের জলজ উদ্ভিদ, গোবর, খৈল ইত্যাদি পচে যে সার হয় তাহা কম্পোষ্ট সার

৩০ দিন হতে ৪৫ দিন একটি ছোট গর্তে রেখে মাঝে মাঝে জল দিতে হয়

গোবর- ৫০% , সবুজ পাতা বা জলজ উদ্ভিদ-৫% , সরিষার খৈল-১৫% , চূণ-৫% , সুপার ফসফেট- ৫% কম্পোষ্ট সার ব্যবহার করার পরিমাণ-১০০০-১৫০০ কে.জি./হেক্টর

রাসায়নিক সার – রাসায়নিক সারের মধ্যে মোনিয়াম

সালফেট, ইউরিয়া এবং সুপার ফসফেট (সিঙ্গল) মাছ

চাষে সাধরণত ব্যবহার হয়ে থাকে এই রাসায়নিক সার বিশেষ করে নিবিড় মিশ্র মাছ চাষে ব্যবহার হয়ে থাকে

রাসায়নিক সারের ব্যবহারে জল সবুজ হয়ে যায়

রাসায়নিক সার ব্যবহারের আগে বা সাথে চূণ দেওয়া

অবশ্য কর্তব্য চূণ প্রয়োগে পুকুরের স্বাভাবিক উত্পাদন

শক্তি বেড়ে যায় এবং বহুবিধ দোষ মুক্ত হয়

মাটির পুষ্টিকর পদার্থের ভিত্তিতে সার প্রয়োগ বিধি

 

পুকুরের প্রকৃতি

মাটির অবস্থা

সারের

পরিমান

(কি.গ্রা./হে.

/বছর)

পি.

এইচ.

জৈব কাবর্ন

%

প্রাপ্ত পুষ্টিকর

পদার্থ 

মিগ্রা /১০০গ্রা মাটিতে

কম উত্পাদন

শীল

৫.৫

এর

কম

০.৫

এর কম

নাইট্রোজেন

২৫এর কম,

P2O5

(ফসফরাস পেন্টাক্সাইড)

৩এর কম

ক্যালসিয়াম নাইট্রেট-৫০০-৬৫০

অথবা ইউরিয়া-২২৫-২৯০

সিঙ্গল সুপার ফসফেট-৩১৫-৪০৫ অথবা

ট্রিপল সুপার ফসফেট-১১০-১৪৫

রক ফসফেট-৩০০-৪০০

গোবর-১০০০০-১২০০০

অথবা গোবর

গ্যাসস্লারী-২০০০০-৩০০০০

মধ্যম

উত্পাদন

শীল

৫.৫-৬.৫

০.৫-১.৫

নাইট্রোজেন ২৫-৫০,  P2O5

(ফসফরাস পেন্টাক্সাইড) ৩-৬

ক্যালসিয়াম নাইট্রেট-৩৫০-৫০০

অথবা ইউরিয়া-১৫৬-২২৫

সিঙ্গল সুপার ফসফেট- ২১৯-৩১৫ অথবা

ট্রিপল সুপার ফসফেট- ৭৫-১১০

গোবর-৮০০০-১০০০০ অথবা

গোবর গ্যাসস্লারী-১৬০০০- ২০০০০

উচ্চ

উত্পাদন

শীল

৬.৫-৭.৫

১.৫-২.০

নাইট্রোজেন-৫০এর বেশী, P2O5

(ফসফরাস পেন্টাক্সাইড) ৬এর বেশী

ইউরিয়া-১১২-১৫৬ অথবা

ক্যালসিয়াম  সালফেট-২২৫-৩৩০

সিঙ্গল সুপার ফসফেট- ১৫৬-২১৯ অথবা

ট্রিপল সুপার ফসফেট-৫৪-৭৬

গোবর-৪০০০-৫০০০ অথবা

গোবর গ্যাসস্লারী-১০০০০- ১৬০০০