মত্স্যবীজ পরিবহন পদ্ধতি

মত্স্যবীজ পরিবহন পদ্ধতি

আধুনিক পদ্ধতি

পরিবহণের প্রচলিত পদ্ধতি

চারাপোনার সংখ্যা

 

মত্স্যবীজ পরিবহন পদ্ধতি

মাছচাষী মাত্রেই ডিমপোনা, ধানিপোনা চারাপোনা ইত্যাদি পরিবহনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়৷ মাছচাষ করতে গেলে মাছের পোনা পুকুরে এনে মজুত করা সময় সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে৷ তাই পরিবহণের সুষ্ঠু ব্যবস্থার বিশেষ প্রয়োজন৷  এই সমস্যার প্রধান দিক পোনার মড়ক৷ দ্বিতীয়তঃ পাত্রে বহন ক্ষমতা ভঙ্গুরতা এবং তৃতীয়তঃ পরিবহনের দ্রুততম সুযোগসুবিধা৷ পোনার মড়ক প্রথমতঃ বিভিন্ন শারীর-বৃত্তীয় কারণে হয়ে থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় কারণেও সম্ভব৷ কাজেই উপযুক্ত পরিমাণ পোনা উপযুক্ত ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন অভঙ্গুর আধারে পরিবহন করা যেমন দরকার তেমনই দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা প্রয়োজন৷

পরিবহনের জন্য যে সমস্ত কারণে মড়ক ঘটাতে পারে তার আলোচনা নিচে করা হল:
(১) পোনা সংগ্রহকালে মড়ক- বিভিন্ন কারণে হতে পারে যেমন পোনাদের শারীরিক দূর্বলতা, রোগাক্রান্ত অবস্থা, চোটলাগা, পুকুরে সূত্রাকার জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতি, জলের উষ্ণতা, পোনার ছোট বড় আকার এবং জালে একত্রিত অবস্থায় থাকার অনভ্যাস ইত্যাদি৷ (২) রক্ষিত অবস্থায় মড়ক- পরিবহনের পূর্বে পোনাদের প্রায় ৪-৬ ঘন্টা হাপায় ধরে রাখা হয়৷ এই সময় ওদের শরীরের বর্জ্য পদার্থ বের হয়ে অন্ত্র খালি হয়ে যায়, ফলে পরিবহণ কালে আধারের জল দূষিত হয় না এবং পোনাদের একত্রে থাকার অভ্যাস বাড়ে৷ (৩) পরিবহণ কালে মড়ক- প্রধানতঃ জলদূষণ ও অক্সিজেনের ঘাটতিতেই হয়ে থাকে৷ এইজন্য জেলেরা সব সময় পরিবহণ পাত্রের জল ঝাঁকিয়ে বা হাত দিয়ে চাপড়িয়ে জলে অক্সিজেন মিশতে সাহায্য করে এবং কিছুক্ষণ অন্তর জল বদলের ব্যবস্থা করে৷

পরিবহণের প্রচলিত পদ্ধতি

বড় বড় মাটির পাত্রে বা হাঁড়িতে ডিমপোনা বা চারাপোনা পরিবহনই আমাদের প্রচলিত পদ্ধতি৷ ৩০-৪০ লিটারের হাঁড়িতে সময় ও দূরত্ব সাপেক্ষে প্রায় ৫০ হাজার ডিমপোনা, অথবা ২-৩ হাজার ধানিপোনা অথবা ৬০০-১০০০ চারাপোনা পরিবহণ করা যায়৷ সাধারণতঃ যে জল থেকে ডিমপোনা সংগৃহীত হয় সেই জলই পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ ডিমপোনা পরিবহণের সময় জলে অল্ল লালমাটি মেশানো হয়৷ লালমাটি আলোক রোধ করে এবং জল ঠান্ডা রাখে তাছাড়া পরিবহণকালে পোনাদের মৃতদেহ বা বর্জ্য পদার্থ চাপা দিয়ে পচনরোধ এবং জলে দূষিত গ্যাসের জন্মরোধে সহায়তা করে৷ সময় সময় জেলেরা ছোট ন্যাকড়া দিয়ে হাঁড়ির তলা ছেঁচে দূষিত পদার্থ সহ লালমাটি তুলে ফেলে দেয়৷ প্রয়োজনে জল পরিবর্তন করে৷ এইভাবে প্রচলিত পদ্ধতিতে পাত্রে ঝাঁকানি দিতে দিতে জেলেরা ২ দিনের উপর পথ অতিক্রম করে ট্রেন,ট্রাক,বাস ইত্যাদিতে৷ অল্পদূরত্বে মাথায়, বাঁকে, গরুর গাড়ী বা রিক্সাভ্যানেও পরিবহণ করা হয়৷ বর্তমানে এই পরিবহণ ভঙ্গুর মাটির পাত্রের পরিবর্তে আলুমিনিয়ামের হাঁড়িও ব্যবহৃত হয়৷ তবে আলুমিনিয়ামের হাঁড়িকে তাপ রোধের জন্য ভিজা মোটা কাপড় জড়িয়ে রাখা দরকার৷ চারাপোনা পরিবহণের জন্যও এইসব হাঁড়ি ব্যবহার করা হয় এবং একইভাবে ঝাঁকানি দিতে দিতে, জল পালটিয়ে চারাপোনার পরিবহণ করা হয়৷ পোনার আকার অনুসারে পাত্রে সংখ্যা নির্দিষ্ট হয়৷ আবার যাত্রার সময়ের দৈর্ঘ্যের উপরও এই সংখ্যা নির্ভরশীল অর্থাত্ পোনা বড় হলে সংখ্যায় কম যাবে এবং সময় দীর্ঘ হলে সংথ্যায় আরো কম যাবে৷ চারাপোনা বা বড়পোনা পরিবহণের জন্য সাধারণতঃ বড় বড় ড্রাম, ধাতব চৌবাচ্চা ব্যবহার করা হয়৷ সম্প্রতি মোটা ক্যানভাসের জলরোধক চৌবাচ্চা ট্রাক - ট্রেলারের মাঝে বিছিয়ে দিয়ে বড় চৌবাচ্চার আকার করে জলপূর্ণ করে বড় চারাপোনা এমন কি প্রজননক্ষম বড় মাছও স্থানান্তর করা যায়৷ অবশ্য চৌবাচ্চার ওপরে পাতলা জালের আবরণ দিয়ে মাছ লাফিয়ে যাওয়া বন্ধ করা হয়৷

আধুনিক পদ্ধতি

আগেই বলা হয়েছে পরিবহণ কালে জলদূষণ বা অক্সিজেনের ঘাটতিতে পোনার মড়ক হয়৷  জলে অক্সিজেন যদি ২ পি.পি.এম- এর বেশী থাকে তবে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বৃদ্ধি ঘটলেও মড়ক প্রায় হয় না৷ অতএব জলে যদি প্রচুর অক্সিজেন যোগান দেওয়া যায় তবে মড়ক রোধ করা সম্ভব৷ তাছাড়া দূর পাল্লার বা বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রচলিতভাবে মুক্ত অবস্থায় করা সম্ভব নয়৷ তাই বর্তমান পদ্ধতিতে ০.০৬ মিমি পুরু পলিথিনের ব্যাগে (৮২ বাই ৬০ সেমি) জল ও নির্দিষ্ট সংখ্যক পোনা ভরে অক্সিজেন দিয়ে প্যাক করে পরিবহণ করা হয়৷ প্রথমে যথারীতি পোনাদের হাপায় রেখে ধাতস্থ করা হয়৷ তারপর পলিথিনের ব্যাগগুলি ছিদ্রহীন আছে কিনা দেখে নিয়ে কাগজ বিছানো মুখ কাটা ক্যানেসতারা টিনের (১৮লিটার) মধ্যে রাখা হয়৷ তারপর ব্যাগের মধ্যে পরিষ্কার ঠান্ডা জল ৬ লিটার ভরা হয় এবং তন্মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক চারাপোনা ছাড়া হয়৷ অবশেষে অক্সিজেন গ্যাস রবারের নল দিয়ে প্রবেশ করিয়ে ব্যাগটিকে ক্যানেসতারা টিনের উপর পর্যন্ত ফুলিয়ে তোলা হয় এবং ফুটবলের ব্লাডার বাঁধার মত শক্ত করে মুড়ে ব্যাগের মুখ বেঁধে দেওয়া হয়৷ ক্যানেসতারা টিনের ওপরে ও ঢাকনা থাকে এবং সেটা বন্ধ করার আগে ছেঁড়া কাগজ ব্যাগের ওপর চাপা দেওয়া হয়৷ এই কাগজ টিনের চারপাশে দেওয়ালে ও উপরে তাপের অপরিবাহী রূপে কাজ করে৷  অবশ্য টিনগুলি সবসময় ছায়ায় রাখা কর্তব্য৷ এইভাবে পরিবহণে একেবারে জল না পালটিয়ে একদিনের পথ সহজেই চারাপোনা নিয়ে যাওয়া যায়৷ নীচে বিভিন্ন জাতের মাছের জন্য ১২ ঘন্টায় কত বিভিন্ন মাপের চারা পরিবহণ করা যায় তার হিসাব দেওয়া হল :


 

চারাপোনার সংখ্যা
 

চারাপোনার মাপ

ভারতীয় মেজর কার্প

সাইপ্রিনাস কার্প

গ্রাস কার্প

সিলভার কার্প

২ সেমি

১২০০

১০০০

৬০০

৪০০

৩ সেমি

৬০০

৬০০

৪০০

৩০০

৪ সেমি

৩৫০

৪০০

৩০০

২০০

৫ সেমি

২২৫

৩০০

২০০

১৫০