পশ্চিমবঙ্গের লুপ্তপ্রায় মাছ ও তাদের সংরক্ষণের
প্রয়োজনীয়তা |
লুপ্তপ্রায় মাছ বলতে বুঝবো সেই মাছ যাদের
সংখ্যা আমাদের এই প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস
পাচ্ছে׀ |
ভৌত অথবা জৈব এই দুটির যে কোন এক পরিবেশগত কারণে ঘটতে পারে
মাছেদের প্রায় অবলুপ্তি, পরিবেশগত কারণে বিভিন্ন মত্স্যপ্রজাতি যে একই হারে
লুপ্ত হবে - এমনও নয়׀ বিভিন্ন কারণের ওপর এটা নির্ভর করে,
যেমন |
একটি প্রজাতির মাছের মোট সংখ্যা, তাঁর অবয়ব, পৃথিবীর
বিভিন্ন অঞ্চলে মাছটির সহজলভ্যতা, প্রজনন ক্ষমতা, অন্য প্রজাতির মাছের সাথে
পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীন ঘটিত চারিত্রিক বৈশিষ্টসমূহ׀ |
সাধারণত অবলুপ্তির কারণগুলি নিম্নরূপ |
১) মনুষ্যসৃষ্ট কারণ - (ক) পরিবেশগত আশ্রয়স্থলে ভৌত,
রাসায়নিক ও জৈব পরিবর্তন׀ |
(খ) প্রজননক্ষম মাছেদের নির্বিচারে হত্যা׀ |
(গ) মাত্রাতিরিক্ত মত্স্য শিকার׀ |
(ঘ) নগরায়ন׀ |
২) প্রাকৃতিক কারণ - (ক) প্রাকৃতিক কারণে পরিবেশগত
আশ্রয়ের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব পরির্বতন׀ |
(খ) রোগের প্রাদুর্ভাব׀ |
ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম সম্রাট অশোকের সময়ে (২৪৬ খ্রীষ্টপূর্ব)
মাছেদের সংরক্ষণের কথা ভাবা হয়׀ এমন কি বছরের একটি নির্ধারিত ঋতুতে মত্স্য
শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারী ছিল׀ |
ভারতীয় বন্যপ্রানী আইনের (১৯৭২) আওতায় অনেকগুলি জাতীয় পার্ক
ও অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়׀ এগুলি মূলত পাখি ও বন্যপ্রানীদের সংরক্ষণের কথা
ভেবেই গড়ে ওঠে׀ এই আইনে মাছেদের সংরক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত হয়নি׀ যে
আন্তর্জাতিক সংস্থাটি প্রানীকূল ও উদ্ভিদের সংরক্ষণ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে
তার নাম হল International
Union For Conservation of Nature and Natural Resources (IUCN)
এই সংস্থাটি লুপ্তপ্রায় প্রানীদের যে তালিকা প্রনয়ন করে তা
নিম্নরূপ |
৫৫০ |
প্রজাতির |
স্তন্যপায়ী |
১০৭৮ |
প্রজাতির |
পাখি |
১৮০ |
প্রজাতির |
সরিসৃপ |
৫৪ |
প্রজাতির |
উভচর |
৫৯৬ |
প্রজাতির |
মাছ |
২১২৫ |
প্রজাতির |
অমেরুদন্ডী | |
এছাড়াও IUCN (1990)
লাল তথ্যপুস্তকে আরো ৫১০টি প্রজাতির মাছকে চিহ্নিত করেছেন যাদের স্থিতিও
সংকটাপন্ন׀ কেবলমাত্র দুইটি প্রজাতির ভারতীয় মাছ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে׀
কিন্তু IUCN রিপোর্ট থেকে এটা পরিস্কার যে ভারতবর্ষে লুপ্তপ্রায় মাছেদের কোন
তথ্য ও পরিসংখ্যান আদপেই নেই׀ কিন্তু লুপ্তপ্রায় মত্স্য সংক্রান্ত এই ধরণের
তথ্যের সংকলন একান্ত জরুরী׀ পাখি ও স্তন্যপায়ীদের সম্পর্কে তথ্য এবং তাদের
অবলুপ্তির কারণ যত সহজে জানা যায়, তত সহজে কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির মাছ
বিশেষত ছোট মাছের তথ্য জানা যায় না׀ এই কাজের জন্যে প্রয়োজন প্রচন্ড প্রয়াস,
সুদক্ষ জনবল, অর্থ এবং উন্নত যন্ত্রপাতির׀ লুপ্ত প্রায় মাছেদের তালিকা
প্রনয়ণে সবিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা একান্ত জরুরী׀ |
ভারতবর্ষে, জুলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ডঃ.এ.জি.কে. মেনন
এবং ন্যাশানাল ব্যুরো অব ফিশ জেনেটিক রিসোর্সেস এর বিজ্ঞানীরা সক্রিয়ভাবে
লুপ্তপ্রায় মাছেদের তালিকা প্রনয়ন করেন׀ |
বিজ্ঞানীদের পারস্পরিক আলোচনা, পুস্তক, পত্র পত্রিকার
পর্যালোচনা এবং ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ন্যাশানাল ব্যুরো অব
ফিশ জেনেটিক রিসোর্সের লক্ষৌ, একটি তালিকা প্রনয়ণ করেন যাতে স্থান পেয়েছে
ভারতবর্ষের ঠান্ডা ও ঈষতউষ্ণ জলের লুপ্তপ্রায় মত্স্য প্রজাতিরা׀ তারপর থেকে
ভারতীয় মত্স্য বিশেষজ্ঞেরা আরো কিছু এই ধরণের তালিকা প্রনয়ণ করেন׀ এযাবত
কৃতকাজের ওপর নির্ভর করে পুন্নাইয়া (১৯৯৩) ৭৮ ধরণের ভারতীয় লুপ্তপ্রায় মাছের
একটি তালিকা প্রকাশ করেন সেখানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে এই সব মাছেদের
বসবাস׀ লুপ্তপ্রায় মাছেদের রক্ষাকল্পে বিগত তিন যুগ ধরে অনেক সেমিনার
কর্মশালা, আলোচনা সভা ইত্যাদি সংগঠিত হয়েছে কিন্তু তাতে ফল লাভ হয়েছে
সামান্যই׀ |
যে সব লুপ্তপ্রায় মত্স্য প্রজাতি চিরকালের জন্যে হারিয়ে
যেতে বসেছে তাদেরকে পাঁচটি প্রকারে ভাগ করা হয়েছে׀ |
১) অবলুপ্ত - যে সমস্ত মাছ বিগত ৫০ বছর ধরে একেবারেই দেখা
যাচ্ছে না׀ |
২) লুপ্তপ্রায় - অবলুপ্তির কারণগুলি যদি জারি থাকে, তাহলে
যে সমস্ত মাছ অচিরেই চিরকালের |
জন্য হারিয়ে যাবে׀ |
৩) বিরল - যে সমস্ত মাছের মোট সংখ্যা খুবই নগন্য এখনও
লুপ্তপ্রায় নয়, কিন্তু বিপদাপন্ন׀ |
৪) ক্ষয়িষ্ণু - যে সমস্ত মাছের সংখ্যা কমছে কিন্তু এখনও
সংকটাপন্ন নয়׀ |
৫) অনির্দিষ্ট - যে সমস্ত মাছেরা উপরের কোন বিভাগেই
অন্তর্ভূক্ত নয় যেহেতু যথেষ্ট তথ্যের |
অভাব রয়েছে׀ |
পুন্নাইয়া (১৯৯৩) অনুযায়ী, যে সমস্ত মাছ বিভিন্নভাবে
বিপদাপন্ন, বিভিন্ন ধরণের জলাশয়ে তাদের মোট প্রজাতি সংখ্যা
নিম্নরূপ |
পরিবেশগত জলীয় পিরিস্থিতি |
মোট সংখ্যক মত্স্য প্রজাতি |
অবলুপ্ত |
লুপ্তপ্রায় |
বিরল |
ক্ষয়িষ্ণু |
অনির্দিষ্ট |
ঈষতউষ্ণ জল |
৫৪৪ |
- |
৩ |
২ |
১৩ |
২৮ |
ঠান্ডা জল |
৭৩ |
১ |
- |
- |
৪ |
১২ |
মিঠে নোনা জল |
১৪৩ |
- |
- |
- |
২ |
৪ |
সামুদ্রিক |
১৪৪০ |
- |
- |
- |
১ |
৮ |
মোট |
২২০০ |
১ |
৩ |
২ |
২০ |
৫২ | |
ওপরের সরণি থেকে দেখা যায়, ভারতবর্ষের ২২০০ মত্স্য প্রজাতি
মধ্যে ২৫টি বিভিন্নভাবে বিপদাপন্ন হয়ে অবলুপ্তিপ্রবন এবং ১টি প্রজাতি
ইতিমধ্যেই অবলুপ্ত׀ হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গকে
ঘিরে আছে বিভিন্ন ধরণের মত্স্য সংকুল জলাশয়׀ তার মধ্যে আছে ১,৭২,৫৮৬.৩৬ হেঃ
নদী, ৮০,০৮৫.৭১ হেঃ নালা, ৪১,৭৮১.৬৫ হেঃ বিল, বাত্তর, ১৬,৭৩৮.৮ হেঃ জলাধার,
২৭৬,২০১,৯০ হেঃ পুকুর, ডোবা এবং ৪,০৮৩ হেঃ ময়লাজলের ফিসারী, মিঠে নোনা
জলাশয়ের পরিমান ২,১০,০০০ হেঃ এবং উপকূল রেখা ১৫৭ কি.মি. পর্যন্ত
বিস্তৃত׀
এত বিশাল উত্স্য এবং এত অসংখ্য মত্স্য প্রজাতি থাকার ফলে
লুপ্তপ্রায় মাছেদের সনাক্তকরণ ভীষণ কঠিন কাজ׀ ১৯৯১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ
সরকারের মত্স্যদপ্তর এই সনাক্তকরণের কাজ শুরু করেছেন এবং ১৯৯৮ সালে ৩৯
ধরনের লুপ্তপ্রায় মাছেদের তালিকা প্রনয়ণ করেছেন׀
এই তালিকা প্রতিটি জেলা মত্স্যদপ্তরে প্রেরণ করে দেওয়া
হয়েছে যাতে এই বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ হয়׀ ৩৯টি প্রজাতির লুপ্তপ্রায় মাছেদের
তালিকা নিচে দেওয়া হল- |
পশ্চিমবঙ্গের লুপ্তপ্রায় মাছের তালিকা (১৯৯৮)
মিষ্টি জলের মাছ- |
১) ওম্পক পাবদা (পাবদা) |
২) আইলা কোয়লা |
৩) আঙগুইলা বেঙ্গালেনসিস |
৪) বাগারিয়াস বাগারিয়াস |
৫) ইউট্রোপিকথিস ভাচা |
৬) ওমপক বাইমাকুলেটাস |
৭) পুনটিয়াস সারানা (সর পুঁটি) |
৮) সেমিপ্লোটাস সেমিপ্লোটাস |
৯) অসফ্রোনেমাস নোবিলাস |
১০) আনবাস টেসটুডিনিয়াস (কই) |
১১) নটপটেরাস চিতলা (চিতল) |
১২) নটপটেরাস নটপটেরাস (ফলুই) |
১৩) পাঙ্গাসিয়াস পাঙ্গাসিয়াস (পাঙাস) |
১৪) বালিটোবা ব্রুসেল |
১৫) গুডাসিয়া চাপরা |
১৬) লেবিও ফিমব্রটাস |
১৭) লেবিও পোনিয়াস |
১৮) মেস্টাসেমবিলাস আরমেটাস |
১৯) মিস্টাস টেংরা (ট্যাংরা) |
২০) মিস্টাস তাওর (আড়) |
২১) রাসবোরা রাসবোরা |
২২) সেটিপিনা ফেসা (ফেঁসা) |
২৩) বেনগালা এলানগা |
২৪) ওলাগা আটু (বোয়াল) |
২৫) নান্ডাস নান্ডাস (রয়না) |
২৬) আমবিফেরানগডন মোলা
(মরুলা) | |
ঠান্ডা জলের মাছ- |
২৭) টর পুটি টোরা |
২৮) টর টর |
২৯) লেবিও ডাইসিলাস |
৩০) ব্যারিলাস বোলা |
৩১) ব্যারিলাস
ভাগরা | |
নোনা জল ও সামুদ্রিক মাছ- |
৩২) ল্যাটেস ক্যালক্যারিফার (ভেটকি) |
৩৩) ওডোনট্যামব্লিওপাস রুবিকুনভাস |
৩৪) অসটিও জেনিসাস মিলিটারিস |
৩৫) পেরিঅফম্যালমাস কোয়েলরিউট্রি |
৩৬) এট্রোপলাস সুরা টেনসিস |
৩৭) প্লোটোসাস কোনিয়াস |
৩৮) ট্যাসাসুরাস থ্যালাসাইনাস |
৩৯) পলিড্যাক টাইলাস
ইনডিকাস | |
|
|
|
 |
|
 |
|
|
|
 |
|
 |
লুপ্তপ্রায় মাছেদের সংরক্ষণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই
কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন- |
১) নদীতে মত্স্য সঞ্চার |
২) প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্রের
রক্ষনাবেক্ষন |
৩) লুপ্তপ্রায় মাছের প্রনোদিত প্রজনন |
৪) লুপ্তপ্রায় মাছেদের সঠিক বিচরণক্ষেত্র সনাক্ত করে
অভয়াঞ্চল ঘোষণা |
৫) মাছেদের আশ্রয়স্থলের সংরক্ষণ |
৬) জল দূষণ রোধে নজরদারী, ইত্যাদি |
প্রকৃতিতে অনবরত যে পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তার সঙ্গে
কিছু মত্স্য প্রজাতিই মানিয়ে নিতে না পারায় আপনা আপনিই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে
বিন্দু প্রজাতি׀ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মনুস্যসৃষ্ট সমস্যাবলী
বিশেষ করে বর্ষাকালে ধানক্ষেতে অপরিমিত বিষ প্রয়োগ এবং জল দূষণ׀ প্রাকৃতিক
কারণে মাছ যখন অবলুপ্তির দিকে ধেয়ে যায়, মানুষের প্রচেষ্টা তার গতি মন্থর
করতে পারে মাত্র׀ কিন্তু মানুষের হানাদারি এবং দূষণ যখন ধ্বংসের কারণ
সেক্ষেত্রে বিলুপ্তির গতি পুরোপুরি রোধ করা যায় যদি কারণগুলি সম্পর্কে
কারিগরি দক্ষতা থাকে׀ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং আর্থিক সক্ষমতার সাহায্যে মানুষের
হস্তক্ষেপ এবং দূষণ জনিত কারণে বিবর্তিত মত্স্য প্রজাতির আগমন রুদ্ধ হতে
পারে׀ কিন্তু যে প্রকৃতি মাছের বিলুপ্তির কারণ, সেই আবার নতুন প্রজাতির
উদ্ভাবক׀ |
|
|