প্রশ্ন - মাছের রোগের লক্ষণ কি ?
উত্তর - (১) মাছ খেতে চায় না |
(২) মাছ পাড়ের কাছে এসে ঘোরে, পুকুরের ওপরে ভাসতে থাকে, একজায়গায় এসে ভীড় করে |
(৩) পুকুরে ঘুরপাক খায়, জল ঘোলা করে, ভারসাম্য হারায় |
(৪) মাছের জীবনীশক্তি কমে যায়, মাছকে হাত দিয়ে ধরলে অসুস্থ হয়ে পড়ে |
(৫) মাছের গায়ের রং বদলে যায় |
(৬) দেহে ক্ষত সৃষ্টি |
(৭) চোখ, দেহ, ফুলকা ফুলে যায় |
(৮) দেহে পরজীবির সিষ্ট / থলি |
(৯) দেহ থেকে রক্তক্ষরণ |
প্রশ্ন - আমরা মাছ চাষ করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি যে মাছের বিভিন্ন ধরনের রোগ হয় যার ফলে মাছ ঠিকমতো বাড়ে না,
মারাও যায় | এই রোগগুলি কেন হয় আর প্রতিকারই বা কি ?
উত্তর - মাছের বৃদ্ধি না হওয়ার পিছনে পরজীবির আক্রমণ একটি বড় কারণ | নীচে কতকগুলি সাধারণ পরজীবি দ্বারা সৃষ্ট
মাছের রোগ ও তার প্রতিকারের পদ্ধতি দেওয়া হলো --
জোঁক -- Piscicola প্রজাতির জোঁক মাছের গায়ে আক্রমণ করে | তবে এই জোঁকের আক্রমণের চেয়ে মাছ বেশী ক্ষতিগ্রস্থ
হয় যখন ঐ ক্ষতস্থানে ছত্রাক আক্রমণ করে | জোঁকের আক্রমণ হলে মাছকে ২.৫ % লবণ জলে ডুবিয়ে নিতে
পারলে উপকার হয় |
লারানিয়া -- লারালিয়া একধরনের কবচী প্রাণী | এদের উপাঙ্গগুলি খসে পড়ার জন্য, এদের কৃমির মতো দেখতে লাগে |
এদের স্ত্রী প্রাণীরাই মাছের দেহে ক্ষত সৃষ্টি করে ঢুকে পড়ে, যেখানে পরে ব্যাকটিরিয়া আক্রমণ করে | এই
Secondary Infection - এই মাছ মারা যায় | আকোয়ারিয়ামে গোল্ডফিস খুব এই রোগে আক্রান্ত হয় |
পরজীবিকে চিমটা দিয়ে তুলে ফেলতে হবে | ০.১ শতাংশ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে মাছকে ডুবালে উপকার
পাওয়া যায় | আক্রান্ত মাছকে ১ : ৬০০০ ফর্ম্যালডিহাইড দ্রবণ / ঘন লবণ দ্রবণে এক ঘন্টা এবং ০.১ ppm –
০.০২ ppm lindane দ্রবণে রাখলে উপকার পাওয়া যায় |
ইয়োলো গ্রাব -- Clinostomum নামক একটি ট্রিমাটোড কৃমি এই রোগের জন্য দায়ী | সিকি ইঞ্চি আকৃতির পরজীবি প্রাণীটি
একটি ছোট ক্রিম রঙের থলির মধ্যে থাকে | এই থলি বা নডিউল বা গুটি মাছের মাথা, দেহ ও পাখনায় দেখা
যায় | আক্রান্ত মাছের গুটি ছুরি দিয়ে কেটে পরজীবিকে চিমটা দিয়ে বের করে মারকিউরোক্রোম লাগিয়ে দিতে
হবে |
মাছের গা শ্লেষ্মাময় হয়ে যাওয়া -- রোগটি Costia নামক একেকোষী পরজীবির আক্রমণ থেকে হয় | আক্রান্ত মাছের গায়ে
হালকা নীল বা সবুজ রংয়ের শ্লেষ্মার পর্দা তৈরী হয় | Chilodon নামক সিলিয়াযুক্ত
প্রোটোজোয়াও কার্প, ক্যাটফিস ইত্যাদি মাছে একই রোগ সৃষ্টি করে | আক্রান্ত মাছকে
একঘন্টা ১ : ৪০০০ ফর্ম্যালিন দ্রবণ বা ১ : ৫০০ আসেটিক আসিড দ্রবণে ডুবালে উপকার
হয় | বিঘা প্রতি ৫ - ১৩ কেজি মোটা নুন দিতে পারেন |
অক্স হেড ওয়ার্ম -- এই ট্রিমাটোডটি (Bucephalus sp) মাছের ফলকায় থাকে কিন্ত বিশেষ ক্ষতি করে না | ০.৫ শতাংশ
লবণজলে রাখলে সহজেই পরজীবিটি দূরীভূত হয় |
যমজ কৃমি (Diplozoon paradoxum) -- এই ট্রিমাটোড কৃমিটি মাছের ফলকায় আটকে থাকে | কৃমিটির অদ্ভুত
নামকরণের কারণ হল লার্ভাবস্থা থেকে দুটি কৃমি তাদের সাকার বা চোষক
দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন যুক্ত হয়ে যায় | এরা মাছকে আক্রমণ করলে
০.৫ শতাংশ মিথিলিন ব্লু দ্রবণ বা পিকরিক আসিড দ্রবণে মাছকে কিছুক্ষণ
ডুবিয়ে রাখতে হবে |
ছত্রাক ঘটিত রোগ -- প্রায় সব মিষ্টিজলের মাছই ছত্রাক ঘটিত রোগের শিকার হয় | Sporolegnia parasitica ছত্রাক তার
সুতার মত অনুসূত্র মাছের দেহে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পুষ্টিরস শোষণ করে | অনুসূত্রগুলি জাল বিস্তার করে
এবং ত্বকের নীচে কিছু কোষ কলাকে ঘিরে ফেলে এবং ধীরে ধীরে মাছের মৃত্যুর কারণ হয় | মাছের ডিম
ও ক্ষতে এরা দ্রুত বৃদ্ধি পায় | তবে সরাসরি এরা মাছকে আক্রমণ করে না | কোন স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হলে
সেখানে এরা আক্রমণ করে | স্থানটিতে ধূসর বর্ণের তুলোর মতো ছত্রাক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় |
যদি মাছের ত্বকের অল্প কিছু অংশে ছত্রাক আক্রমণ করে তবে মাছটিকে আলাদা করে ১ : ১০ মারকিউরোক্রোম দ্রবণ বা ১ শতাংশ পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট দ্রবণে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে হবে | এরপর এক সপ্তাহ ১ : ২৫০০০ পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট দ্রবণে রাখতে হবে | আক্রান্ত মাছকে ১ : ৫০০০ ম্যালকাইট গ্রীন দ্রবণে ১০ - ৩০ মিনিট ডোবালেও ফল পাওয়া যায় | তবে যেহেতু ম্যালকাইট গ্রীন কারসিনোজেনিক, তাই খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় এমন মাছে এই ঔষধ ব্যবহার করা উচিত নয় |
Ich সাদা গুটি রোগ -- মিষ্টি জলের মাছের এটি একটি সাধারণ রোগ | এই রোগে মাছের গায়ের ও পাখনার ওপর সাদাগুটি
দেখা যায় | প্রতিটি গুটি প্রকৃতপক্ষে এক একটি সিষ্ট যাতে Ichthyophthirius নামক সিলিয়াযুক্ত
প্রোটোজোয়া পরজীবি হিসাবে বিদ্যমান | এই রোগে আক্রান্ত মাছ খুব অস্থিরভাবে ঘোরাফেরা করে |
মিষ্টি ও উষ্ণ জলে বেশী পরিমান মাছ Stock করলে এই রোগ হতে পারে |
প্রতিকার হিসাবে মাছকে ৩ শতাংশ লবণ দ্রবণ বা ১ : ৪০০০ ফর্ম্যালিন দ্রবণে রাখলে কিছুটা ফল পাওয়া যায় | আকোরিয়ামে মিথিলিন ব্লু ০.৫ শতাংশ দ্রবণ কয়েকফোটা যোগ করলেও মাছ রোগমুক্ত হয় | তবে সবচেয়ে ভাল কাজ হয় কুইনাইন হাইড্রোক্লোরাইডের ১ : ১০০,০০০ দ্রবণে | ১ - ২ সপ্তাহের মধ্যে মাছ রোগমুক্ত হয় |
গ্লচিডিয়া - এগুলি একধরণের ঝিনুকের লার্ভা যা মাছের ফুলকায় আটকে থাকে | তবে এরা মাছের বিশেষ কোন ক্ষতি করে না |
শুধুমাত্র যখন প্রচুর পরিমাণে গ্রচিডিয়া লার্ভা মাছের ফুলকা আক্রমণ করে তখন ফুলকা নষ্ট হয়ে মাছ মরে পর্যন্ত যায় |
পাখনা পচা রোগ -- এটি একটি ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ | এরা দেহের বাইরে পাখনার গায়ে আক্রমণ করে | প্রথমে পাখনার রঙ
ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও তারপরে পাখনা ঝরে পড়তে থাকে | মাছকে ১ : ২০০০ কপার সালফেট দ্রবণে
ডোবালে উপকার পাওয়া যায় |
গাইরোড্যাকটাইলাস -- আক্রান্ত মাছকে ১ : ৫০০ আসেটিক আসিড দ্রবণ বা ১ : ৪০০০ ফর্ম্যালডিহাইড দ্রবণে ডোবালে
উপকার পাওয়া যায় |
মিঠে জলের মাছের কতকগুলি সাধারণ রোগ, তার কারণ ও প্রতিকারবিধি নীচের টেবিলে দেওয়া হলো
|
রোগের নাম |
লক্ষণ |
কেন হয় |
প্রতিকার |
|
ফুলকা পচা |
মাছ জলে ভাসতে থাকে | ফুলকা পচে যায় | মাছের শ্বাসকষ্ট হয় | |
ছত্রাক ঘটিত রোগ | |
(১) পুকুরে হেক্টর প্রতি ২০০ কেজি চুন দিতে হবে | (২) খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে | (৩) জলের পি.এইচ ৯.০ এর মধ্যে রাখতে হবে | |
|
লেজ ও পাকনা পচা রোগ |
মাছের লেজ ও পাখনার পচন ধরে এবং খসে পড়তে থাকে | |
ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ | |
(১) পুকুরে ১ পি.পি.এম হারে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দেওয়া যেতে পারে | (২) রোগাক্রান্ত মাছ কপার সালফেট দ্রবণে (দু লিটার জলে এক গ্রাম) ডুবিয়ে নিলে উপকার হয় | (৩) মাছকে বাইরে থেকে খাদ্য দিলে প্রতি কেজি খাদ্যের সঙ্গে ১০০ মিগ্রা টেরামাইসিন বা সালফাডায়াক্সিন পরপর সাতদিন দিতে হবে | |
|
শোথ রোগ বা ড্রপসি |
মাছের পেটে জল জমে ফুলে যায় এবং সেখানের আঁশ সামান্য খাড়া হয়ে যায় | পেটে চাপ দিলে জল বেরোয় | |
ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ | |
(১) আক্রান্ত মাছ পুড়িয়ে ফেলতে হবে | (২) পুকুরে ১ পি.পি.এম হারে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিন | এরপর একদিন বাদে পুকুরে বায়ু সঞ্চালক যন্ত্রের মাধ্যমে বায়ু সঞ্চালন অবশ্যই করতে হবে | |
|
সাদাগুটি রোগ |
মাছের গায়ে ও ফুলকার ওপর সাদা গুটি দেখা যায় | মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় | ছোট ও শিশু মাছে এদের প্রাদুর্ভাব বেশী | |
রোগের কারণ মিক্সোস্পোরিডিয়াম নামে একধরণের এককোষী প্রাণী | |
(১) পুকুরে মাছের সংখ্যা কমাতে হবে | (২) শতকরা দুভাগ লবণ জলে মাছকে ডুবিয়ে নিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে | (৩) হেক্টর প্রতি ২২৫ - ৩০০ কেজি চুন দিতে হবে | |
|
কৃমি রোগ |
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বর্ষায় চারা মাছকে আক্রমণ করে | এরা চামড়া ও ফুলকা আক্রমণ করে | আক্রান্ত মাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে জীবনীশক্তি কমে যায় ও উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় এবং মারা পর্যন্ত যায় | |
গাইরোড্যাকটাইলাস ও ড্যাকটাইলোগাইরাস নামে দুটি চ্যাপ্টা কৃমি | |
(১) পুকুরে চুন দিয়ে পি.এইচ বজায় রাখতে হবে | (২) আক্রান্ত মাছকে পরপর কয়েকদিন ৩ শতাংশ লবণ দ্রবণ বা ২ পি.পি.এম ফর্ম্যালিন দ্রবণে ডুবিয়ে নিলে ফল পাওয়া যায় | |
|
মাছের উকুন |
মাছ চঞ্চল হয় | পাড়ে এসে গা ঘসতে থাকে | বৃদ্ধি কমে যায়, রোগা ও দুর্বল হয়ে পড়ে | |
আরগুলাস নামে একধরনের সন্ধিপদ প্রাণী | |
(১) নুভান ১০ এম.এল / বিঘা/ মিটারে প্রয়োগ করুন | চারদিন পর আবার দিন | এর ফলে আরগুলাসের থেকে যাওয়া ডিমগুলো থেকে যে বাচ্চা ফুটে বেরোবে সেগুলোও মারা যাবে | |
প্রশ্ন - পাশের ফিশারীতে EUS হয়েছে | টেরামাইসিন দিয়েছিলাম কী করব ? চিংড়িমাছের সাদা দাগ রোগ হয়েছিল |
টেরামাইসিন দিয়েছি | কী করব ?
উত্তর - মাছের রোগ দমনে আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে | তার কারণ যে রোগ জীবাণুঘটিত তাকে মারার জন্য দরকার
আন্টিবায়োটিক | তবে ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে বা তার হঠকারী ব্যবহারের ফল খারাপ হতে পারে |
আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে তার থেকে প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়া সৃষ্টি হতে পারে যাদের ঐ আন্টিবায়োটিক ব্যবহারে
আর মারা যাবে না | ক্লোরামফেনিকল নামক আন্টিবায়োটিক মাছের রোগদমনে ব্যবহার করা একেবারেই ঠিক নয় |
কারণ ক্লোরামফেলিকলকে পরিবেশ থেকে সহজে সরানো যায় না (Non-biodegrable) | এমনকী ৫০ ডিগ্রি
সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়ও এটির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় না | তাই সহজেই অব্যবহৃত ক্লোরামফেনিকল ব্যাকটিরিয়ার সংস্পর্শে
এসে ক্লোরামফেনিকল প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়ার জন্ম দেয় যা ক্ষতিকর | তাছাড়া আন্টিবায়োটিকগুলি রোগ দমনের সঙ্গে
সঙ্গে মাছের শরীরের ক্ষতিসাধন করতে পারে | আবার ক্লোরামফেনিকলের মতো আন্টিবায়োটিকগুলি মাছের মাধ্যমে
মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অবাঞ্চিত ফল দিতে শুরু করে |
তাই শুধুমাত্র পাখনাপচা রোগেই অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (OTC) ব্যবহার করুন | সাদা দাগ রোগ বা EUS এ ব্যবহার না করাই ভাল | ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যাবে না |
প্রশ্ন - সুন্দরবনে স্বাভাবিক ভেড়ীতে চিরাচরিত প্রথায় মাছেরচাষের ফলে দূষণ হয় কি ?
উত্তর - চিরাচরিত প্রথায় মাছচাষ করলে দূষণের কোনও আশঙ্কা নেই | শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে জলে বা ভেড়ীর নীচে অভুক্ত
খাবার না মেশে এবং খেয়ালখুশীমতো কোন antibiotic প্রয়োগ করা চলবে না
প্রশ্ন -Cell line এর সঙ্গে মাছচাষের সম্পর্ক কি ?
উত্তর - মাছচাষে রোগ নির্ণয়, বিশেষতঃ সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ | ঠিক সময়, বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে এবং নির্ভুল রোগ নির্ণয় রোগ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করে মাছচাষীকে প্রভূত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে |
সাধারণতঃ মাছের রোগ নির্ণয় একটি সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি, বিশেষতঃ যদি তা ভাইরাস ঘটিত্ রোগ হয় | এখানেই Cell line ব্যবহারের গুরুত্ব ও সার্থকতা |
ভাইরাস কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত কোন Media তে বিস্তারলাভ (বা সংখ্যাবৃদ্ধি) করতে পারে না | যার জন্য এদের প্রয়োজন Liying Cell বা সজীব কোষ | ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভাইরাস বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানীরা জীবন্ত প্রাণী বা পরিস্ফুরনরত ডিম
(embyonated egg) ব্যবহার করতেন | যার অর্থ একটি ভাইরাসকে সমীক্ষা করতে গেলে প্রচুর সংখ্যায় প্রাণীর (প্রকৃতপক্ষে প্রাণীহত্যার) প্রয়োজন হত | বর্তমানে ভাইরাস সমীক্ষার জন্য (isolation & propagation) Cell line কে কাজে লাগান হয় | ভাইরাস বৃদ্ধির জন্য তৈরী Cell line এ ভাইরাস সংক্রামিত (inoculated) করা হয় | এর ফলে Cell এর কোষীয় পরিবর্তন ঘটে (যেমন Cytopathic effect, cell transformation, syneitia formation ইত্যাদি) যা দেখে বলা হয় কোন ধরনের ভাইরাস দ্বারা কোষটি সমক্রামিত হয়েছে | একটি Cell line একটি নির্দিষ্ট ভাইরাসের আক্রমণে একটি নির্দিষ্ট Pattern এর CPE (Cytopathic effect) দেখায় |
প্রশ্ন - কি করে ভাইরাস সংরক্ষণ করা হয় ?
উত্তর - যে Cell line - এ ভাইরাস সংক্রামণ হয়েছে তাকে হিমায়িত করে গলালে (frozen & thaw) ভাইরাস তরল Media - র মধ্যে চলে আসে | তখন এদের সংগ্রহ করে (-)৭০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ভবিষ্যত পরীক্ষার (ferther study) জন্য রেখে দেওয়া হয় |
প্রশ্ন - Cell line কে কিভাবে tozicity পরীক্ষার কাজে লাগানো যায় ?
উত্তর - Cell line এর উপযোগীতা toxicological stuey তেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ | কারণ এতে প্রচুর জীবন্ত প্রাণীর ওপর পরীক্ষা চালনার প্রয়োজন হয় | প্রচুর পরিমাণে একই বয়স ও আকারের ইঁদুর বা প্রাণীর সহজলভ্যতা কম হওয়া কোনও রাসায়নিকের toxicity পরীক্ষায় একটি প্রধান বাধা | তাছাড়া প্রাণীদের দেখভাল করার ব্যাপারটাও খরচ সাপেক্ষ | এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় Cell line এর ব্যবহারে অনেক সহজে, সুলভে ও নির্ভুল ভাবে কোন রাসায়নিকের বিষমাত্রা নির্ণয় করা যায় |
প্রশ্ন - EUS বা মাছের ক্ষতরোগ / লাল রোগ কেন হয় ?
উত্তর - এই রোগ বিগত ১৩ - ১৪ বছর ধরে বর্ষাকালের পর ঠিক শীতের শুরুতে দেখা যাচ্ছে | এই মহামারী রোগের প্রথম দিকে কিছু শোল, ল্যাটা জাতীয় মাছের গায় লাল লাল দাগ দেখা যায় | পরে সেই দাগগুলোই বড় বড় ক্ষতে পরিণত হয়, মাছের লেজ পাখনায় পচন ধরে এবং খসে পড়ে | ক্রমে সমস্ত পুকুরে সব মাছে রোগ ছড়ায় এবং সব মাছ মারা যায় | এই রোগের প্রকোপ বেশী দেখা যায় চাষের জমির পাশের পুকুরে যেখানে বৃষ্টি ধোয়া জলের সাথে জমিতে দেওয়া সার, কীটনাশক ইত্যাদি পুকুরে এসে পড়ে | এই দূষণ শীতকালে পুকুরে জল কমে যাওয়ায় আরও ঘন হয় | সাধারণতঃ কীটনাশক দূষণের ফলে মাছেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় ও অন্য শরীরসম্বন্ধীয় প্রয়োজনীয় কাজের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় | জলে দূষণ ঘন হওয়ার জন্য আমোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় | এই পরিস্থিতি ক্ষত রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়ার পক্ষে খুবই অনুকুল এরা সংখ্যায় অনেক গুণ বেড়ে যায় | সেই মাছগুলোতে এই রোগ আগে হয় - যারা পুকুরের তলার দিকে পাঁকে থাকতে পারে সেসব শোল, ল্যাটা, মাগুর ইত্যাদি | আসলে শীতকালে প্রথমতঃ এরা কীটনাশকের প্রকোপে দুর্বল তারপর অনুকুল পরিবেশ পেয়ে রোগ তৈরীর জীবাণু সংখ্যায় অনেক | কোন ভাবে নোংরা পুকুররের তলায় থাকা কাঁটাঝোপ বা পাথরে কোনে গিয়ে প্রথমদিকে এইসব মাছের গায় কেটে বা ছড়ে যায় এবং এভাবে পুকুরে থাকা জীবাণু মাছের রক্তের সংস্পর্শে আসে | এরপর রক্তে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে জীবাণুরা ক্ষত রোগের মহামারী ডেকে আনে |
প্রশ্ন- EUS রোধে কি করণীয় ?
(১) বর্ষার পরপরই জলের PH দেখে চুন দেওয়া জরুরী ৷
(২) শীতেকালে ভোরবেলা জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় ৷ তা ঠিক রাখার জন্য ভোররাতের দিকে পাম্প চালাতে হবে ৷ এরফলে অক্সিজেন জলে বেড়ে যাবে এবং ফলতঃ অনেক দূষিত পদার্থের চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে ৷
(৩) জলের নীচে কাঁচা ঝোপ খাকলে তা তুলে ফেলতে হবে ৷
(৪) পুকুরের ধারে কৃষি জমি থাকলে পুকুরের চারপাশে বাঁধ দিতে হবে যাতে বর্ষায় কৃষিক্ষেত্র খেকে জল এসে পুকুরে না পড়ে ৷
(৫) বিঘা প্রতি ৫ কেজি হারে মোটা দানার নুন দিলে কাতলা মাছের এবং অন্য মাছের বর্ষার পরে আরও কিছু অদ্ভুত রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ৷
প্রশ্ন- পচন রোগ কেন হয় ?
পরিবহনকালে মাছের বা মাছের পোনার আঘাত লাগলে ঐ ক্ষতস্থানে ছত্রাক দানা বাঁধে ও মাংসপেশীর পচন ঘটায় ৷ সাদা সাদা ছত্রাকের রোয়া দেখা যেতে পারে ৷ মাছ দূর্বল হয় ও ভেসে ওঠে ৷
প্রশ্ন- ফুলকা পচা রোগ কেন হয় ?
পুকুরে অত্যধিক জৈব পদার্থ যেমন - গবাদি পশুর মলমুত্র বা উদ্ভিদজাত পদার্থ পচতে থাকলে এবং জলের গভীরতা কমলে মাছের ফুলকায় পচন ধরে ৷ ফুলকার লাল রং ক্রমশ সাদা হতে খাকে ও মাছটি মারা যায় ৷ লেজ ও পাখনা পচা রোগে মাছকে লিটার প্রতি জলে তিন গ্রাম তুতে গুলে তার মধ্যে ২ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে ৷ এভাবে কয়েকদিন চিকিত্সা করতে হবে ৷
উপরোক্ত দুটি রোগের ক্ষেত্রেই একটি বড় হাঁড়িতে জল নিয়ে লিটার প্রতি জলে ৩০ গ্রাম লবণ গুলে রোগাক্রান্ত মাছকে ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পরে পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে ৷ এভাবে দিন তিনেক চিকিত্সা করতে হবে ৷
প্রশ্ন- লেজ ও পাখনা পচা রোগ কেন হয় ?
অরিরিক্ত জৈব পদার্থ এবং নর্দমার দুষিত জল পুকুরে পড়লে মাছের লেজ ও পাখনার কিনারায় পচন ধরে ৷ পাখনায় প্রথমে একটি সাদা চুলের মত দাগ দেখা যায় ও ক্রমশ পচন বাড়তে বাড়তে সমগ্র পাখনাটি পচে গিয়ে মাংসপেশীতে রোগ ছড়ায় ৷ এর পরেই মাছটি মারা যায় ৷
প্রশ্ন- উদরী রোগ (ড্রপসি) কেন হয় ?
পুকুরে পরিবেশ ও জল দুষিত হলে মাছের দেহকোষ ও আঁশের নীচে জল জমে মাছটি ফুলে ওঠে ৷ এটি ছোঁয়াচে রোগ ৷ সমস্ত মাছই মারা যায় ৷ এ রোগের চিকিত্সা করা বৃথা ৷ তাই পুকুরের পরিবেশের প্রতি নজর দিতে হয় ৷ রোগ ধরা মাছগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা এবং পুকুরের জল শুকিয়ে মাটিতে চুন প্রয়োগ করে পুকুর শোধন করা দরকার ৷
প্রশ্ন- কাতলার চক্ষু রোগ কেন হয় ?
সাধারণত কাতলা মাছের চোখ আক্রান্ত হয় এবং প্রথমে চোখ ঘোলাটে হয় ও পড়ে পচে গিয়ে সাদা হতে থাকে ৷ একইভাবে লিটার প্রতি জলে ৮-১০ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসেটিন মিশিয়ে মাছকে ১ ঘন্টা করিয়া ডুবিয়ে রাখতে হবে ৷ এভাবে দিন তিনেক চিকিত্সা করতে হবে ৷
প্রশ্ন- মাছের গায়ে সাদা দাগ / নীলাভ দাগ দেখা যাচ্ছে ৷ কি করব ?
অধিক পরিমানে পোনা মজুত করলে বা পূর্ব হইতে সংক্রমনের কারণে এককোষী এই প্রাণী ঘটিত রোগগুলিতে মাছের গায়ে সাদা ছিটছিট বা নীলাভ দাগ দেখা যায় ৷ মাছ খুব দুর্বল হয়, আঁশ উঠে যেতে থাকে, মাছের গায়ে ছিদ্র হতে পারে ৷ মাছ না মরলেও বৃদ্ধি একেবারে বন্ধ হতে পারে ৷ দেহের ভিতরের কৃমির জন্য কোন চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই ৷ বাইরের উত্পাত ঠেকাতে বিঘা প্রতি জলকরে ২৫০ গ্রাম গ্যামাক্সিন জলে গুলে ভালভাবে দিতে হবে ও জাল টেনে সমগ্র জলে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে ৷ পুকুরের ভিতরে কাঠ, বাঁশ বা পচে যায় এমন কোন পদার্থ থাকলে তা তুলে ফেসতে হবে ৷ এ সমস্ত লক্ষণ দেখা গেলে প্রতি ৫ লিটার জলে ২ সিসি ফর্মালীন মিশিয়ে তাতে মাছগুলিকে ১ মিনিট ডুবিয়ে তুলে নিতে হবে ৷ এভাবে প্রয়োজন বুঝে ৭-৮ দিন চিকিত্সা করতে হবে ৷
ছোট ছোট দু প্রকার চ্যাপ্টা কৃমি আছে যারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বংশ বৃদ্ধি করে ও মাছের গায়ে ও ফুলকায় আটকে গিয়ে মাছের দেহ থেকে রক্ত শোষণ করে বড় হয় ও পুনরায় বংশ বৃদ্ধি করে ৷ একপ্রকার উকুন জাতীয় পোকা আছে যারা একইভাবে মাছের আঁশের ফাঁকে আটকে থাকে ও রক্ত শোষণ করে ৷ এছাড়া একরকম কৃমি হয় যারা মাছের দেহের ভিতরে প্রবেশ করে ও বড় হয় ৷ এর ফলে মাছের পেট ফুলে ওঠে ও শক্ত লাগে ৷
প্রশ্ন- মাছ ছাড়ার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও উত্পাদন ক্ষমতা কিভাবে নির্ণয় করা হবে ?
জল ও মাটি পরীক্ষা করে পুকুরের উত্পাদন ক্ষমতা নির্ণয় করে শার প্রয়োগ করতে হবে ৷
প্রশ্ন- পোনা মাছের যে ক্ষতরোগ দেখা গেছে সেটা চিংড়ির ঘেরীতে হতে পারে কি ? প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় কি ?
পোনামাছের যে ক্ষতরোগ হয় তা EUS বা Epizotic Ulcorative Syndrome নামে পরিচিত ৷ এই রোগ এখনও পর্যন্ত চিংড়ির হয় নি ৷
প্রশ্ন- মাছ রোগাক্রান্ত হলে কি কি ভাবে ঔষধ প্রয়োগ করা হয় ?
যেহেতু মাছকে মানুষের মত ওষুধ খাওয়ানো যায় না, তাই চার রকম ভাবে এই ওষুধ খাওয়ানো যায় না, তাই চার রকম ভাবে এই ঔষধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে ৷ পদ্ধতিগুলি সবিস্তারে নীচে বর্ণনা করা হল-
(১) Dip প্রণালী- এই পদ্ধতিতে ঔষধের একটি গাঢ় দ্রবণ তৈরী করে অল্প সময়ের জন্য ডুবিয়ে রাখা হয় ৷ যে পাত্রে মাছটিকে Dip treatment দেওয়া হয় সেটি কাঠ, কাচ বা প্লাসটিকের হওয়া বাঞ্ছনীয় ৷ কোন মতেই যেন ধাতুর আধার না হয় ৷ কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা রাসায়নিক যৌগ ধাতুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকারক পদার্থের সৃষ্টি করে ৷ একটি ব্যাপার লক্ষ্য রাখা উচিত যে Dip treatment এর পরে মাছটিকে যেন জীবাণুমুক্ত ও পরিস্কার জলে রাখা হয় ৷ অর্থাত রোগাক্রান্ত পুকুর থেকে তুলে treatment করে আবার তাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় ৷
(২) Bath প্রণালী- এই পদ্ধতিতে ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত রাসায়নিকটির একটি লঘু দ্রবণ তৈরী করে তাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে মাছকে রাখা হয় ৷ Bath প্রণালী বড় চৌবাচ্চা, অধাতব পাত্র, এমনকী ছোটখাট পুকুরে জল কমিয়ে এনে পরিমানমতো ঔষদ প্রয়োগ করেও করা যেতে পারে ৷ তবে এসব ক্ষেত্রে রোগের চিকিত্সার সঙ্গে জলের প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন সঞ্চালনের (বায়ু সঞ্চালন) ব্যবস্থা করতে হবে ৷
(৩) Flush প্রণালী- এই পদ্ধতিতে কোন জলাশয়ের জলবাহী নালায় পরিমাণ মতো ঔষধ / রাসায়নিক মিশিয়ে দেওয়া হয় ৷ এই জলের সঙ্গে ঔষধ মূল পুকুরে গিয়ে পড়ে, মাছকে রোগমুক্ত এবং বর্হিবাহী নালার মাধ্যমে পুকুর থেকে বেরিয়ে যায় ৷
এই পদ্ধতিতে মাছের ফুলকা পচন রোগে কপার সালফেট ব্যবহার করে এবং গাইকোড্যাকটাইলাম আক্রমণে আসিটিক আসিড ব্যবহার করে ভাল করে কাজ পাওয়া যায় ৷
(৪) শেষ প্রনালীটি হল খাদ্যে ঔষধ মিশিয়ে দেওয়া ৷ এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক, ইমিউনোস্টিমুল্যান জেল ইত্যাদি পরিপূরক খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে মাখিয়ে দেওয়া হয় ৷ যখন রোগাক্রান্ত মাছ এই খাবার খায় তখন ওষুধ মাছের শরীরে প্রবেশ করে ৷
প্রশ্ন- পুকুরে আরগুলাস হয়েছে ৷ কি করব ?
আরগুলাস আক্রান্ত পুকুরে নুভান (Nuvan) ৮ মিলিলিটার / বিঘা / মিটার হারে প্রয়োগ করুন ৷ এতে আরগুলাস মারা পড়লেও তার ডিম মরবে না ৷ তাই চারদিন পর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে তখন আবার একই মাত্রায় নুভান দিন ৷ আরগুলাস পুকুর থেকে নির্মূল হবে ৷
লক্ষ্য করা গেছে পুঁটি মাছ আরগুলাস খায় ৷ তাই যথেষ্ট সংখ্যায় এই মাছ ছাড়লে মাস খানেকের মধ্যে আরগুলাস নিয়ন্ত্রণ করা যায় ৷
প্রশ্ন- পরিণত মাছ যদি আরগুলাস আক্রান্ত হয় তবে কি করা উচিত ?
আরগুলাস প্রতিরোধের সবচেয়ে ভাল অবস্থা হল সঠিক পুকুর পরিচালন ব্যবস্থা ৷ পুকুরের তলদেশ কোনও রকম সঞ্চিত জৈব পদার্থ থেকে মুক্ত রাখতে হবে ৷ পাড়ে কোন বড় গাছ রাখা চলবে মা, পাড় পরিস্কার থাকবে ৷ আরগুলাসের আক্রমণ হলে "Cliner" (Glaxo Ind. Ltd.) ১০ একরে ১ লিটার মাত্রায় দেওয়া যেতে পারে ৷ জলের গভীরতা হবে ১-১.৫ মিটারে ৷
পুঁটি মাছ (Puntius ticto) আরগুলাস খেতে ভালবাসে তাই যথেষ্ট পরিমাণে পুঁটি মাছ ছাড়লে তা আরগুলাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ৷
প্রশ্ন- ব্রন্ড মাছের আঁশ খসা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করব ?
(১) বর্ষার আগে বিঘা প্রতি ৪০ কেজি চুন ও ৫ কেজি নুন দিতে হবে ৷
(২) পুকুরে চারদিকে উঁচু করে পাড় দিয়ে বর্ষার সময় ধানক্ষেতের ধোওয়া জল ঢোকা বন্ধ করতে হবে ৷ কারণ এই জলের সঙ্গে কীটনাশক মিশে থাকে ৷
প্রশ্ন- সরষের খোল কি মহুয়া খোলের চেয়ে বেশী কাজ দেয় ?
যখন পুকুর থেকে মাংসাসী মাছ নির্মূল করার প্রশ্ন আসবে তখন মহুয়া খোলই ব্যবহার করতে হবে ৷ যখন খোল সার বা খাদ্য হিসাবে প্রয়োগ করা হয় তখন সরষের খোলের নির্বাচন করাই ঠিক হবে এর কম দামের জন্য ৷
প্রশ্ন- কাতলার বাচ্চা নার্সারী পুকুরে ছাড়ার ৪-৫ দিন পর মারা যাচ্ছে কেন ?
এর সম্ভাব্য কারণগুলি হল -
(ক) মাছের প্রজননের সময় একই মাছ বার বার ব্যবহার করা উচিত নয় ৷ ইনব্রিডিং এর ফলে জেনেটিক ভেরিয়েশন আসতে পারে না ৷ এর ফলে মাছের নতুন পরিবেশে বেঁচে থাকার জীবনী শক্তি কমতে থাকে, রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা কমে যায় ৷
(খ) ভুল ব্রিডিং পেয়ার অর্থাত অসুস্খ, রুগ্ন, বহু ব্যবহৃত মা - বাবা মাছের নির্বাচন, পরিণত মাছের ভুল পরিচলন ব্যবস্থা, উচ্চহারে পরিণত মাছ পুকুরে সঞ্চয় করা, পরিণত মাছকে অপর্যাপ্ত খাদ্য দেওয়া, মাছকে তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠার জন্য বিষাক্ত ও ক্ষতিকর ঔষধ খাওয়ানোও কারণ হতে পারে ৷
(গ) মাছের সংকরায়নের ফলেও এই মড়ক আসতে পারে ৷
(ঘ) ভুল আঁতুড় পুকুর পরিচালন ব্যবস্থা - বিশেষতঃ জলে বেশী পরিমান নাইট্রোজেন থাকলে মাছের পক্ষে ক্ষতিকারক হয় ৷
(ঙ) লক্ষ্য করা গেছে যে ভিটামিন সি, W3 ফ্যাটি আসিড মাছের চোখ পরিস্ফুটনের (Eye development) জন্য অপরিহার্য্য ৷ আর ভিটামিন সি-র অভাবে চোখ ঠিকমতো তৈরী না হলে মাছ তার খাবার খুঁজে নিতে পারে না ৷ ফলে মাছের মড়ক দেখা দেয় ৷ তাই নার্সারী পুকুরে কাতলার বাচ্চাকে দেড় মাস রেখে Live feed খাইয়ে বড় করে বিক্রি করলে তখন আর মড়কের আশঙ্কা থাকবে না ৷ Live feed খাওয়ানোর উদ্দেশ্য হল এতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন সি থাকে ৷
তাই কাতলার বাচ্চাকে হ্যাচিং এর পর থেকেই যদি কৃত্রিম খাদ্যের সঙ্গে জলে অদ্রবনীয় প্রকৃতির ভিটামিন সি খাওয়ানো যায় তবে বেঁচে থাকার হার ভাল হবে ৷ এছাড়া EPA ও DHA - এই দুটি ফ্যাটি আসিড কাতলার বাচ্চার বৃদ্ধির জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় ৷
প্রশ্ন- অনিয়ন্ত্রিত আন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কতটা বিপদজনক ?
চিংড়ি মাছ চাষে রোগ প্রতিরোধ ও দমনের জন্য অনেক চাষী আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন ৷ কিন্তু জলজ প্রাণীচাষে আন্টিবায়োটিকের ব্যবহার অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং কখনই করা উচিত নয় ৷ আন্টিবায়োটিক ব্যবহারে চটজলদি একটা ফল পাওয়া গেলেও এর ক্ষতিকর ফল হয় সূদুরপ্রসারী ৷ প্রকৃতপক্ষে যা করা উচিত তা হলো রোগ সৃস্টিকারী জীবাণুটিকে আলাদা করে তাকে চিহ্নিত করা, তারপর কি ঔষধ প্রয়োগ করে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নির্দিষ্ট করে তার মাত্রা নির্ণয় করা ও কিভাবে এই ঔষধ মাছে প্রয়োগ করা হবে তা নির্ধারণ করা ৷ কিন্থু বাস্তবে তা না করে অবিবেচকের মতো আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় ৷ যার ফলে Vibrio, Aeromonos ইত্যাদি ব্যাকটিরিয়া চট করে -এর জন্ম দেয় ৷ আরও ক্ষতিকর বিষয় হল -এ যেসব আন্টিবায়োটিক থাকে তারা ক্রমাগত আন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়া সৃষ্টি করতে থাকে যা মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক ৷ তাই চিংড়ি বাঁচাতে গিয়ে যে আন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হল তা মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ৷ তাই কখনই পুকুরে রোদ দমনে আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না ৷
প্রশ্ন- আমরা কলকাতার পাশে ভেড়ীতে ময়লাজলে মাছ করি ৷ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে এর উত্পাদন কিভাবে বাড়ানো যায় ?
ময়লা জলে মাছ চাষের পুকুরে ময়লা জল, সাধারণত শহরের জনবসতির সমস্ত নোংরা সমেত, শিল্পাঞ্চলের সমস্ত বর্জ পদার্থ সমেত এসে পড়ে ৷ এই জলে মাছ চাষের পুষ্টি উপাদান ছাড়াও নানা রকম দূষিত পদার্থ থাকে ৷ ভারি ধাতু যেমন, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিসা, জিঙ্ক ইত্যাদি, নানা রকম কীটনাশক ইত্যাদিও ময়লা জলে থাকে যেটা পরিশষে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানব শরীরে এসে পড়ে এবং সেখানে সঞ্চিত হয়- যাকে বায়ো-ম্যাগনিফিকেশন বলে ৷ সুতরাং ময়লা জলে মাছ চাষের ব্যাপারে জলের গুণাগুণ সম্বন্ধে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরী ৷
সাধারণ ময়লা জলের মাছ চাষের খামারে শহর, শিল্পাঞ্চল বাহিত জল প্রথমে একটি "গ্রিড চেম্বারের" মাধ্যমে পাস করিয়ে সরু নালার মাধ্যমে আন আরবিক, আরবিক, ফ্যাকালটেটিভ ইত্যাদি পুকুরের মাধ্যমে সবশেষে মাছ চাষের পুকুরে ফেলা হয় ৷
সরু নালার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে "ম্যাক্রোফাইট" অর্থাত বড় বড় জলজ গাছ থাকা উচিত যেমন কচুরীপানা, টোপাপানা, আজোলা ইত্যাদি ৷ এই ম্যাক্রোফাইটগুলি ময়লা জলে দ্রবীভূত বিভিন্ন প্রকার ভারি ধাতু ও অতিরিক্ত দ্রবীভূত পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নেয় এবং তথাকথিত পরিশোধিত জল আন-আরবিক, আরবিক ও ফ্যাকালটেটিভ পুকুরের মাধ্যমে মাছ চাষের পুকুরে গিয়ে পড়ে ৷ এই পুকুরগুলিতে বিভিন্ন ব্যাকটিরিয়ার দ্বারাও দূষিত পদার্থ নির্মূল করা হয় ৷
একটি পুকুরে প্রাথমিক খাদ্য উত্পাদন হচ্ছে ক্লোরোফিল বহনকারি জলজ জীব যার সূর্যের শক্তিকে ব্যবহার করে জৈব পদার্থ তৈরিতে সাহায্য করে ৷
উদ্ভিদ কণা, আলগি, কিছু ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু ভাসমান এবং নিমজ্জমান জলজ উদ্ভিদই হচ্ছে প্রাথমিক উত্পাদক, যে কোন ময়লা জলের মাছ চাষের পুকুরে ৷
দেখা গেছে কচুরিপানা এক মিলিয়ন ময়লা জল (বসতি অঞ্চলের) এক দিনে এক হেক্টরের জলাতে পরিশোধিত করতে পারে এবং BOD এবং COD- র পরিমাণ ৮৯ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ অবধি কমাতে পারে ৷ একই ভাবে আজোলা, স্পাইরোডেলা, উলফিয়া, লেমনা “ইউট্রিফিকেশনের” সম্ভাবনা কমায় একই সঙ্গে এগুলি গ্রাস কার্প ইত্যাদি মাছের খাবার হিসাবেও ব্যবহার করা যায় ৷
অনেক সময় দেখা যায় ময়লা জলে মাছ চাষের পুকুরে প্রচুর পরিমাণে শামুক গুগলি ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব হয়েছে ৷ সেক্ষেত্রে এইসব পুকুরে পাঙাস মাছ চাষ করা যেতে পারে ৷ দেখা গেছে পাঙাস মাছ শুধুমাত্র গুগলি, শামুক খেয়েও বেশ ভালভাবে চাষ করা যায় ৷ তবে যেহেতু পাঙাস মাছ মাংসাসী সেহেতু পাঙাস মাছের চাষের ব্যাপারে একটু সাবধান থাকা ভাল ৷ যেমন পাঙাসের সাথে অন্যান্য মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি একটু বড় আকারে ছাড়তে হবে যাতে পাঙাস তাদেরকে খেতে না পারে ৷
বিভিন্ন ম্যাক্রোফাইট দ্বারা পরিশোধিত ময়লা জলের মাছ চাষের পুকুরে যে প্রায় পরিষ্কার জল পাওয়া যায় সেখানে গলদা চিংড়ি চাষও করা যেতে পারে ৷
অনেক সময় ময়লাজলের মাছ চাষের পুকুরে বিভন্ন পুষ্টি উপাদানের আধিক্যের জন্য প্রচুর পরিমাণে শ্যাওলা (algae) জন্মায় ও algal bloom তৈরী করে ৷ সেক্ষেত্রে পুকুরে সিলভার কার্প মাছের পরিমাণ বাড়িয়ে শ্যাওলার পরিমাণ কমানো যায় ৷
প্রশ্ন-পাম্পের সাহায্যে মাটির নীচে থেকে তোলা জল হ্যচারীতে ব্যবহার করলে কি ধরনের পরিস্রুতিকরণের (Treatment) প্রয়োজন ?
ক) জল তুলে ২০-৩০ ফুট উচ্চতায় একটি জলাধারে (Tank) রাখতে হবে ৷ এই জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকে খুবই কম ৷ তাই এই জল উঁচু জলাধারে (Overhead Tank) প্রবেশ করানোর সময় একটি সছিদ্র অনুভূমিক নলের সাহায্য নেওয়া হয় ৷ ফলে একটি ধারার (Shower) সৃস্টি হয় ৷ সরু ধারায় জল পড়ার সময় জল অক্সিজেন যুক্ত হয় ৷
খ) জলাধারে জল তোলবার পর তা কিছুদিন ব্যবহার করা উচিত নয় ৷ কিছুদিন জলাধারে জল থাকলে জলের অতিরিক্ত আয়রন অধঃক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে যায় ৷ এই আয়রন বিহীন অক্সিজেন যুক্ত জল হ্যাচারীতে ব্যবহার করা উচিত ৷
ব্লিচিং পাউডার-
অতিরিক্ত সাবধানতা হিসাবে জলাধারের জলকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ১০ পি.পি.এম হারে ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগ করা যেতে পারে ৷ ব্লিচিং প্রয়োগ করার দুইদিন পর উপর থেকে জলাধারের জল অন্য একটি চৌবাচ্চায় স্থানান্তরিত করে একদিন ধরে বায়ু সঞ্চালন করা দরকার ৷ এরপরেও যদি জলে অবশিষ্ট সামান্য মাত্রায় থাকে তা দূর করার জন্য অবশিষ্ট ক্লোরিনের সমসাত্রায় সোডিয়াম থায়োসালফেট জলে গুলে তা চৌবাচ্চার জলে প্রয়োগ করতে হবে ৷ তারপর এই জীবাণমুক্ত জল হ্যাচারীতে ব্যবহার করা উচিত ৷
জলাধারে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহারের আরো একটা সুবিধা হল যে, এটা জলে অবস্থিত ভারী ধাতু আয়রন (Fe2+) ও ম্যাঙ্গানিজকে (Mn+2) অধঃক্ষিপ্ত করে ৷
Ca(OCl)2 <=> Ca2+ + 2OCl
2 Ca(OCl)2 + 4H2O à 2Ca(OH)2 + 4HOCl
2FeO + HOCl à Fe2O3 + HCl
(অধঃক্ষেপ)
4Fe(OH)2 + O2 + 2H2O à 4Fe(OH)3
(অধঃক্ষেপ)
4FeO + O2 à 2Fe2O3
(অধঃক্ষেপ)
2Mn(OH)2 + O2 à 2MnO2 (অধঃক্ষেপ) + 2H2O
প্রশ্ন- ব্রুডার ট্যাঙ্কে গুগলি হয়েছে ৷ কি করব ?
ব্রুড ট্যাঙ্কে পাঙ্গাস মাছ ছাড়া যেতে পারে ৷ কারণ এরা গুগলি খেয়ে বেঁচে থাকে ৷ যেহেতু পাঙ্গাস মাংসাশী মাছ, তাই যে পুকুরে পাঙ্গাস ছাড়া হবে তাতে যেন ছোট মাছ না থাকে ৷ দেখা গেছে একটি পুকুরের মোট মাছের ১০ শতাংশ পাঙ্গাস রাখা যেতে পারে ৷
এছাড়া জলে খেজুর পাতা ফেলে রাখতে পারেন ৷ গুগলি, গেঁড়ি- এরা সাধারণতঃ কোন জিনিসের গায়ে আটকে থাকে ৷ জজলে ফেলা খেজুর পাতার গায়ে এরা আটকালে পাতা তুলে তা থেকে গুগলি ছাড়িয়ে ফেলে দিয়ে ফের জলে পাতা ডুবিয়ে রাখতে হবে ৷ এইভাবে পুকুর থেকে কিছুটী গুগলি কমবে ৷
এছাড়া পুকুর থেকে সব মাছ তুলে নিয়ে চুন প্রয়োগে pH 9.0 তুলে বিঘাপ্রতি ৩ কেজি আমোনিয়াম সালফেট দিয়ে গুগলি মারা যাবে ৷ এরপর মাছ ছাড়ার আগে জলে বায়ু সঞ্চালন করে তবে মাছ ছাড়া উচিত ৷