মাছের জননে হরমোনের ভূমিকার ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ভাবে বলা যায়, কোন পরিবেশগত উত্তেজনা (এনভায়রনমেন্টাল স্টিমুলি) ব্রেনে আঘাত করার ফলে গোনাডোট্রপিন রিলিসিং হরমোন (GnRH) নিসৃত হয়, (হাইপোথ্যালামাস থেকে) ৷ এই GnRH রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়ে পিটুইটারী গ্ল্যান্ডে পৌঁছায় এবং সেখানে গোনাডোট্রপিন কোষের পর্দার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বন্ধনে বাঁধা পড়ে এবং এই গোনাডোট্রপিন কোষ থেকে গোনাডোট্রপিন হরমোন (GTH) নিসৃত হয় ৷ মাছের ক্ষেত্রে  GTH  দু রকমের ৷ গোনাডোট্রপিন হরমোন এবার রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয় এবং তাদের লক্ষ্য থাকে গোনাড অথবা মূল জনন অঙ্গ ৷ এই GTH নির্দিষ্ট বন্ধনের দ্বারা শুক্রাশয়ের লেডিগ কোষে এবং ডিম্বাশয়ের থিকা এবং গ্রানুলোসা কোষের সঙ্গে বাঁধা পড়ে ৷ এর ফলে সেক্স স্টেরয়েড হরমোন নিসৃত হয় এবং ফলশ্রুতি হিসাবে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর পরিণতি প্রাপ্ত হয় ৷ এর পর শুক্রাণুর এবং ডিম্বাণু জলে নিসৃত হয় যেখানে বহিঃনিষেক ঘটে ৷

 

পিটুইটারী অথবা হাইপোফাইসিস ছোট গোল সর্ষের দানার মতো গ্ল্যান্ড যেটা ব্রেনের সাথে হাইপোথ্যালামাসের দ্বারা যুক্ত থাকে ৷ এই পিটুইটারী থেকে নিসৃত হয় গোনাডোট্রপিন হরমোন যেটা মাছের জননে প্রধান ভূমিকা পালনে করে ৷ প্রণোদিত প্রজননে এই পিটুইটারী গ্ল্যান্ডকে পরিণত মাছের থেকে সংগ্রহ করে, তার দ্রবণ বানিয়ে মাছকে ইনজেকশন দেয়া হয় ৷ কিন্তু পিটুইটারী গ্ল্যান্ড দিয়ে প্রজননের কিছু অসুবিধা দেখা যায় ৷ যেগুলি-

 

১) পিটুইটারী গ্ল্যান্ড গোনাডোট্রপিন ছাড়াও প্রোল্যাক্টিন, আড্রিনোকরটিকোট্রপিক হরমোন (ACTH), থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH), সোমাটোট্রপিক হরমোন (STH) এবং মেলানোসাইট স্টিমুলেটিং হরমোন (MSH) বের হয় ৷ পিটুইটারী থেকে গোনাডোট্রপিনকে বাদবাকি হরমোনের থেকে আলাদা করা প্রচুর ব্যয় এবং সময় সাপেক্ষ  ব্যাপার ৷ সেজন্য গ্ল্যান্ড প্রনোদিত প্রজননে মিশ্র হরমোন ব্যবহার করা হয় ৷

 

২) বাজারে যে সমস্ত পিটুইটারী কিনতে পাওয়া যায় তার মধ্যে সমস্ত গ্ল্যান্ডের কার্যক্ষমতা সমান নয় ৷

 

৩) প্রয়োজনের সময় পরিমাণমত এবং গুণগত মানের পিটুইটারী গ্ল্যান্ড মাঝে মাঝে পাওয়া যায় না ৷

 

৪) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসুবিধা হল পিটুইটারী হরমোন স্ত্রী মাছকে দুবার ইনজেক্ট করতে হয় ৷ তাতে ব্রুডার মাছের শারীরিক অসুবিধা হতে পারে ৷

 

এখন বাজারে অনেকরকম কম সিন্থেটিক হরমোন পাওয়া যায় - যেমন- ওভাপ্রিম (সিয়াডেন ল্যাবরেটরি, কানাডা), ওভাটাইড (হিমোফার্মা, মুম্বাই), ওভা এফ এইচ (ওখার্ট প্রাইভেট লিমিটেড) ইত্যাদি ৷ এই হরমোনগুলি ব্যবহারে সুবিধাগুলি হল -

১) হরমোনগুলিতে গোনাডোট্রপিন হরমোন শুদ্ধ ভাবে থাকে ৷ এখানে অন্যান্য অদরকারি হরমোন থাকে না ৷

 

২) বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং  রেফ্রিজারেটর সংগ্রহ করে রাখা যায় ৷

 

৩) ব্যবহারের কোন অসুবিধা নেই ৷ শুধু পরিশ্রুত জল দিয়ে পাতলা করে ব্যবহার করা হয় ৷

 

৪) একবার মাত্র ইনজেকশন দিতে হয় ৷ অর্থাত সিঙ্গল ডোজ ৷

 

৫) হরমোনগুলি দামও ন্যায্য ৷

 

এই সমস্ত কারণগুলির জন্য প্রণোদিত প্রজননে এই সিন্থেটিক হরমোনের ব্যবহার অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত ৷

 

 

 

সোজা কথায় Inbreeding মানে নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ ৷ যে কোন জীবের ক্ষেত্রেই এই কথাটা খাটে যে যত নতুন ধরনের variation একটি বংশগতিতে আসে সেই বংশের বংশধরগণ সঞ্জীবিত হন (Rejuvinate) এবং বংশধরগণের মধ্যে নতুন এবং ভাল গুণ নতুন  gene”  এর মাধ্যমে (প্রকৃতপক্ষে allele) আসতে থাকে ৷ শুধু তাইই নয় ডারউইনের প্রাকৃতিক বিবর্তনবাদ তত্ত্ব অনুযায়ী খ্রমাগত উত্কৃষ্ট বংশধর তৈরী হতে থাকে ৷

Inbreeding হলে এই নতুন allele এর আগমন বংশগতিতে বন্ধ হয়ে যায় এবং সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা বা রোগ, কম বৃদ্ধি প্রভৃতি দেখা দেয় ৷

Inbreeding এর ঘটনা ঘটে মাছেদের মধ্যেও, যদি একই মাছ ও তাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে বারবার প্রজনন ঘটান হয় ৷ অর্থাত মা বাবা মাছেদের যাবতীয় খারাপ গুণগুলো ক্রমশঃ বাচ্চা মাছেদের মধ্যে সম্মিল্ত হয়ে একটা বড়ো ধরনের সমস্যা তৈরী হয় ৷ ক্রমশঃ মাছেদের বৃদ্ধি কমে যায় ৷ তাই প্রজননে মাছ নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখা দরকার Inbreeding senescence যাতে না আসে ৷

 

পরিণত মাছের স্বাস্থ্য ও অবস্থা দেখে একটি স্ত্রী বা পুরুষ মাছকে সর্বাধিক তিনবার (বর্ষার শুরুতে, ভরা বর্ষায় ও বর্ষার শেষদিকে) ব্যবহার করা যেতে পারে ৷

 

 

পিটুইটারী হচ্ছে একটি গ্রন্থি যা মাছের মস্তিষ্কের পিছন দিকে থাকে ৷ এই পিটুইটারী গ্রন্থিকে ভেঙ্গে, পিষে তার নির্যাস বের করে মাছকে ইনজেকশন দেওয়া হয় প্রণোদিত প্রজনন করানোর জন্য ৷ প্রণোদিত প্রজননের জন্য যে  হরমোনটি মূলতঃ দরকারী তা হল গোনাডেট্রিপিন ৷ এই গোনাডেট্রিপিন পিটুইটারী গ্রন্থিতে উপস্থিত থাকে ৷ শুধুমাত্র গোনাডেট্রিপিনই নয়, আরও নানারকম হরমোন যেমন সোমাটোট্রপিক হরমোন, প্রোল্যাকটিন, কর্টিকোট্রপিক হরমোন ইত্যাদি পিটুইটারীতে থাকে যেগুলি প্রজননে কোনও কাজে আসে না ৷

 

অপরদিকে কৃত্রিম হরমোনে থাকে শুধুমাত্র গোনাডেট্রিপিন ৷ এর সঙ্গে দেওয়া হয় ডোপামিন আনটাগোনিস্ট অর্থাত যারা ডোপামিনকে কাজ করতে বাধা দেয় ৷ কারণ ডোপামিন গোনাডেট্রিপিনকে কাজে বাধা দেয় ৷ তাই কৃত্রিম হরমোনে যা দেওয়া হয় তা শুধুমাত্র প্রজননেরই সহায়ক ৷ এটা অনেক বেশী শুদ্ধ ৷ এই হরমোন ব্যবহারে হরমোন তৈরীর কোনও ঝামেলা নেই এবম মাছকে একবার ইনজেকশন দিলে কাজ হয় বলে মাছের  Stress ওপর কম হয় ৷

 

 আর্থিক দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় পিটুইটারী নির্যাস সাশ্রয়কর ৷

 

পিটুইটারী গ্রন্থি নির্যাসের প্রধান কাজ মাছকে উত্তেজিত করা ৷ এই নির্যাসে দুই ধরনের হরমোন থাকে - ক) ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন এবং খ) লিউটিনাইজিং হরমোন ৷ প্রথমটি স্ত্রী মাছের ওভারির ওপর কাজ করে এবং দ্বিতীয়টি পুরুষ মাছের শুক্রাশয়ের ওপর ৷ এর ফলে ওভারি বা ডিম্বাশয় থেকে ডিম ও শুক্রাশয় থেকে শুক্রকীট নির্গত হয় ৷

 

 

 

কৃত্রিম প্রজননের জন্য বৃষ্টিমুখর দিনের বা মেঘলা আবহাওয়া অনুকূল হলেও আবশ্যিক নয় ৷ আবশ্যিক হল ২৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড - ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা ৷

 

 

 

স্ট্রিপিং পদ্ধতিতে সাইপ্রিনাস মাছকে প্রজনন করানোর পদ্ধতি অন্যান্য মেজর কার্পের মতোই ৷ যেহেতু এই মাছের ডিম আঠালো প্রকৃতির তাই এরা দলা পাকিয়ে থাকে ৷ এই আঠালো প্রকৃতি দূর করার জন্য নীচের পদ্ধতির সাহায্য নিতে পারেন--

 

দ্রবণ ক - 0.8% NaCl + 0.3% ইউরিয়া ৷ এক লিটার ডিমের জন্য ১০ লিটার দ্রবণ দরকার ৷

দ্রবণ খ - এক লিটার জলে ১ গ্রাম ট্যানিক আসিড ৷  এক লিটার ডিমের জন্য ২ লিটার দ্রবণ খ দরকার ৷

দ্রবণ গ - খ দ্রবণ দুবার লঘু করা হল ৷  এক লিটার ডিমের জন্য ১ লিটার গ দ্রবণ দরকার ৷

 

পদ্ধতি - মাছের ডিম ও মিল্ট ভালোভাবে মেশানোর পর দ্রবণ ক নিষিক্ত ডিমের ওপর ২-৩ মিনিট ঢালা হয় এবং তারপর নতুন দ্রবণ (fresh solution) ঢালা উচিত ৷ এই পদ্ধতি ৪০ মিনিট ধরে পুনরাবৃত্তি করা হয় যতক্ষণ না ডিমের আঠালো ভাব নষ্ট হয় এবং প্রতিটি ডিম আলাদা হয় ৷ এরপর দ্রবণ খ কয়েক সেকেন্ড ঢেলে, নেড়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং পদ্ধতি দ্রবণ গ দিয়ে পুনরাবৃত্তি করা হয় ৷ ডিমের শক্তকরণের (Hardening)জন্য দ্রবণ খ ও গ দিয়ে ধুয়ে নেওয়া দরকার ৷

শেষে ডিমগুলো ভালো ক্লোরিনবিহীন জল দিয়ে ১০ মিনিট ধুয়ে ইনকিউবেটরে রাখা হয় ৷ একটি গোল প্যান যার ১০ লিটার ধারনক্ষমতা তা দিয়ে ২-৩ লিটার ডিম আঠাবিহীন করার উপযুক্তরূপে গণ্য করা হয় ৷

আর একটি উন্নত প্রথায়, দ্রবণ ক দিয়ে প্রথমে ৩-৪ মিনিট নিষিক্ত ডিম ধুয়ে এক লিটার জলে ৪ গ্রাম NaCl ও ২০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে তা দিয়ে আরও ৩০ মিনিট ধোওয়া উচিত ৷ পদ্ধতিটি সময় ও শ্রমের সাশ্রয় করে ৷ শুধু প্রতি ১৪-১৫ মিনিট ছাড়া নতুন দ্রবণ ঢালতে হবে ৷

 

 

            এক থেকে দেড় মাস ৷

 

 

শোল, ল্যাটা মাছ যথেষ্ট সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এখন এদের যথেষ্ট চাহিদা ৷ এইসব মাছের দামএ কম নয় আর পুষ্টিমূল্যও যথেষ্ট ৷ মাছগুলিতে অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র (airbreathins fish) থাকার জন্য এদের বাঁচানো সহজ ৷ তাই উত্সাহী মাছচাষীরা এদের প্রজনন ও চাষের কথা চিন্তা করতে পারেন ৷ FEO বা ছোট ছোট পড়ে থাকা ডোবাতে মত্স্যচাষীদের এই আগ্রহী করাতে পারেন ৷ নীচে এদের কৃত্রিম প্রজননের পদ্ধতি দেওয়া হলো ৷

প্রথমতঃ একই সাইজের ডিম ভর্তি স্ত্রী ও পরিণত পুরুষ মাছ নির্বাচন করে স্ত্রী মাছকে ১ মিলি প্রতি কেজি হারে এবং পুরুষ মাছকে ০.৫ মিলি প্রতি কেজি হারে কৃত্রিম হরমোন intra-pectorally ইনজেকশন দিতে হবে ৷ নিষেক ঘটে ১৬-২০ ঘন্টা পর ৷ ব্রিডিং পুলে শিকড়সমেত কচুরিপানা ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে ৷ কারণ শোল মাছের ডিম আঠালো প্রকৃতির হওয়ায় তা কচুরীপানার শিকড়ে আটকে থাকে ৷

 

শোল মাছের কৃত্রিম প্রজনন করানোর জন্য বৃষ্টির দিনের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই ৷ শোল মাছ কেন কোন মাছের ক্ষেত্রেই দরকার নেই ৷ আসল হচ্ছে তাপমাত্রা ৷ শুধুমাত্র দেখতে হবে যাতে দিনের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড - ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড থাকে ৷ বাচ্চা বেরোনোর ৪২ ঘন্টা পর্যন্ত তাদের কোন খাবার দেবার দরকার নেই ৷ এরপর প্ল্যাঙ্কটন সংগ্রহ করে দিনে তিনবার খাবার হিসাবে দেওয়া যেতে পারে ৷ এছাড়া বাচ্চা বেরোনর সময় থেকে ৭ দিন পর্যন্ত হ্যাচারীতে পর্যাপ্ত বায়ুসঞ্চালনের ব্যবস্থা করতে হবে কারণ ততদিন পর্যন্ত এদের অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র তৈরী হয় না ৷

 

বাচ্চারা একটু বড় হলে এদের টিউবিফেক্স (Tubifex) খেতে দেওয়া যায় ৷ এছাড়া ক্যাপ্টেন ভেড়ী মত্স্য গবেষণাগার থেকে প্রকাশিত মাছের খাবার নামক বইতে শিশু মাছকে দেওয়ার জন্য যে খাদ্যর কথা বলা আছে তাও দিতে পারেন ৷ বাচ্চাদের  অসম বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় ৷ এটা আমরা দীঘা হ্যাচারীতে ট্যাংরার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছি ৷

 

৩০ দিন পরে বাচ্চার পেলভিক পাখনার তৈরী হয় ৷ এখন বলা যেতে পারে এরা Fry ৷ তখনই এদের চাষ পুকুরে ছাড়া যেতে পারে ৷