উত্তর - চাষযোগ্য যেকোন জীবের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত উত্পাদনের চেষ্টা সেই জীবের জীবনধারনণর ক্ষেত্রে এক অভিশাপ | সভ্যতার অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্যের প্রয়োজনে, গবেষণার প্রয়োজনে বা বিনোদনের জন্য জলজ প্রাণীর ব্যবহার এই শতাব্দীতে অনেকগুণ বেড়ে গেছে | যে কোন জীবের অনিয়ন্ত্রিতহারে এবং অসামঞ্জস্য সংখ্যাবৃদ্ধি সমস্ত বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে নষ্ট করে | কোন বাস্তুতন্ত্রে কোন প্রজাতির মাত্রাতিরিক্ত একক চাষ সেই বাস্তুতন্ত্রে শক্তি প্রবাহের ক্ষেত্রে বিপদজনক, কারণ বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত ইকোলিজিক্যাল নীস সমানভাবে ব্যবহৃত না হবার জন্য গোটা বাস্তুতন্ত্রের ছন্দপতন ঘটে, যা কোন জীবের ক্ষেত্রে মঙ্গলজনক নয় | তাই কোন প্রজাতির একক চাষ যদিও সাময়িকভাবে লাভজনক হয় কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত চারাপোনার মজুত, রোগ সংক্রামণের অন্যতম পূর্বশর্ত হয়ে ওঠে | অব্যবহৃত ইকেলজিক্যাল নীস হয়ে ওঠে জীবাণুর বেড়ে ওঠার জন্য অদৃশ্য জৈবক্ষেত্র | সেখানে রোগজীবাণু দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে ছড়িয়ে পড়ে চাষযোগ্য জীবের দেহে, মূলতঃ প্রোটিনের লোভে | জীব ও জীবাণু একই পরিবেশে থাকে | স্বাভাবিক অবস্থায় জীব প্রভাব বিস্তার করে তাই সে সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকে | কিন্তু পরিবর্তিত পরিবেশে যখন জীবাণু প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে তখনই শুরু হয় রোগ এবং মহামারী |

 

 

উত্তর - সংক্ষেপে বলতে গেলে চিংড়ি মাছের রোগের কারণ -

         (১) তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও পি.এইচ- এর হঠাত্ বেড়ে যাওয়া |

 

         (২) উচ্চহারে অনুন্নত মাপের বীজ মজুত করা |

 

         (৩) বীজ খামারে ছাড়ার সময় শোধন না করা |

 

         (৪) অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনুন্নত মানের খাবার পরিবেশন |

 

         (৫) খামারের তলায় জমে থাকা অতিরিক্ত পচে যাওয়া খাবারের অংশ, চিংড়ির মল, ঠিক সময় জল পরিবর্তনের মাধ্যমে

              এবং বায়ুসঞ্চালক যন্ত্রের সাহায্যে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করে খামারের তলা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগের অভাব |

 

         (৬) গাঁয়ে মানে না আপনি ডাক্তার এর বা হতুড়ের পরামর্শে বা নিজেই ডাক্তারের মানসিকতায় অনিয়ন্ত্রিত ভাবে, কোন

               পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কথা না জেনে বিভিন্ন ধরনের আন্টিবায়োটিক ঔষধ ও বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ |

 

         (৭) রোগের পূর্বলক্ষণ দেখেও প্রাথমিক অবস্থায় বিশেষজ্ঞর পরামর্শ না নেওয়া |

         (৮) জল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জলের উতসের অভাব |

 

         (৯) জলের নিম্নগুণগত মান এবং এর থেকে চিংড়িমাছের অপুষ্টি |

 

         (১০) উপযুক্ত চাষ সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাব ও প্রাপ্ত সময়ের মধ্যে অনেক লাভ করে বেড়িয়ে যেতে হবে এই ধরনের

                দায়িত্বজ্ঞানহীন (rape & run) মানসিকতার জন্যই ৫০ শতাংশ খামারের মালিকই খামার নিঃসৃত জল

                পরিশোধন ছাড়াই সমুদ্র বা খাঁড়িতে ফিরিয়ে দেন | আজকে তাই সমুদ্র থেকে বড় মা-বাবা চিংড়ি মাছ ধরা হচ্ছে

                হ্যাচারীতে ডিম ফোটানোর জন্য সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে ভাইরাসের উপস্থিতি |

 

এভাবেই রোগগ্রস্ত খামারের নিঃসৃত জল শত শত খামারে রোগ ছড়িয়ে দেয় |  জলপরিবর্তনের প্রয়োজনে চাষী যে জল পরিবর্তন করেন তা দূষণযুক্ত না থেকে জীবাণুযুক্ত হয়ে থাকে |

 

উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও মেদিনীপুরের সমুদ্র সন্নিহিত এলাকার নোনাজলের ঘেরীতে বাগদা চিংড়ি চাষ করে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন |  এমনিতে এই চাষ খুবই লাভজনক |  কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এক ধরনের রোগ মাছচাষীদের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে যা চিংড়ির সাদা দাগ রোগ (White Spot Disease) নামে পরিচিত |  কিন্তু পুকুরে সঠিকভাবে পরিচালনা করে নিচে বর্ণিত উপায়ে রাসায়নিক ওষুধগুলো ব্যবহার করলে এই রোগ দমন করা মোটেই কঠিন নয় |

 

উত্তর -- রোগ সনাক্ত করুন

 

মনে রাখবেন, এই রোগ দমনের জন্য যেটা সবচেয়ে জরুরী তা হলো প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় |  রোগ যদি ব্যাপকভাবে পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে তখন ওষুধ প্রয়োগ করেও বিশেষ ফল পাওয়া যায় না |  তাই,

 

(১)  চাষ শুরু করার পর রোজ ভেড়ীর পাড়ের কাছের জল ভালো করে দেখুন কোল মাছ মরে পড়ে আছে কিনা |  এছাড়া রোজ

      জাল ফেলে চিংড়ির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করুন |

 

(২)  যদি মরা মাছ পান তবে দেখুন আক্রান্ত চিংড়ির মাথার খোলকে সাদা দাগ আছে কিনা |  দাগের আকৃতি সর্ষে দানার মতো

      এবং খোলকটা ছাড়িয়ে ফেলে দিয়ে ঘসে দেখুন এই দাগ থাকে, না উঠে যায় |  যদি দাগ স্থায়ী হয় তবে আপনি ধরে নিতে

      পারেন যে এটা সাদা দাগ রোগ বা ‘White Spot Disease’ |  

 

(৩) অনেক সময় চিংড়ির শরীরে লালচে রং এসেও মাছ মারা যায় | এখানে দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভেড়ীর মাটির ওপরে

     কালচে খয়েরি রংয়ের আস্তরণ জমে গ্যাস তৈরী হয়ে গেছে | 

 

প্রতিকার -

 

বর্ণিত লক্ষণগুলির কোন একটি দেখা গেলেই কোন মত্স বিশেষজ্ঞকে খবর দিন ও আক্রান্ত মাছ দেখান |  রোগটি সাদা দাগ রোগ (White spot Disease)  বলে চিহ্নিত হলে নিচে লেখা দুটি পদ্ধতির যে কোন একটি অনুসরণ করতে পারেন | 

 

প্রথম পদ্ধতি -

 

(১) ৩ কেজি ব্লিচিং পাউডার এবং ১০ কেজি চুন / হেক্টর ভালোভাবে মিশিয়ে পুকুরে ছড়িয়ে দিতে হবে |

 

(২) ভোর রাতের দিকে বায়ু সঞ্চালক যন্ত্রের ব্যবহার করতে হবে |

 

(৩) জিওলাইট প্লাস ১০ কেজি / ৫ হেক্টর খামারে ব্যবহার করতে হবে এর ফলে জমে ওঠা দূষিত গ্যাস জিওলাইট শোষন করে

     নেবে এবং জল অনেক পরিস্কার হবে |

 

দ্বিতীয় পদ্ধতি -

(১) পুকুরে হেক্টর প্রতি ১০ লিটার ক্লোরিন ডাই অক্সাইড (CLO2) প্রয়োগ করুন, পর পর দুদিন

 

প্রয়োগবিধি -

 

(১) বাজারে যে ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড কিনতে পাওয়া যায় তাতে প্রতি বাক্সে দুটি ৫ লিটারের আধার ও কুড়িটি ৫০ গ্রামের

     প্যাকেট থাকে | একটি প্লাস্টিকের বড় বালতিতে প্রথমে তরল ক্লোরিন-ডাই-অক্সাইড ও তারপর প্যাকেটের গুঁড়ো পদার্থ

     ঢেলে ভালভাবে মগ দিয়ে মিশিয়ে নিন | ০.৫ হেক্টর পুকুরের জন্য ৫ লিটারের এক আধার তরল ও দশটি প্যাকেট গুলে

     সমস্ত ভেড়ীতে সমানভাবে ছড়িয়ে দিন | কখনই আলুমিনিয়াম পাত্রে দ্রবণটি মিশাবেন না |   

 

(২) ক্লোরিন-ডাই-অক্সাইড দেবার ২৪ ঘন্টা বা একদিন পর জলের পি.এইচ অতি অবশ্যই দেখা দরকার |  পি.এইচ যদি ৬ -

      ৬.৫ এর মধ্যে হয় তবে হেক্টর প্রতি ৩০ কেজি ডলোমাইট, যদি পি.এইচ ৬.৫ - ৭ তবে হেক্টর প্রতি ২২ কেজি এবং

      পি.এইচ ৭.৫ হলে ১৫ কেজি ডলোমাইট অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে |  কারণ ক্লোরিন-ডাই-অক্সাইড প্রয়োগ করলে

     জলের পি.এইচ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে |   

 

(৩) জিওলাইট প্লাস ১০ কেজি / ৫ হেক্টর খামারে ব্যবহার করতে হবে | এর ফলে জমে ওঠা দূষিত গ্যাস জিওলাইট শোষন করে

     নেবে এবং জল অনেক পরিস্কার হবে |

      

তৃতীয় পদ্ধতি --

 

(১) হেক্টর প্রতি ৩৫ কেজি নিমখোল রাত্রে জলে ভিজিয়ে রাখুন | পরদিন ভালো করে খোলের নির্যাস বার করে ছেঁকে নিয়ে ঐ

     জল সারা ভেড়িতে ছড়িয়ে দিন |

 

(২) নিমখোল নির্যাস প্রয়োগে চিংড়ির ডাইরিয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে |  সেজন্য নিমখোল নির্যাস প্রয়োগের আগের দিন

     থেকে  দুদিন পর পর্যন্ত প্রদেয় খাদ্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিত | নিমের নির্যাস ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে |  এছাড়া

    এমনিতেই রোগ হলে খাবার দেওয়া বন্ধ রাখা দরকার |  

 

(৩) নিমের নির্যাস প্রয়োগের দুদিন পর পুকুর / ভেড়ীর জলে হেক্টর প্রতি ৮০ গ্রাম মিথিলিন ব্লু  ভালো করে জলে গুলে ছড়িয়ে

     দিন |  মিথিলিন ব্লু  ভিব্রিও জাতীয় সুযোগ সন্ধানী ব্যাকটিরিয়ার ওপর কাজ করবে, অর্থাত্ তারা মারা যাবে |

 

(৪) এর সাথে বায়ুসঞ্চালক যন্ত্র ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায় |

 

(৫) জিওলাইট প্লাস ১০ কেজি / ৫ হেক্টর খামারে ব্যবহার করতে হবে | এর ফলে জমে ওঠা দূষিত গ্যাস জিওলাইট শোষন করে

     নেবে এবং জল অনেক পরিস্কার হবে |

 

আর কি কি করবেন --

 

(১) প্রতি কেজি খাবারের সঙ্গে ১ গ্রাম ভিটামিন সি, ৪.৫ গ্রাম সেলেনিয়াম ও ২ গ্রাম ইষ্ট পাউডার ফিস অয়েল বা গুয়ার গাম বা

     ডিম ভেঙে বা সাবু গরম করে তাতে মিশিয়ে খাবারে মাখিয়ে একটু শুকনো করে চিংড়িকে খেতে দিন |

 

 

(২)  ওষুধ প্রয়োগের সাত দিন পর পর্যন্ত খামারের জল পরিবর্তন বন্ধ রাখবেন | যখন জল পরিবর্তন করবেন তখন অবশ্যই

      প্রবেশ ক্যানালের জলের গুণাগুণ দেখে নেবেন এবং নিকাশী নালাতে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে খামারের দূষিত জল বের

      করবেন |  নয়ত দূষিত জীবাণুযুক্ত জল সেখান থেকে অন্য খামারে ঢুকে রোগকে মহামারীর চেহারা দেবে |

 

(৩) কিছু বায়ু সঞ্চালক ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে | কারণ জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি বিশেষতঃ জলের তলার

     দিকে ভিব্রিও জাতীয় সুযোগ সন্ধানী ব্যাকটেরিয়াদের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলে যা থেকে মাছের শরীর লাল হয়ে যাওয়া রোগ

     দেখা যায় |

 

 

উত্তর - এই রোগে আক্রান্ত পুকুরের জলের পি.এইচ হয় বেশী অর্থাত্ ক্ষারীয় | জলের তাপমাত্রাও বেশী থাকে |

 

এই রোগের কারণ যে জীবাণু ভাইরাস তা ভেড়ীতে প্রায়োগকরা কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে বা মীনের মাধ্যমে আসতে পারে |

 

এছাড়াও পরিবেশগত কারণ যেমন জলে দ্রবীভুত অক্সিজেন কমে গেলে তা রোগ ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে |

 

এছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষায় লক্ষ্য করা গেছে যে  Vibrio parahemoliticus প্রজাতির ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা জলে বেড়ে যায় |  সুতরাং বলা যায় সাদা দাগ রোগের ক্ষেত্রে V.parahemoliticus indicator প্রজাতির কাজ করে |

 

 

 

উত্তর -- (১) ভাল, রোগমুক্ত মীন পুকুরে মজুত করতে হবে |

 

          (২)  পুকুরে জল ঢোকানোর আগে তার গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখে নিতে হবে |  জল পরিবহন সন্ধ্যায় করা বাঞ্ছনীয় |

 

          (৩) চিংড়ির যদি পরিপূরক খাদ্য দেওয়া হয় তবে তা নিজেকে বানিয়ে নিতে হবে |

 

          (৪) সপ্তাহে ২ - ৩ দিন জলে নেমে হাঁটতে হবে | ফলে মাটিতে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস যথা H2S নিষ্ত্রান্ত হবে |

 

          (৫) রোগের জন্য Antibiotic বা মিথিলিন ব্লু  দিলে তার তিনদিন পর থেকে ধীরে ধীরে জলটা পরিবর্তন করে দিতে

               হবে | নীচে থেকে জল বার করে জল ঢোকাতে হবে |

 

          (৬) চাষ চালাকালীন অতিরিক্ত চুন দেবার দরকার নেই | প্রয়োজনে ডালোমাইট দেওয়া যেতে পারে |

 

আরও কিছু দরকারী কথা --

 

(১) ভেড়ীতে যদি শ্যাওলার আধিক্য (Algal bloom) দেখা যায় তবে তার আংশিক তুলে ফেলা জরুরী | এক্ষেত্রে মনে রাখা

     দরকার যে এক চতুর্থাংশ অংশে শ্যাওলা জলাশয়ের প্রাণীদের উপকারই করে |

 

 

(২) ভেড়ীতে ভাঙা পাইপ, কাটা টায়ার ইত্যাদি জিনিস যাতে চিংড়ি খোলস ত্যাগের পর লুকিয়ে থাকতে পারে, তা থাকা জরুরী |

 

 

 

(৩) জলবাহী নালায় (Inlet Canal)  ঝিনুকের খোল রাখা যেতে পারে |  ঝিনুকের খোলায় বন্ধু ব্যাকটিরিয়া তৈরী হয় যা

     জলের আমোনিয়াকে অক্সিজেনযুক্ত করে স্বাভাবিক গুণমান বজায় রাখতে সাহায্য করে |

 

(৪) বহির্বাহী নালা (Outlet Canal) ও বায়োপন্ডের (Biopond) চারদিকে লবণাম্বু উদ্ভিদ লাগানো পরিবেশের পক্ষে

     হিতকর | ভেড়ীর চারপাশেও কিছু এই ধরনের গাছ (Mangrove plant) লাগানো যায় | এরা ‘Extra nutrient

     load’ বা জমে থাকা অতিরিক্ত খাদ্য নিজেদের খাদ্য হিসাবে শোষণ করে জলের গুণমান বজায় রাখতে সাহায্য করবে |

 

 

(৫) মাছ তুলে সঙ্গে সঙ্গে বরফ দিতে হবে | তারপর তা বাজারে চালান দিতে হবে |

 

চিংড়ির লাল হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ----

এটি খাবারে থাকা ছত্রাকের থেকে সংক্রামিত রোগের লক্ষণ হতে পারে | চিংড়ির  Immunity system বা রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা খুবই দুর্বল ও অনুন্নত | তাই খারাপ খাবার থেকে চিংড়ি সহজেই রোগাক্রান্ত হয় |

 

 

(৬) ভোরবেলায় যখন ভেড়ীর দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় তখন ভেড়ীর চারপাশে ঘুরে দেখা উচিত কোন চিংড়ি মাছ পাড়ের কাছে ভাসছে কিনা | এইরকম ভাসতে থাকা মাছকে আলোর বিপরীতে ধরে দেখতে হবে পাচননালী (Intestive) খাদ্যে পূর্ণ কিনা |  যদি দেখা যায় পচননালী খালি তবে বুঝতে হবে মাছ রোগগ্রস্থ | এক্ষেত্রে পুকুরে খাবার দেওয়া একদম বন্ধ করতে হবে | পুকুরে নেমে হাঁটতে হবে যাতে নীচের মাটি ঘেঁটে যায় | এরপর নীচ থেকে জল বার করে জল ঢোকাতে হবে |

 

                     টেরামাইসিন দিয়েছি | কী করব ?

 

উত্তর - মাছের রোগ দমনে আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে | তার কারণ যে রোগ জীবাণুঘটিত তাকে মারার জন্য দরকার

         আন্টিবায়োটিক | তবে ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে বা তার হঠকারী ব্যবহারের ফল খারাপ হতে পারে |

         আন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে তার থেকে প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়া সৃষ্টি হতে পারে যাদের ঐ আন্টিবায়োটিক ব্যবহারে

         আর মারা যাবে না |  ক্লোরামফেনিকল নামক আন্টিবায়োটিক মাছের রোগদমনে ব্যবহার করা একেবারেই ঠিক নয় |

         কারণ ক্লোরামফেলিকলকে পরিবেশ থেকে সহজে সরানো যায় না (Non-biodegrable) | এমনকী ৫০ ডিগ্রি

         সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়ও এটির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় না | তাই সহজেই অব্যবহৃত ক্লোরামফেনিকল ব্যাকটিরিয়ার সংস্পর্শে

         এসে ক্লোরামফেনিকল প্রতিরোধী ব্যাকটিরিয়ার জন্ম দেয় যা ক্ষতিকর |  তাছাড়া আন্টিবায়োটিকগুলি রোগ দমনের সঙ্গে

         সঙ্গে মাছের শরীরের ক্ষতিসাধন করতে পারে | আবার ক্লোরামফেনিকলের মতো আন্টিবায়োটিকগুলি মাছের মাধ্যমে

         মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অবাঞ্চিত ফল দিতে শুরু করে |

 

তাই শুধুমাত্র পাখনাপচা রোগেই অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (OTC) ব্যবহার করুন | সাদা দাগ রোগ বা EUS এ ব্যবহার না করাই ভাল | ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যাবে না |

 

 

উত্তর -এক্ষেত্রে রোগ সংক্রামনের যথেষ্ট সম্ভাবনা | পাশের ভেড়ীর জল না ঢোকে, তাদের জাল বা অন্য কিছু ব্যবহার চলবে না |  

         জলের পি.এইচ. ৭.৫ - ৮.০ রাখতে হবে | মিথিলিন ব্লু  ১০ গ্রাম / বিঘা হারে জলে মিশিয়ে দিতে হবে | খাবারের সাথে

         ভিটামিন সি - ১ গ্রাম / কেজি হারে দিতে হবে |

 

 

 

উত্তর - White spot হলে মাছ তুলে বিক্রি করে দিতে হবে |

 

 

উত্তর - আমাদের দেশের বাগদা চিংড়িচাষে সাদাদাগ রোগ মহামারী হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রায়ই | এই রোগ চিংড়ি চাষীদের কাছে

         আতঙ্কের কারণ | দক্ষিণ-পূর্ব্ব এশিয়ার বাগদা চিংড়ির মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব, আবার এই বাগদা চিংড়িই অনেক

         সময় রোগটিকে সহন (tolerate) করতে পারে | প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় যে চিংড়ি বীজের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভাইরাস

         বহন করলেও তাদের রোগের লক্ষণ থাকে না | (Baticados et. al 1991; Lightner et. al. 1992) |  রোগ

         সমস্যা দেখা দেয় তখনই যখন চিংড়ির পক্ষে প্রতিকুল পরিবেশের ফলে রোগজীবাণুরা সুবিধা পায় এবং তারা দ্রুত বংশ

         বিস্তার করে |

WSSV বা হোয়াইড স্পট সিনড্রোম ভাইরাস সেই সমস্ত কলাকোষকে আক্রমণ করে যাদের উত্পত্তি হল একটোডারমাল ও মেসোডারর্মাল কলা থেকে | এপিথেলিয়াল কলা, পাকস্থলী, হাইপোডার্মাল কলা, উপাঙ্গ, রক্তসৃষ্টিকারী কলা, লসিকা কোষে এই

 

ভাইরাস আক্রমণ করে | এই ভাইরাস চিংড়ি ছাড়াও কাদা কাঁকড়া (Scylla serrata), কপিপড ইত্যাদি কবচী প্রাণীকেও আক্রমণ করে তার প্রমাণ আছে | যখন WSD প্রথম ভারতে দেখা দেয় (১৯৯৪ - ১৯৯৫) তখন আক্রান্ত মাছের শতকরা ১০০ শতাংশই মারা যেত | পরবর্তীকালে যখন এই রোগ দেখা দিয়েছে তখন দেখা গেছে যে মাছের মৃত্যুর হার কম এবং সঠিক পরিচালন ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাষে সফলতা পাওয়া গেছে |

 

রোগ প্রতিরোধী কৌশল -

প্রায় অর্দ্ধশতাব্দী পূর্বে প্যাথলজিস্টি Sinezko বলেছিলেন যে জলীয় পরিবেশে রোগ জীবাণু, পোষক প্রাণী ও পরিবেশের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে | এটা চিংড়ির সাদা দাগ রোগের ক্ষেত্রে ভীষণ ভাবে সত্যি |

 

(১) রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে এড়িয়ে চলা - ভাইরাস রোগের ক্ষেত্রে রোগ জীবাণুকে এড়িয়ে থাকার বিষয়টা খুবই জরুরী | এটা এড়াতে গেলে জানতে হবে যে জীবাণুর বাসস্থান, তার পোষক এবং কি করে জীবাণুটি পরিবেশে বেঁচে থাকে সেই নিয়মগুলি | চিংড়ির সাদা দাগ রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু বেশ কয়েকটি কবচী প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারে | পরিবেশের কিছু কিছু অবস্থায় কোন কোন প্রাণীর মধ্যে ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারে | এইসব অবস্থায় নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ও তার উপস্থিতির ফলে কোন কোষীয় পরিবর্তন সাধারণ Histopatological পরীক্ষায় ধরা যায় না | বর্তমানে এই ভাইরাস আক্রমণ PCR (পলিমারেজ চেন রিআকশন) পদ্ধতিতে নির্ণয় করা যায়, এমনকী তা নিষ্ক্রিয় ভাইরাস হলেও অতি আধুনিক nested PCR পদ্ধতিতেই এই ভাইরাসকে যে কোন পোষক বা বাহক প্রাণীতে নির্ণয় করা যায় | তাই হ্যাচারীতে Brood Stock Post Larva দের নিয়মিত PCR পরীক্ষা করাই হলো ভাইরাসের সংক্রমণ আটকানোর প্রথম পদক্ষেপ |

 

কিন্তু মাছ ছাড়ার পরেও জলের সঙ্গে বা অন্য কোন বাহক মারফত সাদা দাগ রোগের ভাইরাস ভেড়ীতে ঢুকে পড়তে পারে | তাই জলে ক্লোরিন ও ফর্ম্যালিন প্রয়োগ করা যেতে পারে | কিন্তু এক্ষেত্রে অসুবিধা হলো এদের প্রয়োগে জলে প্ল্যাঙ্কটন ও অতি প্রয়োজনীয় জীবাণু যারা জৈব ভূরাসায়নিক চক্রে অংশগ্রহণ করে তারা মারা যায় |

 

(২) পোষক প্রাণীর অবস্থার উন্নতি -  মেরুদন্ডী প্রাণীর একটি নির্দিষ্ট ইমিউনিটি সিস্টেম থাকে | কিন্তু চিংড়ির এই তন্ত্র খুবই অনুন্নত |  প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে চিংড়ির cellular humoral - এই দুইধরনের ইমিউনিটি সিস্টেমই আছে | চিংড়ির রক্ত ও লসিকায় জীবাণু, আন্টিজেন, তঞ্চক ইত্যাদি নির্দ্ধারণের জন্য লেকটিন পাওয়া যায় এবং রক্ত কোষের জীবাণুনাশক কার্যক্ষমতা,উত্সেচক ক্ষরণ ক্ষমতা ও ফেলন অক্সাইড সিস্টেম ইত্যাদি বর্তমান | চিংড়ির ইমিউনিটি সিস্টেম লাইপোপলিস্যাকারাইড, পেপটিডোক্লাইক্যান এবং গ্লুকানের ব্যবহারে অধিক কর্মক্ষম হয় | এগুলি চিংড়িকে খাদ্যের সঙ্গে দেওয়া যায় | ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট জেল ব্যবহারে রোগগ্রস্থ চিংড়ির বাঁচার হার বাড়তে দেখা গেছে | কিন্তু এদের প্রভাব ৫ - ৬ দিন মাত্র থাকে | তাই ঐ সময় পর আবার ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট জেল ব্যবহার করা যেতে পারে | পরীক্ষা লব্ধ ফলে দেখা গেছে WSD আক্রান্ত ভেড়ীতে ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট জেল ব্যবহারে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চিংড়িকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে |

 

 

পরিবেশের প্রভাব -

রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু রোগ তৈরী করবে কিনা তা অনেকাংশে নির্ভর করে পরিবেশের উপর | জলাশয়ে বর্জ্য পদার্থের সঞ্চয়, আমোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পরিবেশকে দূষিত করে | তাই দরকার নিয়মিত জল পরিবর্তন | বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থগুলি NH3 N2S কে জারিত করতে পারে এমন জীবাণু দিয়ে ভেঙে দেওয়া দরকার | তাই চিংড়ি চাষে জীবাণুর ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ | আধুনিককালে প্রোবায়োটিক্স নামে কতকগুলি জিনিস বাজারে পাওয়া যায় | যাতে জল শোধনের জন্য বিভিন্ন ধরণের জীবাণু ও উতসেচক থাকে | যারা NH3 H2S কে জারিত করতে পারে |

 

তাই PCR টেস্ট, ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট জেল ও প্রোবায়োটিক্সের, সঠিক ব্যবহারই চিংড়ি চাষে সাফল্য আনতে পারে |