হরমোন প্রয়োগে মাছের প্রণোদিত প্রজনন

মাছের প্রণোদিত প্রজনন

গ্রন্থিরস বা হরমোন সংগ্রহের পদ্ধতি

প্রণোদিত প্রজনন সুবিধা

গ্রন্থিরস প্রস্তুতি ও প্রয়োগের পরিমাণ

পাকা মাছ তৈরী করা এবং যত্ন নেওয়া

ওভাপ্রিম (OVAPRIM)

পুরুষ মাছ ও স্ত্রী মাছ চেনার উপায়

ইনজেকশন প্রয়োগ ও প্রজনন পদ্ধতি

প্রজননের উপযুক্ত সময় এবং ডিম ফোটান

স্ফুটন হাপায় ডিম ফোটান

প্রজননের উপযুক্ত পুকুর বা জলের অবস্থা

পিটুইটারী গ্রন্থি সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি

 

প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জামের তালিকা

 

মাছের প্রণোদিত প্রজনন

কথায় বলে "মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় উঁকি" সত্যিই মাছের ডিমের মত উপাদেয় মুখরোচক খাদ্য কমই আছে বাঙালীর রসিক রসনা তা ঠিকই জান তাই বলে গর্ভবতী ডিমভরা মাছ মেরে খেয়ে ফেলা কি উচিত? নিশ্চয়ই নয়

ডিমভরা মাছেদের প্রজননের সুযোগ সুবিধা দেওয়া একান্ত কর্ত্তব্য নিবির্চারে যদি আমরা ডিমভরা মাছ মেরে খেতে থাকি তবে অনিবার্য ভাবে মাছের সংখ্যা কমে আসবেকারণ মাছের ভবিষ্যত বংশ বৃদ্ধিতে বাধা পড়বে তাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মাছ মারার ব্যাপারে সাময়িক বিধি-নিষেধ আছে আমাদের দেশেও দূর্গাপূজার পর থেকে সরস্বতী পূজা পযর্ন্ত ইলিশ খাওয়া নিষেধ ছিল অন্য মাছের যোগান কম বলে তা আমরা মানিনা ইলিশের বংশ কম হওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে

আমরা যে সব মাছ চাষ করি অর্থাত্‍ ‍দ্রুত বাড়ন্ত ও সুস্বাদু রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি মাছ বর্ষায় নদীতে ডিম পাড়ে সে সময় এদের মারা উচিত নয় বাঁকুড়া, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলায় যেখানে বাঁধে মাছ ডিম পাড়ে, সেখানের মাছ চাষীরা খুব আদর যত্ন করেই মাছ পোষেন এবং বড় করে তোলেন ডিম পাড়ার জন্য একটাও মেরে খান না এতে হাজার হাজার টাকা আয় হয় আপনার পুকুরে বা বিলেও যদি এই সব গর্ভবতী মাছ থাকে তাদের না মেরে প্রজননের চেষ্টা করুন, অনেক লাভ হবে 

 

প্রণোদিত প্রজনন সুবিধা

রুই,কাতলা,মৃগেল, কালবোস এই সব মাছেরা সাধারণতঃ বদ্ধ জলে ডিম পাড়ে না বহতা নদীতে ডিম পাড়ে হরমোন ইনজেকশন্ দ্বারা প্রণোদিত করে বদ্ধ জলে অর্থাত্‍ আপনার পুকুরে এবং আপনার সম্পূর্ণ আওতার মধ্যে ডিম পাড়ান সম্ভব এতে লাভ অনেক, যথা– 
(১) আপনি যে মাছের বাচ্চা চাইবেন, নির্ভেজাল সেই মাছের বাচ্চা পাওয়া যায় নদীতে মাছের ডিম পাওয়া অনির্দিষ্ট এবং মিশ্রিত হওয়াই স্বাভাবিক  অনেক সময় বাজে মাছের ডিম কিনে ঠকতে হয়
(২) প্রতি কেজি ওজনের ডিম ভরা মাছ থেকে ১-২ লক্ষ ডিম পাওয়া যেতে পারে নদীতে মাছের ডিম ধরা এবং সেখান থেকে বহন করে আনার চেয়ে এই পন্থা সস্তা ও সহজতবে এই বিষয়ে শিক্ষালাভ ও অভিজ্ঞতা থাকা বাঞ্ছনীয়
(৩) এই উত্কৃষ্ট মাছের ডিম পোনার বাজার দরও বেশএর থেকে প্রচুর আয় করা যায়
(৪) আপনার আঁতুড় পুকুরে এই ডিম ফুটিয়ে পোনা উত্পাদন ও বিক্রী করে অনেক বেশী টাকা আয় করা সম্ভব এবং আপনার নিজের পুকুর খাকলে সেখানে ছাড়ার জন্য আর বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে নাআপনি আত্মনির্ভর হতে পারবেন
(৫) এইভাবে নির্ভেজাল উচ্চমানের মত্সবীজের জন্মদান মানেই মাছের বংশ বিস্তারের এবং দেশের অতীব প্রয়োজনীয় আমিষ খাদ্যের উত্পাদনে সহায়তা করে অতএব এই কাজে সবার এগিয়ে আসা উচিত

পাকা মাছ তৈরী করা এবং যত্ন নেওয়া

প্রণোদিত প্রজননের সাফল্য অর্জন করতে হলে উপযুক্ত পরিমাণ গর্ভবতী বা পরিপক্ক মাছ পুকুরে মজুত থাকা দরকার এই জন্য শীতের সময় থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা ভাল১ কেজির ওপর তিন-চার কেজি পর্যন্ত ভাল সাইজের মাছ পেলেই পাকা মাছের জন্য নির্দিষ্ট একটা পুকুরে আলাদা করে রাখতে হয় হেক্টর প্রতি ২০০০ কেজি ওজনের মাছ ঐ সব পুকুরে জমা রাখা যেতে পারে এইসব পুকুরে জঙ্গল বা আগাছা না থাকাই বাঞ্ছনীয় এবং অন্যান্য বাজে মাছ না থাকলেই ভাল হয় পুকুর সার প্রয়োগে প্রস্তুত করে নিতে হয় এবং মাছের দৈনিক আহার হিসাবে শরীরের ওজনের ১% (অর্থাত্‍ ১০০০ কেজিতে ১০ কেজি) পরিমাণ সরিষার খৈল ও চালের কুঁড়ো সমপরিমাণে মিশিয়ে জলে ছড়িয়ে মাছকে খেতে দিতে হয়মাঝে মাঝে জাল টেনে এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কোন রোগ বা পোকা মাকড় উকুনের আক্রমণ থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা উচি কারণ গরমকালে জল কমে গেলে এই সমস্ত রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে এবং নানা কারণে মাছের মড়ক হয়ে থাকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার
বর্ষার প্রারম্ভে জাল দিয়ে পূর্ণ গর্ভবতী ও পরিপক্ক স্ত্রী পুরুষ মাছ বেছে রাখা উচিত সম্ভব হলে স্ত্রী পুরুষ আলাদা করে রাখা যেতে পার এই সময় জাল টেনে খুব সাবধানে এদের ধরতে হয় যেন কোন চোট না লাগে প্রজননের সময়ও বাচ্চা ছেলের মত যত্ন করে তোলা-ফেলা করতে হয় যেন হাত থেকে পিছলে পড়ে কোন চোট না লাগে কারণ পূর্ণ গর্ভ অবস্থায় এরূপ আঘাত খুব ক্ষতিকর ও মারাত্মক হতে পারে, তাই হাত জাল ব্যবহার করা দরকার

পুরুষ মাছ ও স্ত্রী মাছ চেনার উপায়

একই বয়সের স্ত্রী মাছ সাধারণতঃ পুরুষ মাছের চেয়ে আকারে বড় ও পেট মোটা হয়ে থাকে ঋতুকালে অর্থাত্‍ বর্ষার প্রারম্ভে এরা পরিপক্ক হয় তখনই এদের সঠিক চেনা যায় এই সময় পূর্ণ গর্ভবতী স্ত্রী মাছ পরিপূর্ণ স্ফীতদরা হয়ে থাকে অথচ পেট বেশ নরম থাকে শক্ত ঢেলার মত নয় গুহ্যদ্বার লালাভবর্ণ ধারণ করে এবং স্ফীতো হয়ে বাহিরের দিকে বেরিয়ে আসে এইরূপ পরিপক্ক অবস্থায় স্ত্রী মাছের তলপেটে ধীরে চাপ দিলে দুচারটে ডিম বেরিয়ে আসতেও পারআর পুরুষ মাছের তলপেটে মৃদু চাপ দিলেই ঘন দুধের আকারে বীর্য বেরিয়ে আসে এছাড়া পুরুষ মাছের কানকোর দুই পাশের পাখনা খসখসে হয়ে থাকে স্ত্রী মাছের এরূপ হয় না, কানকোর দুপাশের পাখনা মোলায়েম থাক এই সমস্ত লক্ষণ ভালভাবে মিলিয়ে নিয়ে প্রজননের উপযুক্ত মাছগুলি বেছে নিতে হয়

প্রজননের উপযুক্ত সময় এবং ডিম ফোটানো

রুই, কাতলা, মৃগেল এই সব মাছ স্বাভাবিক অবস্থায় বর্ষাকালে পূর্ণ গর্ভবতী হয় এবং বহতা নদীতে ডিম পাড়ে অতএব এই সময়ই প্রজননের পক্ষে উপযুক্ত অর্থাত্‍ আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের মধ্যেই এদের প্রজননের চেষ্টা করা উচিত এর আগে-ও পরে করলে সফল নাও হতে পারেন

প্রজননের পক্ষে সব দিন উপযুক্ত নয় ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঠান্ডা আবহাওয়াপূর্ণ দিন আদর্শ জলের তাপমাত্রা ২৭-৩১ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকাই বাঞ্ছনীয় কয়েকদিন উপযুর্পরি বৃষ্টির পর দিনের তাপমাত্রা কমে যায় এবং জলের তাপমাত্রাও নেমে আস এই সময় হরমোন প্রয়োগে প্রণোদিত প্রজননে ভাল ফল পাওয়া যায়এই প্রজননের জন্য যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক অবস্থা এবং পরিবেশ দেওয়া যায় ততই ভাল ফল পাওয়া সম্ভব স্বাভাবিক পরিবেশে এই রকম বৃষ্টির দিনেই নদীতে মাছ ডিম পাড়ে এছাড়া একাদশী থেকে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা পর্যন্ত প্রজননের সংখ্যা বেশী হয়ে থাকে

প্রজননের উপযুক্ত পুকুর বা জলের অবস্থা

হরমোন প্রয়োগে প্রজনন সব পুকুরে সম্ভব হলেও ফুটিয়ে বাচ্চা বার করা সম্ভব নাও হতে পারেএইজন্য একটু বাছ-বিচার করে পুকুর নিবার্চন করা উচিত সার প্রয়োগ করা পুকুরে বা যে পুকুরে বেশী প্রাণীকণা বা সবুজ কণার প্রাদুর্ভাব (প্লাংকটনব্লুম) এমন পুকুরে ডিম অবস্থায় বা জন্মলাভের মুহুর্তেই মড়কের সম্ভাবনা বেশ যে পুকুরে পরিষ্কার বৃষ্টির জল জমা হয়েছে এমন পুকুর প্রজননের পক্ষে আদর্শ এবং ডিম ফোটানোর পক্ষেও ভালকাঁকড়া যে পুকুরে বেশী আছে এমন পুকুরেও প্রজনন বা ডিম ফোটানো সম্ভব নয় কারণ কাঁকড়া হাপা কেটে দেয় এবং ডিম খেয়ে ফেলে তেলাপিয়া বা সাইপ্রিনাস মাছেও ডিম নষ্ট করে দিতে পারে, তাই এই সমস্ত মাছ পুকুরে না থাকাই ভাল

গ্রন্থিরস বা হরমোন সংগ্রহের পদ্ধতি

পাকা মাছের মস্তিকের নীচে পিটুইটারী গ্রন্থির মধ্যে এই হরমোন বা একজাতীয় উত্তেজক থাকে ঋতুকালে স্বাভাবিক প্রজননের সময় সে রস আপনি শরীরে মিশে গিয়ে মাছকে ডিম পাড়ায় মাছের মুড়োর খুলির হাড়ের আবরণ তুলে ফেলে ঘিলুর চবির্জাতীয় পদার্থ সরালেই দেখা যায় মস্তিষ্ক যত্নে মস্তিষ্কটি উঠিয়ে ফেললেই তার নীচে একটি ছোট্ট কোটরে এই পিটুইটারী গ্রন্থি পাতলা পর্দায় ঢাকা থাকে এই পর্দা তুলে একটি বাঁকা নিডল্ দিয়ে এই গ্রন্থির চারিদিকে কোটরের মধ্যে ঘুরিয়ে দিলেই গ্রন্থিটি কোটর থেকে আলগা হয়ে যায় তখন খুব যত্নে তুলে নিতে হয় যেন গ্রন্থিটি অক্ষত থাকে এবং খাঁটি সুরাসার বা বসলিউট এলকোহলে ডুবিয়ে রাখতে হয় পরে প্রতিটি প্রায় গোলাকার গ্রন্থি সুরাসার থেকে তুলে সূক্ষ্ম ব্যালেন্সে ওজন করে ছোট ছোট হোমিওপ্যাথি শিশিতে খাঁটি সুরাসারে পুনরায় ডুবিয়ে লেবেল করে লিখে রাখতে হয় কত মিলিগ্রাম ওজন তবেই প্রজননের সময় ব্যবহারে সুবিধা হয়

এই গ্রন্থি সংগ্রহের কাজ গ্রীষ্মকালে বা বর্ষার আগেই করা শ্রেয় কারণ তখন এই সব গ্রন্থিতে এই হরমোনের সঞ্চার হয় বাজারে রুই,কাতলা, মৃগেল, কালবোস বা সাইপ্রিনাস মাছের মুড়ো থেকে এই গ্রন্থি সংগ্রহ করা যায় তবে টাটকা এবং পাকা অর্থাত্‍ প্রজননক্ষম বা পেটে ডিম হয়েছে এমন মাছের গ্রন্থিই কার্যকরী হয়

এক জাতের মাছের গ্রন্থি নিসৃত রস অপর জাতের মাছকে ইনজেকশন দিয়ে সুফল পাওয়া গেছে অর্থাত্‍ রুই এর গ্রন্থি মৃগেল বা কাতলা এইরূপ একের গ্রন্থিরস অপরকে দেওয়া যায়

গ্রন্থিরস প্রস্তুতি ও প্রয়োগের পরিমাণ

গ্রন্থিরস তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় ওজনের গ্রন্থিগুলি সুরাসার থেকে তুলে ফিলটার পেপারের ওপর রাখতে হয় এই সময় সুরাসার উবে যায় তখন গ্রন্থিগুলি টিসু হোমোজিনাইজারে পেষণ করে পরিশুদ্ধ জলে গুলে নিতে হয় পরিশুদ্ধ জলের মাত্রা যেন বেশী না হয় নির্ধারিত মাত্রায় দিতে হয়, যেমন পুরুষ মাছের বেলায় প্রতি ১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ০.১ মিলিলিটার পরিশুদ্ধ জল আর স্ত্রী মাছের বেলায় প্রতি ১-৪ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ০.১ মিলিলিটার পরিশুদ্ধ জল দরকার আবার একবার কোন মাছকে এক মিলিলিটারের বেশী পরিশুদ্ধ জল ইনজেকশন্ দিতে নাই

তারপর গ্রন্থির ভাসমান ভগ্নাংগুলি বাদ দেওয়া প্রয়োজন তাই একটি সেন্ট্রিফিউগাল মেসিনে ঐ রস বেশ ভাল করে ঘুরিয়ে নিতে হয়তখন সমস্ত গ্রন্থির কুঁচি তলানি হিসাবে জমা পড়ে এবং উপরের পরিষ্কার গ্রন্থিরস ইনজেকশনের জন্য সিরিঞ্জে তুলে নেওয়া যায়

প্রজননের জন্য পরিপুষ্ট গর্ভবতী স্ত্রী মাছকে ছয় ঘন্টা অন্তর দুইবার হরমোন ইনজেকশন্ দিতে হয় প্রথম দফায় অল্প মাত্রায় প্রতি কেজি দেহভার এর জন্য ২-৩ মিলিগ্রাম ওজনের গ্রন্থির রস দ্বিতীয় দফায় একটু বেশী মাত্রায় অর্থাত্‍ ৫-৮ মিলিগ্রাম ওজনের গ্রন্থির রস প্রতি কেজি দেহভার-এর জন্য ইনজেকশন দিতে হয় পুরুষ মাছকে একবারই ইনজেকশন দিতে হয় এবং তা স্ত্রী মাছকে যখন দ্বিতীয় দফায় দেওয়া হয় ঐ সময় একই সাথে দেওয়া হয় মাত্রা অল্পই যথা ২-৩ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি দেহভার এর জন্যে দরকার

ওভাপ্রিম (OVAPRIM)

ইদানিং কালে রুই, কাতলা, মৃগেল মাছের এবং দেশী মাগুর মাছের প্রণোদিত প্রজননের জন্য পিটুইটারী গ্লান্ডের বিকল্প হিসাবে ওভাপ্রিম ব্যবহৃত হচ্ছে ওভাপ্রিম একটা তরল পদার্থ কানাডার সিনডেল ল্যাবোরেটরীতে প্রস্তুত আমাদের রাজ্যে বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যায় গ্লাক্সো কোম্পানী ভারতবর্ষে এই তরল পদার্থের বাজারের দায়িত্বে আছ ওভাপ্রিম ইনজেকশন করে মাছের প্রণোদিত প্রজননের সফলতা আমাদের রাজ্যে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন মাছের ক্ষেত্রে ওভাপ্রিম প্রয়োগের পরিমাণ নিম্নরূপ:-
স্ত্রী কাতলা মাছের জন্য: ০.৫ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের  জন্য
স্ত্রী রুই মাছের জন্য     : ০.৪ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের জন্য
স্ত্রী মৃগেল মাছের জন্য  : ০.৩ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের জন্য
পুরুষ কাতলা মাছের জন্য: ০.৩-০.৪ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের জন্য
পুরুষ রুই ও মৃগেল মাছের জন্য : ০.২ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের জন্য
স্ত্রী মাগুর মাছের জন্য  : ২-৩ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের জন্য
পুরুষ মাগুর মাছের জন্য : ১ মিলিলিটার প্রতি কিলো মাছের

ছোট অর্থাত্‍ কম ওজনের মাছের জন্য ওভাপ্রিমের পরিমাণ কম লাগার কারণে সমপরিমাণে ডিসটিলড্ ওয়াটার বা পাতিত জল ব্যবহার করতে হয়

ইনজেকশন প্রয়োগ ও প্রজনন পদ্ধতি

প্রজননের জন্য উপযুক্ত দিনে উপযুক্ত মাছ বেছে নিয়ে প্রজনন হাপায় রাতে হয় প্রথমে স্ত্রী মাছ ও পুরুষ মাছ দুটিই হাপায় রাখা প্রয়োজন স্ত্রী মাছকে ইনজেকশন দেওয়া হলে উভয়কে একত্রে একই হাপায় প্রজননের জন্য রাখা হয় একটি স্ত্রী মাছের সাথে দুটি পুরুষ মাছ হাপায় দেওয়া হয়ে থাক দুটি পুরুষ মাছের মোট ওজন একটি স্ত্রীমাছের দেহের ওজনের সমান হলে চলে অর্থাত্‍ পুরুষ মাছ দুটি আকারে স্ত্রীমাছের চেয়ে ছোট হলেই ভাল তবে বীর্যবান হওয়া চাই

মাছের লেজের ওপরে চওড়া মোটা জায়গায় সাধারনতঃ ইনজেকশন দেওয়া হয় একটি আঁশতুলে ইনজেকশনের ছুঁচটি প্রথমে দেহের সমান্তরালভাবে অল্প ঢুকিয়ে পরে ৪৫ডিগ্রী কোণে দেহের গভীরে প্রবেশ করিয়ে দিতে হয় তারপর পরিমাণ মত গ্রন্থিরস ঢেলে দিতে হয়
স্ত্রী মাছকে প্রথম দফার ইনজেকশন বিকেলের দিকে ২টা থেকে ৪টার মধ্যে দিলে ভাল তারপর দ্বিতীয় ইনজেকশন রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে দেওয়া যায়এই দ্বিতীয় দফার ইনজেকশন প্রয়োগের ৪-৬ ঘন্টা পরে প্রজনন শুরু হয়ে যায় প্রজনন ক্রিয়া যাতে রাতের নিভৃতে ঠান্ডা আবহাওয়াতেই হতে পারে তাই এইভাবে ইনজেকশন প্রয়োগের সময় বেছে নেওয়া হয়

এই সময় মাছেদের কোন রকম বিরক্ত বা ভীত করা উচিত নয় প্রজনন হাপার কাছে জলে নামা বা কোনরূপ শব্দ করাও উচিত নয় এতে প্রজনন বিঘ্ন ঘটতে পারেএকটু নীরবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মাছেরা উত্তেজিত হয়ে হাপার মধ্যে দাপাদাপি করছে এই দাপাদাপি বা রতিক্রিয়া ৩-৪ ঘন্টা ব্যাপী চল তারপর হাপার ভিতরে স্তব্ধতা আসে তখন বুঝতে হবে প্রজনন শেষ এই সময়ও ব্যস্ত হয়ে কোন কাজ করার নেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হাপার মধ্যে কোন পাত্র ডুবিয়ে দেখা যেতে পারে ডিম দিয়েছে কিনা এই অবস্থায় ডিম দেওয়া হয়েছে দেখা গেলে আরও ৪-৬ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয় যাতে ডিম পুলি পরিপূর্ণভাবে ফুলে ওঠে এবং ভিতরে জল ঢুকে শক্ত হয়ে যায়

স্ফুটন হাপায় ডিম ফোটান

প্রজনন হাপা মাপে ২XX১ মিটার এবং সম্পূর্ণ ঢাকা কাপড়ের বাক্সের মত হয় সাধারনতঃ শক্ত মার্কিন কাপড় বা নাইলনের হতে পারে স্ফুটন হাপা একটি কাপড়ের চৌবাচ্চার মধ্যে আর একটি চৌবাচ্চা বা ডবল হাপা বলা হয় বাইরের হাপাটি পাতলা মার্কিন কাপড়ের এবং ভিতরের হাপাটি গোল নেটের মশারির কাপড়ের হয়ে থাক স্ফুটন হাপার বাইরেরটি ঐ একইমাপের আর ভিতরেরটি অল্প ছোট আকারের হয়, ১.৫X০.৭৫X০.৫০মিটার গভীর চারিটি বাঁশের খোঁটার সাহায্যে হাপাগুলি জলের মধ্যে খাটান হয়

প্রজনন হাপার ডিমগুলি শক্ত হয়ে গেলে, ধীরে ধীরে হাত-জালের সাহায্যে মাছগুলিকে হাপার মধ্যে থেকে আগে তুলে নিতে হয়, এবং পটাশ পারম্যাঙ্গানেট বা এক্রিফোভিনের জলে স্নান করিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিতে হয় তারপর সমস্ত ডিম হাপার একদিকে জমা করে একটি লিটার মগের সাহায্যে মেপে তুলতে হয় সাধারণতঃ ১ লিটার মগে ফুলে ওঠা ডিম সংখ্যায় ২০-২৫ হাজার হয় আর প্রতিটি সম্পৃক্ত ফুলে ওঠা ডিমের ব্যাস ৪.৫-৫ মি.মি. হয়ে থাকে সম্পৃক্ত ডিম দেতে পরিষ্কার স্বচ্ছ হয় আর অসম্পৃক্ত বা মৃত ডিম সাদা অস্বচ্ছ হয়ে থাকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করে দেখে নিতে হয় কত শতাংশ ডিম সম্পৃক্ত বা ভাল আছে

প্রতিটি স্ফুটন হাপায় এইরূপ ২-৪ লিটার ডিম মশারির গোল নেটের ওপর জলের তলে বিছিয়ে দিতে হয় এইভাবে ১৬-১৮ ঘন্টা থাকলে ডিম থেকে বাচ্চা বার হয়ে বাইরের মার্কিন কাপড়ের হাপায় চলে যায় এবং ডিমের খোসাগুলি নেটের হাপায় পড়ে থাকে সেইগুলি তখন সহজে তুলে ফেলে দেওয়া যায় নচে হাপার মধ্যে ঐ খোসাগুলি থাকলে পচন ক্রিয়ায় বাচ্চাগুলির বিশেষভাবে ক্ষতি বা জীবনহানি হতে পারে

ডিম থেকে বার হয়ে বাচ্চারা তিনদিন অবধি কিছুই খায় না, দেহলগ্ন ডিমার কুসুমেই ওদের চলে যায় তাই এই তিনদিন সদ্যজাত মত্স্য শিশুদের ঐ স্ফুটন হাপায় রেখে শক্ত হতে দিতে হয় এবং এই সময় অল্প বেড়েও থাকেতারপর ৫ মি.লি. বা ১০ মি.লি. চামচে মেপে আগে থেকে প্রস্তুত করা তৈরী আঁতুড় পুকুরে পরিমাণ মত ছাড়তে হয় জল ছাড়া মাপে এই অবস্থায় এক মি.লিটারে প্রায় পাঁচশত বাচ্চা থাকে

পিটুইটারী গ্রন্থি সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি

বোন কাটার-১টি, ছুরি- ১টি, কাঁচি- ১টি, সরু চিমটা-১টি, বাঁকা নিডল -১টি তুলি-১টি, ওয়াচ গ্লাস- ১টি, এবং ছোট একটি শিশিতে এক আউন্স পরিমাণ খাঁটি সুরাসার বা এবসোলিউট লকোহল, আর এক আউন্স পরিমাণ তুলো থাকা দরকার

প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জামের তালিকা

সেন্টিগ্রেড থার্মোমিটার -১ টি, হ্যান্ড সেন্ট্রিফিউগাল মেশিন-১ টি, টিসু হোমোজিনাইজার-২ টি, ২মি.লি. ইজেকশন সিরিঞ্জ-২ টি, ১৮-২২ নং ছুঁচ-৪ টি, ১০মি.লি. মেজারিং টিউব -৪ টি, প্লাস্টিকের বালতি-১ টি, ১ লিটার মগ- ২টি, হ্যান্ডনেট-২ টি, ১X২ মাপের রাবার ফোম কুশন-১ টি, প্রজনন হাপা-২ টি, স্ফুটন হাপা-৮জোড়া, এনামেল ট্রে-১ টি, পরিশুদ্ধ জল-১ডজন এমপুল, এছাড়া হাপা খাটানোর জন্য সরু বাঁশের খোঁটা প্রায় ত্রিশটির মত প্রয়োজন