হরমোন প্রয়োগে মাছের প্রণোদিত প্রজনন |
ডিমভরা মাছেদের প্রজননের সুযোগ সুবিধা দেওয়া একান্ত কর্ত্তব্য। নিবির্চারে যদি আমরা ডিমভরা মাছ মেরে খেতে থাকি তবে অনিবার্য ভাবে মাছের সংখ্যা কমে আসবে। কারণ মাছের ভবিষ্যত বংশ বৃদ্ধিতে বাধা পড়বে। তাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মাছ মারার ব্যাপারে সাময়িক বিধি-নিষেধ আছে। আমাদের দেশেও দূর্গাপূজার পর থেকে সরস্বতী পূজা পযর্ন্ত ইলিশ খাওয়া নিষেধ ছিল। অন্য মাছের যোগান কম বলে তা আমরা মানিনা। ইলিশের বংশ কম হওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। |
আমরা যে সব মাছ চাষ করি অর্থাত্ দ্রুত বাড়ন্ত ও সুস্বাদু রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি মাছ বর্ষায় নদীতে ডিম পাড়ে। সে সময় এদের মারা উচিত নয়। বাঁকুড়া, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলায় যেখানে বাঁধে মাছ ডিম পাড়ে, সেখানের মাছ চাষীরা খুব আদর যত্ন করেই মাছ পোষেন এবং বড় করে তোলেন ডিম পাড়ার জন্য। একটাও মেরে খান না। এতে হাজার হাজার টাকা আয় হয়। আপনার পুকুরে বা বিলেও যদি এই সব গর্ভবতী মাছ থাকে তাদের না মেরে প্রজননের চেষ্টা করুন, অনেক লাভ হবে। |
প্রণোদিত প্রজনন সুবিধা |
রুই,কাতলা,মৃগেল, কালবোস এই সব মাছেরা সাধারণতঃ বদ্ধ জলে ডিম পাড়ে
না। বহতা নদীতে
ডিম পাড়ে। হরমোন
ইনজেকশন্ দ্বারা প্রণোদিত করে বদ্ধ জলে
অর্থাত্ আপনার পুকুরে এবং আপনার সম্পূর্ণ আওতার মধ্যে ডিম
পাড়ান সম্ভব।
এতে লাভ অনেক, যথা– |
পাকা মাছ তৈরী করা এবং যত্ন নেওয়া |
প্রণোদিত প্রজননের সাফল্য অর্জন করতে হলে উপযুক্ত পরিমাণ গর্ভবতী বা
পরিপক্ক মাছ পুকুরে মজুত থাকা দরকার। এই জন্য শীতের সময় থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা ভাল।
১ কেজির ওপর তিন-চার
কেজি পর্যন্ত ভাল সাইজের মাছ পেলেই পাকা মাছের জন্য
নির্দিষ্ট একটা পুকুরে আলাদা করে রাখতে হয়। হেক্টর প্রতি ২০০০
কেজি ওজনের মাছ ঐ সব পুকুরে জমা রাখা যেতে পারে। এইসব পুকুরে জঙ্গল বা
আগাছা না থাকাই বাঞ্ছনীয় এবং অন্যান্য বাজে মাছ না থাকলেই ভাল হয়। পুকুর সার প্রয়োগে
প্রস্তুত করে নিতে হয় এবং মাছের দৈনিক আহার হিসাবে শরীরের ওজনের ১% (অর্থাত্ ১০০০ কেজিতে ১০ কেজি) পরিমাণ
সরিষার খৈল ও চালের কুঁড়ো সমপরিমাণে মিশিয়ে জলে ছড়িয়ে মাছকে খেতে দিতে
হয়। মাঝে মাঝে
জাল টেনে এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কোন রোগ বা পোকা মাকড় উকুনের আক্রমণ
থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ গরমকালে জল কমে
গেলে এই সমস্ত রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে এবং নানা কারণে মাছের মড়ক হয়ে থাকে
সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার। |
পুরুষ মাছ ও স্ত্রী মাছ চেনার উপায় |
রুই, কাতলা, মৃগেল এই সব মাছ স্বাভাবিক অবস্থায় বর্ষাকালে পূর্ণ গর্ভবতী
হয় এবং বহতা নদীতে ডিম পাড়ে। অতএব এই সময়ই
প্রজননের পক্ষে উপযুক্ত।
অর্থাত্ আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের
মধ্যেই এদের প্রজননের চেষ্টা করা উচিত। এর আগে-ও পরে করলে সফল নাও হতে পারেন।
|
প্রজননের উপযুক্ত পুকুর বা জলের অবস্থা |
হরমোন প্রয়োগে প্রজনন সব পুকুরে সম্ভব হলেও ফুটিয়ে বাচ্চা বার করা সম্ভব নাও হতে পারে। এইজন্য একটু বাছ-বিচার করে পুকুর নিবার্চন করা উচিত। সার প্রয়োগ করা পুকুরে বা যে পুকুরে বেশী প্রাণীকণা বা সবুজ কণার প্রাদুর্ভাব (প্লাংকটনব্লুম) এমন পুকুরে ডিম অবস্থায় বা জন্মলাভের মুহুর্তেই মড়কের সম্ভাবনা বেশ। যে পুকুরে পরিষ্কার বৃষ্টির জল জমা হয়েছে এমন পুকুর প্রজননের পক্ষে আদর্শ এবং ডিম ফোটানোর পক্ষেও ভাল। কাঁকড়া যে পুকুরে বেশী আছে এমন পুকুরেও প্রজনন বা ডিম ফোটানো সম্ভব নয় কারণ কাঁকড়া হাপা কেটে দেয় এবং ডিম খেয়ে ফেলে। তেলাপিয়া বা সাইপ্রিনাস মাছেও ডিম নষ্ট করে দিতে পারে, তাই এই সমস্ত মাছ পুকুরে না থাকাই ভাল। |
গ্রন্থিরস বা হরমোন সংগ্রহের পদ্ধতি |
পাকা মাছের মস্তিকের নীচে পিটুইটারী গ্রন্থির মধ্যে এই হরমোন বা একজাতীয়
উত্তেজক থাকে।
ঋতুকালে স্বাভাবিক প্রজননের সময় সে রস আপনি শরীরে
মিশে গিয়ে মাছকে ডিম পাড়ায়। মাছের মুড়োর খুলির হাড়ের আবরণ তুলে ফেলে ঘিলুর
চবির্জাতীয় পদার্থ সরালেই দেখা যায় মস্তিষ্ক। যত্নে মস্তিষ্কটি উঠিয়ে ফেললেই তার নীচে একটি ছোট্ট কোটরে এই পিটুইটারী
গ্রন্থি পাতলা পর্দায় ঢাকা থাকে। এই পর্দা তুলে একটি বাঁকা নিডল্ দিয়ে এই গ্রন্থির
চারিদিকে কোটরের মধ্যে ঘুরিয়ে দিলেই গ্রন্থিটি কোটর থেকে আলগা হয়ে যায়। তখন খুব যত্নে তুলে
নিতে হয়। যেন
গ্রন্থিটি অক্ষত থাকে এবং খাঁটি সুরাসার বা এবসলিউট
এলকোহলে ডুবিয়ে রাখতে হয়। পরে প্রতিটি প্রায়
গোলাকার গ্রন্থি সুরাসার থেকে তুলে সূক্ষ্ম ব্যালেন্সে ওজন করে ছোট ছোট
হোমিওপ্যাথি শিশিতে খাঁটি সুরাসারে পুনরায় ডুবিয়ে লেবেল করে লিখে রাখতে হয় কত
মিলিগ্রাম ওজন।
তবেই প্রজননের সময় ব্যবহারে সুবিধা হয়। |
গ্রন্থিরস প্রস্তুতি ও প্রয়োগের পরিমাণ |
গ্রন্থিরস তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় ওজনের গ্রন্থিগুলি
সুরাসার থেকে তুলে ফিলটার পেপারের ওপর রাখতে হয়। এই সময় সুরাসার উবে
যায়৷ তখন
গ্রন্থিগুলি টিসু হোমোজিনাইজারে পেষণ করে পরিশুদ্ধ জলে গুলে নিতে হয়। পরিশুদ্ধ জলের মাত্রা
যেন বেশী না হয়।
নির্ধারিত মাত্রায় দিতে হয়, যেমন পুরুষ মাছের বেলায় প্রতি ১ মিলিগ্রাম
গ্রন্থির জন্য ০.১ মিলিলিটার পরিশুদ্ধ জল আর স্ত্রী মাছের বেলায় প্রতি ১-৪
মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ০.১ মিলিলিটার পরিশুদ্ধ জল দরকার। আবার একবার কোন মাছকে
এক মিলিলিটারের বেশী পরিশুদ্ধ জল ইনজেকশন্ দিতে নাই।
|
ওভাপ্রিম (OVAPRIM) |
ইদানিং কালে রুই, কাতলা, মৃগেল মাছের এবং দেশী মাগুর মাছের প্রণোদিত
প্রজননের জন্য পিটুইটারী গ্লান্ডের বিকল্প হিসাবে ওভাপ্রিম ব্যবহৃত
হচ্ছে।
ওভাপ্রিম একটা তরল পদার্থ। কানাডার সিনডেল ল্যাবোরেটরীতে প্রস্তুত।
আমাদের রাজ্যে বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যায়। গ্লাক্সো কোম্পানী
ভারতবর্ষে এই তরল পদার্থের বাজারের দায়িত্বে আছ। ওভাপ্রিম ইনজেকশন করে
মাছের প্রণোদিত প্রজননের সফলতা আমাদের রাজ্যে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন মাছের
ক্ষেত্রে ওভাপ্রিম প্রয়োগের পরিমাণ নিম্নরূপ:- |
ইনজেকশন প্রয়োগ ও প্রজনন পদ্ধতি |
প্রজননের জন্য উপযুক্ত দিনে উপযুক্ত মাছ বেছে নিয়ে প্রজনন হাপায় রাখতে হয়। প্রথমে স্ত্রী মাছ ও পুরুষ মাছ দুটিই হাপায় রাখা
প্রয়োজন। স্ত্রী
মাছকে ইনজেকশন দেওয়া হলে উভয়কে একত্রে একই হাপায় প্রজননের জন্য রাখা হয়। একটি স্ত্রী মাছের
সাথে দুটি পুরুষ মাছ হাপায় দেওয়া হয়ে থাক। দুটি পুরুষ মাছের মোট
ওজন একটি স্ত্রীমাছের দেহের ওজনের সমান হলে চলে।
অর্থাত্
পুরুষ মাছ দুটি আকারে স্ত্রীমাছের চেয়ে ছোট হলেই ভাল। তবে বীর্যবান হওয়া চাই। |
স্ফুটন হাপায় ডিম ফোটান |
প্রজনন হাপা মাপে ২X১X১ মিটার এবং সম্পূর্ণ ঢাকা কাপড়ের বাক্সের মত হয়। সাধারনতঃ শক্ত
মার্কিন কাপড় বা নাইলনের হতে পারে। স্ফুটন হাপা একটি
কাপড়ের চৌবাচ্চার মধ্যে আর একটি চৌবাচ্চা বা ডবল হাপা
বলা হয়। বাইরের হাপাটি পাতলা মার্কিন কাপড়ের
এবং ভিতরের হাপাটি গোল নেটের মশারির কাপড়ের হয়ে থাক। স্ফুটন হাপার
বাইরেরটি ঐ একইমাপের আর ভিতরেরটি অল্প ছোট আকারের হয়, ১.৫X০.৭৫X০.৫০মিটার গভীর। চারিটি বাঁশের খোঁটার
সাহায্যে হাপাগুলি জলের মধ্যে খাটান হয়।
|
পিটুইটারী গ্রন্থি সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি |
বোন কাটার-১টি, ছুরি- ১টি, কাঁচি- ১টি, সরু চিমটা-১টি, বাঁকা নিডল -১টি তুলি-১টি, ওয়াচ গ্লাস- ১টি, এবং ছোট একটি শিশিতে এক আউন্স পরিমাণ খাঁটি সুরাসার বা এবসোলিউট এলকোহল, আর এক আউন্স পরিমাণ তুলো থাকা দরকার। |
প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জামের তালিকা |
সেন্টিগ্রেড থার্মোমিটার -১ টি, হ্যান্ড সেন্ট্রিফিউগাল মেশিন-১ টি, টিসু হোমোজিনাইজার-২ টি, ২মি.লি. ইনজেকশন সিরিঞ্জ-২ টি, ১৮-২২ নং ছুঁচ-৪ টি, ১০মি.লি. মেজারিং টিউব -৪ টি, প্লাস্টিকের বালতি-১ টি, ১ লিটার মগ- ২টি, হ্যান্ডনেট-২ টি, ১X২ মাপের রাবার ফোম কুশন-১ টি, প্রজনন হাপা-২ টি, স্ফুটন হাপা-৮জোড়া, এনামেল ট্রে-১ টি, পরিশুদ্ধ জল-১ডজন এমপুল, এছাড়া হাপা খাটানোর জন্য সরু বাঁশের খোঁটা প্রায় ত্রিশটির মত প্রয়োজন। |