মাছ চাষ খামারের বিভিন্ন ধরণের পুকুর ও তাদের গঠন পদ্ধতি |
বিভিন্ন রকমের পুকুর, তার মাপ ও অনুপাত |
নতুন পুকুর কাটার জন্য স্থান নির্বাচন |
মত্স্য খামারের নক্সা ও পরিকল্পনা |
পুকুর তৈরীতে বাঁধ বা পাড় |
কিন্ত অধিকাংশ মাছচাষী
বেশীরভাগ চারাপোনা বিক্রি করে অল্প কিছু লালনপুকুরে
রাখেন এবং তার থেকে অনেক
আঙ্গুলে পোনা বিক্রি করে অবশিষ্ট কিছু মজুত পুকুরে ছাড়েন। এতেই লাভ বেশী
তাই মজুত পুকুরের মোট আয়তন এত বেশী না থাকলেও চলে।
|
খামার তৈরীর জন্য স্থান নির্বাচনে অনেকগুলি বিষয় বিচার করে দেখা দরকার। যাতে কম খরচে হয় এবং পুকুর কাটার পর যাতে জল থাকে এবং অন্যান্য বিপর্যয়ের মধ্যে না পড়তে হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখা একান্ত কর্তব্য। তাই স্থান নির্বাচনে যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।ক) স্থানের অবস্থান - কেমন জায়গায় তা আগে দেখতে হবে। রাস্তাঘাট শহর বাজার ইত্যাদির সাথে যোগাযোগের সুযোগ আছে কিনা এবং সর্বাগ্রে খামার আপনার সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণে এবং পরিচালনায় রাখা যাবে কিনা তা বিচার করে দেখা প্রয়োজন।খ) জমির আয়তনে আপনার প্রয়োজনীয় পুকুরগুলির স্থান সংকুলান হবে কিনা তা দেখা দরকার।গ) জমির উপরিতলের চিত্র কেমন তা দেখা দরকার। পুকুর কাটার জন্য উঁচু ঢিবিজমি নিশ্চয়ই বেছে নেবেন না। এতে খরচ অনেক বেশী পড়বে। অবশ্য যদি আপনি ইঁটের ভাঁটা করেন সে কথা আলাদা। তবু ইঁটের ভাঁটা যারা করেন, তারা যদি একটু পরিকল্পনা মত গর্ত খোঁড়েন তবে বিনা খরচায় একটি চমত্কার মাছের খামার হতে পারে। আবার রাস্তা যারা তৈরী করেন তারাও যদি একটু পরিকল্পনা করে দুপাশের মাটি কাটেন তবে সুন্দর সুন্দর পুকুর হতে পারে।ঘ) পতিত জলাশয়ের ব্যবহার - যাই হোক মাছ চাষের খামার তৈরীর জন্য জায়গাটি উঁচু পাহাড়ী বা সমতল না হলেই ভাল। পুকুর কাটার জন্য নীচু গর্তমত পতিত জমি পছন্দ করুন। মজে যাওয়া বিল বা পুরাতন দীঘি, পতিত উদ্ধার করে পছন্দ মত বা স্থান সংকুলান মত বিভিন্ন পুকুরে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে দেখতে হবে দীঘি বা বিলের তলায় পাঁক শক্ত হয়ে জমে গেছে কিনা।তলায় থাকলে নরম পাঁক
|
এই সমস্ত নীচু জমি বা মজে যাওয়া জলাশয়ের মধ্যভাগে বেশী গভীর হয়। তাই বাঁধ দিয়ে এইসব অগভীর বা কিনারা অঞ্চলে আপনার অগভীর পুকুরগুলি যেমন আঁতুর পুকুর, লালন পুকুর ইত্যাদি নির্মাণ করুন। এবং গভীর মধ্যাংশে গভীরতর পুকুরগুলি সাজিয়ে নিন। তাহলেই আপনার খামার গঠনের পরিকল্পনা স্বল্পব্যয়ে সফল হবে।তলায় থাকলে কাঁকর বালি
|
আপনার খামারের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুকুরগুলির অনুপাত ঠিক রেখে পছন্দমত স্থানে তা গঠনের জন্য একটা নক্সা আগে করা দরকার। আগেই এদের আকার, আয়তন, গভীরতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছি। পছন্দমত স্থানটি সর্বাগ্রে জরিপ করে তার একটা নক্সা তৈরী করুন। সেই নক্সায় জমির উপরিতলের চিত্র অর্থাত্ কোনদিক কতখানি উঁচু নীচু বা গভীর সব উল্লেখ থাকা দরকার এবং এই নক্সা অনুসারে গভীরতর দিকে আপনার বড় পুকুরগুলি এবং অগভীর অংশে ছোট পুকুরগুলি সাজিয়ে নিন। পুকুরগুলির মাপ নক্সার উপরে এগুলি ঠিক ঠিক এঁকে নিতে হবে। এগুলি তৈরী করতে যে বাঁধ তুলতে হবে তার স্থানও রাখতে হবে।পুকুর হবে গভীর যত
|
|
পুকুর তৈরীতে বাঁধ বা পাড় গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুকুরের মাপ ও জলধারণ ক্ষমতা ও গভীরতার উপর বাঁধের চওড়া, উচ্চতা ও ঢাল নির্ভর করে। সাধারণতঃ অগভীর ছোট পুকুরের বাঁধের উপরিভাগ তিনফুটের মত চওড়া হলেই চলে। তবে গভীর বড় পুকুরের বাঁধের উপরিভাগ ছয়ফুট মত চওড়া হওয়া প্রয়োজন। বাঁধ চওড়া হলে স্থায়ী হয় এবং রাস্থা হিসাবে ব্যবহারের সুবিধা হয়। বাঁধ নির্মানে নিম্নলিখিত সাবধানতা অবলম্বল করা প্রয়োজন-ক) বাঁধ যেখানে দাঁড়াবে তার তলায় মাটি যেন নরম না হয়।খ) বাঁধের লাইন বরাবর দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সব ঘাস বা গাছপালা চেঁছে পরিষ্কার করে দিতে হয়। এই সব ঘাস কোদালে কেটে চাপ চাপ আকারে সরিয়ে রাখা ভাল। পরে বাঁধ নির্মাণ হয়ে গেলে বাঁধের ঢালে গলন রোধের জন্য এদের সাজিয়ে বসিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বাঁধের তলায় ঘাস বা গাছপালা থাকলে বাঁধ ভাল জমে না এবং জল চুঁইয়ে বেরিয়ে যায়।গ) বাঁধকে দৃঢ় করতে এবং পুকুরের জল যাতে চুঁইয়ে বেরিয়ে না যায় সেই জন্য বাঁধের মধ্যস্থলে নিশ্ছিদ্র এঁটেল মাটির দেওয়াল প্রয়োজন। যে মাটিতে জলধারণ ক্ষমতা কম সেখানে বাইরে থেকে এঁটেল মাটি এনে এইরূপ করা উচিত। বাঁধের লাইন বরাবর মধ্যস্থলে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে একটা নালা কেটে তার মধ্যে এঁটেল মাটির ভিত দিয়ে তারপর দেওয়াল তুললে ভাল ফল পাওয়া যায়।ঘ) বাঁধের মাটি ফেলার সময় প্রতি ছয় ইঞ্চি উচ্চতায় জল ছিটিয়ে পিটিয়ে মাটি বসানো দরকার। তারপর আবার মাটি ঢেলে ধীরে ধীরে বাঁধ উঁচু করে তুলতে হয়। তবেই বাঁধ ভাল জমে এবং দাঁড়ায়।বাঁধের মাথা জল ছাড়িয়ে
|
চ) বাঁধের ঢাল - ছোট পুকুরে ১:২ এবং বড় পুকুরে ১:২.৫ বা ১:৩ হওয়াই ভাল। কারণ উঁচু বাঁধ পলি বা দোআঁশ মাটিতে বাঁধ কম অনুপাতে তৈরী করলেও জলে গলে ঢাল আপনিই ১:২ বা ১:২.৫ হয়ে যায় এবং বাঁধ নেমে আসে। তখন বাঁধে আবার মাটি দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অবশ্য পুকুরের ভিতর দিকে অর্থাত্ যেদিকে জল থাকে সে দিকেই ঢাল বেশী হওয়া দরকার। পুকুরের বাইরের দিকের ঢাল ১:১ হলেও চলে। আবার বাঁধের দুপাশেই যদি জল থাকে তবে দুপাশেই ঢাল বেশী অনুপাতে থাকা দরকার।বাঁধের ঢাল ১:২ অনুপাতের অর্থ হল প্রতি একফুট উচ্চতায় বাঁধের পাদদেশে দুই ফুট ঢালের বিস্তার। আর ১:১ এর অর্থ প্রতি ফুট উচ্চতায় পাদদেশে সমান দূরত্বে ঢালের বিস্তার। অর্থাত্ একটি দশফুট উঁচু এবং উপরে ছয়ফুট চওড়া বাঁধের পাদদেশ মোট কতটা চওড়া হবে যদি তার বাইরের দিকে ঢালের অনুপাত ১:১ এবং ভিতর দিকে ১:২ হয়। বাইরের ঢাল উচ্চতার সমান অর্থাত্ ১০ ফুট + বাঁধের চওড়া মধ্যস্থল ৬ ফুট + ভিতর দিকের ঢাল উচ্চতার দ্বিগুণ অর্থাত্ ২০ ফুট = মোট ৩৬ ফুট চওড়া হবে।ছ) বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুকুরের জলসীমার নির্দিষ্ট উচ্চতায় একটি সিমেন্ট পাইপ (৮ ইঞ্চি - ১২ইঞ্চি ব্যাস) আড়াআড়ীভাবে বাঁধের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া ভাল। এতে হঠাত্ বৃষ্টিপাতে পুকুরে প্লাবন রোধ করা যায়। বাড়তি জল ঐ পাইপ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। বাঁধ ছাপিয়ে বা কোন অংশ ভেঙে বেরবার সম্ভবনা থাকে না। বাঁধে কখনও ফাটল দেখা দিলে বা ইঁদুর বা কাঁকড়ার গর্ত দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে এঁটেল মাটি দিয়ে তখনই বন্ধ করা উচিত। |