মাশরুম
|
||
ভূমিকা |
ধিংরি বা ঝিনুক ছাতু |
ঝিনুক ছাতুর চাষ পদ্ধতি |
পোয়াল ছাতু |
পোয়াল ছাতুর চাষ পদ্ধতি |
সংরক্ষণ |
রন্ধন |
||
ভূমিকা |
||
ইংরাজীতে যাকে মাশরুম (Mushroom) বলা হয় আমাদের পশ্চিমবঙ্গে অঞ্চল ভেদে তাকে ছাতু বা ব্যাঙের ছাতা বলা হয়ে থাকে৷ এই মাশরুম বা ব্যাঙের ছাতা নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদের অন্তর্গত এক ধরণের ছত্রাক৷ পৃথিবীর সর্বত্র এই ছত্রাক সব্জি হিসাবে খাওয়া হয়৷ ভারতেও এর চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ যে কোন সব্জির চেয়ে এর খাদ্যগুণ বেশী৷ এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন আছে৷ এহা সুস্বাদু ও সহজপাচ্য৷ এর স্বাদ অনেকটা মাংসের মতো৷ জানা গেছে যে মাশরুম চোখ, দাঁত ও হাড়ের গঠনে বিশেষ উপযোগী৷ রক্তহীনতা, বেরিবেরি ও হৃদরোগ প্রতিরোধে এবং বহুমুত্র রোগে ইহা বিশেষ কার্য্যকরী৷ |
||
পশ্চিমবঙ্গের সমতলভূমিতে প্রধানতঃ দুপ্রকার ছাতু বা মাশরুমের চাষ হয়ে থাকে৷ |
||
(১) ঝিনুক বা ধিংরি ছাতু ( Oyster Mushroom) |
||
( ২) পোয়াল ছাতু (Poaddy Straw Mushroom) |
||
অতি সম্প্রতি শীতকালে কোথাও কোথাও (৩) সাদা ছাতু (Button Mushroom) চাষ করা হচ্ছে৷ জাত ভেদে ঝিনুক ও পোয়াল ছাতু চাষের সময়, পদ্ধতি ও উপকরণ দেওয়া হল৷ |
||
ধিংরি বা ঝিনুক ছাতু ( Oyster Mushroom) |
||
পশ্চিমবঙ্গে এখন প্রধানতঃঝিনুক ছাতুর চাষ হচ্ছে৷ এই ছাতুর গঠন প্রকৃতি ছাতার মতন নয়, ছোট একটি বোঁটার উপর ছাতার মত অংশটি একদিকে প্রসারিত সাদা বা ধূসর রঙ এর হয়৷ ঝিনুক ছাতু চাষের জন্য ২০-৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস উত্তাপের দরকার৷ পশ্চিমবঙ্গে এই পরিমিত উত্তাপ বছরের যে সময়ে থাকে তখনই এর চাষ করা যায়৷ সাধারণতঃ সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উপযুক্ত সময়৷ |
||
ঝিনুক ছাতু অতি সহজে ও খুব কম খরচে চাষ করা যায়, মূলতঃ ধান বা গমের খড়কে মূল উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়৷ চাষের ব্যবহারের জন্য দেশী আমন ধানের খড় উপযুক্ত এবং তা ৬ মাস থেকে ১ বছরের পুরান হওয়া তাই৷ নাইলন নেটের ব্যাগ, পলিথিন ব্যগ বা চটের থলে , বীজ বা (Spawn) ও পলিথিনের চাদর দরকার৷ ব্যবসা ভিত্তিক চাষের জন্য মাচা আকারের চাষের পদ্ধতিতে দড়ি ও বাঁশের প্রয়োজন৷ বেশী ফলনের জন্য এবং নির্দিষ্ট দিনের (২৪-২৬ দিন) আগে ছাতু পাওয়ার জন্য ধানের তুষ বা গমের ভুষি অথবা ডালের গুঁড়ো ব্যবহার করা যেতে পারে৷ |
||
ঝিনুক ছাতুর চাষ পদ্ধতি |
||
ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ধিংরি বা ঝিনুক ছাতুর চাষ হয়৷ |
||
|
||
|
||
ঝিনুক বা ধিংরি চাষের জন্য যে কোন জায়গা নির্ব্বাচন করা যেতে পারে৷ তবে সরাসরি সূর্যের আলো ও বৃষ্টির জল থেকে বাঁচার জন্য |
||
চালা বা ছাউনি দরকার৷ চালা বা ছাউনির ব্যবস্থা করতে পারলে মাশরুমের চাষ মাঠে করা যায়৷ |
||
পোয়াল ছাতু (Poaddy Straw Mushroom) |
||
পোয়াল এক অর্থে খড়৷ খড়ে জন্মে বলে এই জাতীয় মাশরুমকে পোয়াল বলে৷ অতি সহজে, অনায়াসে ও অল্প খরচে এই জাতীয় ছাতুর চাষ করা যায়৷ মার্চ মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কমপক্ষে ২৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস উত্তাপে এর চাষ হয়ে থাকে৷ মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়৷এই ছাতুর চাষের জন্য ক) ছায়াযুক্ত জায়গা, খ) দেশী ধানের খড়, গ) ইঁট, কাঠ, বাঁশ বা টিনের তৈরী মাচান, ঘ) ডালের গুঁড়ো, ঙ) বীজ বা স্পন (Spawn), চ) সাদা স্বচ্ছ পলিথিনের চাদর ও ছ) জল দেওয়ার ঝারি দরকার৷ |
||
পোয়াল ছাতুর চাষ পদ্ধতি |
||
মোটামোটি ২৫ কেজি শুকনো খড় সমান ভাবে ৩২টি আঁটিতে ভাগ করে নিতে হয়৷ ঐ খড় চৌবাচ্চার বা পুকুরের পরিষ্কার জলে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে নিতে হবে৷ এরপর ভিজা খড়ের বাড়তি জল ঝরিয়ে নিয়ে একদিকে মাথা রেখে পাশাপাশি চার আঁটি খড় মাচান বা পাটাতনের উপর সাজাতে হবে৷ আবার বিপরীত দিকে মাথা রেখে আগের চার আঁটি খড়ের উপর আরো চার আঁটি খড় সাজাতে হবে৷ পাটাতনের প্রান্ত বরাবর খড়ের বাড়তি অংশ কাস্তে দিয়ে কেটে দিতে হবে৷ এইভাবে সাজান আট আঁটি খড়ে একটি (প্রথম) স্তর হল৷ ঐ স্তরের উপর প্রান্ত বরাবর ২ ইঞ্চি ভেতরে বীজ ছিটিয়ে দিলে চলবে৷ বীজ দেবার আগে প্রান্ত ধরে (২ ইঞ্চি) ডালের গুঁড়ো চার ধারে ছড়িয়ে দিতে হবে৷ প্রতম স্তরের কাজ এই ভাবে শেষ হল৷ এরপর ঠিক একইভাবে দ্বিতীয় স্তরের আট আঁটি খড় প্রথম স্তরের আড়াআড়ি সাজিয়ে প্রথমে ডালের গুঁড়ো প্রান্তের ২ ইঞ্চি ভিতরে চারি দিকে ছড়াতে হবে এরপর ডালের গুঁড়োর ওপরদানাদার বীজ সমান ভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে৷ তৃতীয় স্তরের আট আঁটি খড় প্রথম স্তরের সমান্তরালে একইভাবে সাজিয়ে ডালের গুঁড়ো ও বীজ দেওয়া হল- দ্বিতীয় স্তরের সমান্তরালে চতুর্থ স্তর একইভাবে তৈরী করা হল কিন্তু এখানে কোন বীজ বা ডালের গুঁড়ো দেওয়া হলনা- প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর পর্যন্ত ডালের গুঁড়ো ও বীজ বোনা হয়, চতুর্থ স্তরকে ঢেকে রাখে৷ প্রতি স্তরের খড়ের আঁটিগুলি যাতে না ভেঙ্গে পড়ে তারজন্য এক বা একাধিক আলতো করে খড়ের বা দড়ির বাঁধন দিলে ভাল হয়৷ স্তরগুলি সাজানর সময় পুরো স্তূপে জোরে চাপ দিয়ে চেপে দিতে হবে৷ সমস্ত কাজটি করতে ৩০-৪০ মিনিট লাগে এই সময়ের মধ্যেখড়ের প্রান্তগুলি শুকিয়ে আসে, সেইজন্য ১-২ লিটার স্তরের ওপরে ও ধারে ভাল ভাবে ঝারি দিয়ে অথবা স্প্রেয়ার দিয়ে জল দিতে হবে৷ ৫ মিনিট পরে জল ঝরে গেলে সাদা পলিথিনের চাদর দিয়ে ভালভাবে স্তূপটিকে ঢেকে দিতে হবে যাতে হাওয়া ঢুকতে না পারে৷ স্তূপ থেকে প্রান্ত বরাবর ১ ফুট ছেড়ে মাটিতে বি. এইচ. সি. দশ শতাংশ (গ্র্যামাকসিন) পাউডার ছড়িয়ে দিলে পিঁপড়ে বা ইঁদুরের উত্পাত কমে৷ প্রথম চারদিন ঢাকা খোলা বা জল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না৷ তারপর প্রতি চারদিন অন্তর চাদর খুলে কিছুক্ষণ আলগা রেখে প্রয়োজনমত জল ছিটিয়ে পুনরায় ঢেকে রাখতে হয়৷ এইভাবে চললে ৮-১০ দিনের মাথায় স্তূপ থেকে ছত্রাকের কুঁড়ি জন্মাতে দেখা যায়৷ তখন স্তূপটিকে ঢেকে রাখার দরকার হয়না, তবে প্রয়োজন মত সকালে ও বিকালে জল ছিটিয়ে স্তুপ ভিজিয়ে দিতে হবে৷ ১৫ দিনের মাথায় মাশরুম তোলার উপযোগী হয়ে যায়৷ এর ছাতা পুরোপুরি খুলে যাওয়ার আগেই তুলে নিতে হবে৷ আর তোলার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই রান্না করে ফেলতে হবে নতুবা ছাতু নষ্ট হয়ে যায়৷ তবে কুঁড়ি অথবা সদ্য ফুটন্ত অবস্থায় তুলে ঝুড়িতে রেখে ভিজে কাপড় চাপা দিয়ে রাখলে ২ দিন রাখা যায়- এই মাশরুম ফ্রীজে বা ঠান্ডায় না রাখাই ভাল৷স্মরণ রাখা দরকার যে একটি স্তূপে ১৪-১৫ দিনের মাথায় সর্ব্বাধিক ফলন পাওয়া যায় তারপর সপ্তাহ খানেক বিরতির পর অল্প পরিমাণে ছাতু জন্মায়৷ কোন অবস্থাতেই এক মাসের বেশী কোন স্তূপ রাখার দরকার নেই৷ ফলন শেষ হলে বেড বা স্তূপটি সার গর্তে ফেলে পরে ঐ সার সব্জী চাষে ভাল উপকার পাওয়া যায়৷ |
||
সংরক্ষণ |
||
স্বাভাবিক অবস্থায় পোয়াল ছাতু ১ দিন , ঝিনুক ছাতু ১-২ দিন পর্যন্ত রাখা যায়৷ ঝিনুক ছাতু ফ্রিজে ৭-৮ দিন সংরক্ষণ করা যায়৷ টুকরো করা মাশরুম শতকরা ১০ ভাগ লবণ জলে ১০ মিনিট ডুবিয়ে নিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে৷ ঐ শুকনো মাশরুম পলিথিন প্যাকেটে ভরে ভাল ভাবে মুখ বন্ধ করে রাখলে ২-৩ মাস থাকবে, পলিথিনের বদলে গন্ধবিহীন টিনের কৌটায় রাখা চলে৷ |
||
রন্ধন |
||
মাশরুম রান্নার সময় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার৷ |
||
(১) মাশরুমের নিজস্ব ঘ্রাণ বজায় রাখতে হলে উগ্র গন্ধযুক্ত মসলা এবং অধিক মাত্রায় মসলা ব্যবহার করা উচিত নয়৷ |
||
(২) পরিষ্কার জলে বেশী না কচলিয়ে আলতো করে মাশরুমগুলি ধোয়া দরকার ৷ |
||
(৩) শুকনো ছাতু রান্না করতে হলে ঈষত্ গরম জলে ধুয়ে নিতে হবে৷ |
||
(৪) স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ, খাদ্যগুণ বজায় রাখতে হলে কোন মতেই অধিক আঁচে ও অধিকক্ষণ মাশরুম ফোটানো উচিত নয়৷ |
||
দেশাচার ও ব্যক্তিবিশেষের রুচি অনুযায়ী এর রান্নার পদ্ধতি নানা রকমের হয়ে থাকে৷ ঝোল, ডালনা, ভাজা, পাকোড়া, স্যালাড, স্যান্ডুইচ প্রভৃতি খাবার মাশরুম দিয়ে হয়ে থাকে৷ ভাজা, ডালনা বা মাংসের মত রান্না বাঙালীদের খুবই প্রিয়৷ |
||