পুকুরে জলাশয়ে মুক্ত আমোনিয়াম (NH3) কিংবা নাইট্রাইট (NO2) এর মাত্রার সামান্য বৃদ্ধি মাছের মড়ক সৃষ্টি করতে পারে ৷ জলাশয়ে নাইট্রাইট (NO2) মাত্রা বেশী হলে মাছের  Brown blood রোগ হয়   ফুলকার মাধ্যমে মাছের রক্তে  NO2  মিশে যায়  হিমোগ্লবিন যা রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে O2 সরবরাহ করে, নাইট্রাইটের সাথে মিশে মিথোগ্লোবিন তৈরী হয় এবং এই যৌগ অক্সিজেন বহন করতে পারে না ৷ এর  ফলে রক্তের রং বাদামী বর্ণের হয় ৷ আক্রান্ত মাছ O2  এর অভাবে জলের উপরে ভেসে ওঠে ও মারা যায়

 

সাধারণত বর্ষার সময় ও বসন্তকালে যখন তাপমাত্রার নিয়মিত পরিবর্তন ঘটে, তখন জলাশয়ে বিদ্যমান নাইট্রোজেন চক্র ভেঙে যায় ৷ কারণ হিসাবে বলা যায় যে তাপমাত্রার নিয়মিত পরিবর্তনের ফলে সবুজ কণার ঘাটতি হয় ফলে সবুজ উদ্ভিদ কণার দ্বারা আমোনিয়ার আত্তীকরণ এর হার কমে যায় এবং NO2 এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়

 

প্রতিকার-

নাইট্রোজেন ঘটিত সার এর ব্যবহার কমিয়ে ও মাছের খাবার ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত  করে এই রোগ কিছুটা রোধ করা যেতে পারে ৷ তবে মজুত পুকুরে যেখানে অধিক সংখ্যায় মাছ মজুত থাকে, সে ক্ষেত্রে খাবারের ব্যবহার কমানো সম্ভব নাও হতে পারে সেক্ষেত্রে পুকুরে সাধারণ লবণ ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায় ৷ সাধারণ লবণের Cl  অংশের ভাগ জলে বিদ্যমান  NO2 এর মাত্রার ছয়গুণ বেশী হলে মাছের ফুলকার মাধ্যমে রক্তে  NO2 এর যুক্ত হবার ক্ষমতা কমে যায় ৷ এজন্য জলে নাইট্রাইটের মাত্রা নির্ধারণ করে তার ছয়গুণ মাত্রায় ক্লোরাইড সাধারণ লবণরূপে পুকুরে ব্যবহার করা দরকার ৷ এছাড়াও নিয়মিত জল পরিবর্তন ও জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব ৷

 

 

 

জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিদ্যমান নাইট্রোজেন চক্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ৷ টোট্যাল নাইট্রোজেন (TAN) বলতে বোঝায় জলে দ্রবীভূত বিষাক্ত মুক্ত আমোনিয়া (Free NH3) ও অবিষাক্ত অবস্থায় থাকা আমোনিয়া  (NH4+ )-র মোট পরিমাণ ৷ মোট আমোনিয়া  (NH4+ ) রূপে থাকে এবং এরা পরস্পরের মধ্যে সাম্যাবস্থায় থাকে

                   NH3 +  H+  < => NH4+

জলের   ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে অ-আয়নিত বিষাক্ত আমোনিয়ার (NH3)পরিমাণ বাড়তে থাকে ৷ শুধু ক্ষারীয় অবস্থায় আমোনিয়া মুক্ত অবস্থায় থাকে ৷ আম্লিক জলে আমোনিয়া আয়নিত অবস্থায় থাকে ৷ জলের বিভিন্ন  এর মাত্রায় মোট আমোনিয়ার শতকরা কত ভাগ মুক্ত  আমোনিয়া রূপে থাকে তা নীচে সরণীতে দেখানো হল--

 

pH

মুক্ত  আমোনিয়া

6

0%

7

1%

8

4%

9

25%

10

78%

 

বাকিটা  আয়নিত আমোনিয়া (NH4+)

 

সাধারণত বর্ষার সময় ও শীতকালে যখন পুকুরে সবুজকণার পরিমাণ কমে যায় তখন জলে মুক্ত আমোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় ৷ তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে সবাত শ্বসনকারী জীবাণুর সক্রিয়তা কমে যায়,  ফলে নাইট্রিফিকেশনের হার ও  আমোনিয়া থেকে অবিষাক্ত NO3 এর রূপান্তর কমে যায় ৷ এর ফলে জলে  এর তুলনামূলক আধিক্য ঘটে ৷ পুকুরের জলে মুক্ত আমোনিয়ার মাত্রা বেড়ে 0.5 mg/ lt এর বেশী হলে মাছের রক্তের অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমে যায় ও অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মাছ মারা যায় ৷ দীর্ঘদিন ধরে জলে আমোনিয়ার মাত্রা নুন্যতম  0.6 mg/ lt থাকলে মাছের ফুলকা  ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও মাছের বৃদ্ধি কমে যায় ৷

 

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য নোনা জলের চিংড়ির যে সমস্ত খামারে ব্যাপক প্রথায় চাষ হয়, সেই সমস্ত ভেড়ীতে বেশী ফলনের আশায় অধিক প্রোটিনযুক্ত খাবার ব্যবহারের ফলে , পুকুরের তলদেশে অব্যবহৃত প্রোটিনজাত খাদ্য ও মাছের বিপাকজাত নাইট্রোজেন ঘটিত পদার্থ জমা হতে থাকে ৷ এই সমস্ত নাইট্রোজেন ঘটিত জৈবপদার্থের পচনের ফলে আমোনিয়া উত্পন্ন হয় ৷ এপ্রিল মাসে জলের তাপমাত্রা এবং  pH বাড়ার সাথে সাথে তলদেশে উত্পন্ন আমোনিয়া মুক্ত বিষাক্ত আমোনিয়া গ্যাসে রূপান্তরিত হয় ও জলকে দূষিত করে ৷ ফলে চিংড়ির নানারকম রোগ দেখা দেয় ও মাছের মড়ক হয় ৷

 

প্রতিকার-

১) পুকুরের জল পরিবর্তন (Water exchange) করে কিছুটা ভাল ফল পাওয়া যায় ৷

২)  Pump এর সাহায্যে বা কৃত্রিম উপায়ে পুকুরের জলের দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে হবে ৷ এর ফলে সবাত শ্বসনকারী জীবাণুগুলো সক্রিয় হয়ে বিষাক্ত আমোনিয়া গ্যাসের মাত্রা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে ৷

৩)  নাইট্রোজেন ঘটিত সারের পরিবর্তে ফসফেট যুক্ত সার ব্যবহার করতে হবে

৪)  অতিরিক্ত ও উচ্চ প্রোটিন যুক্ত খাবার প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে ৷ ট্রের মাধ্যমে খাবার প্রয়োগ করতে হবে ৷

 

 

 

কীটনাশক প্রয়োগ করে না বা ধরবেন না ৷ বর্তমানে অধিকাংশ মাছ চাষী কীটনাশক প্রয়োগ করে মাছ ধরেন ৷ কিন্তু এই মাছ ধরার কুফল অনেক

 

প্রথমতঃ এইসব  কীটনাশক সহজে পরিবেশ থেকে দূর করা যায় না ৷ তাই জলে কীটনাশক প্রয়োগে মাছ মারার পর সেই পুকুরে মাছ ছাড়লে দেখা যায় মাছের বৃদ্ধি কমে যাচ্ছে ৷ কারন কীটনাশক প্রয়োগের কয়েক মাস পরে মারন মাত্রায় তা উপস্থিত না থাকলেও ধীরে ধীরে তা জমা হতে থাকে মাছের শরীরে এবং এর ফলে তার শরীরে বিভিন্ন প্রকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃস্টি হয়, যদিও মাছ বেচেঁ থাকে বিভিন্ন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার একটি হচ্ছে মাছের বৃদ্ধি প্রতিহত হওয়া ৷ যার ফলে এদের পরবর্তী জেনারেশনে বড় মাছ না পাওয়ার একটা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে ৷ এর বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ায় মাছের ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয় ঠিকমত পূর্ণতা পায় না

 

দ্বিতীয়তঃ কেউ যদি পুকুরের জলে কীটনাশক দিয়ে মাছ মেরে ফেলে তবে মৃত মাছ তুলে নষ্ট করে ফেলুন ৷ কয়েকটি মৃত মাছ বরফ দিয়ে পলিথিন প্যাকে ভরে ও পুকুরের জল বোতলে করে সরকারী পরীক্ষাগারে পাঠান ও কি করনীয় তার পরামর্শ নিন ৷

 

মানুষের নার্ভতন্ত্রে আসিটাইলকোলিনএস্টারেজ নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরী হয় ৷ এই   আসিটাইলকোলিনএস্টারেজ যদি কোন কারণে তৈরী না হয় বা তৈরী হওয়ার পর নষ্ট হয়ে যায় তবে বিভিন্ন ধরনের নার্ভের অসুখ দেখা যায়, যার অনেকগুলির চিকিত্সা সম্ভব হয় না ৷ পুকুরের জলে কীটনাশক থাকলে তা স্বাভাবিক ভাবেই মাছের শরীরে প্রবেশ করে জমা হতে থাকে ৷ ঐ মাছ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে কীটনাশকটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে জমা হতে থাকে ৷ শরীরে জমা হতে থাকা এইসব বিষের ক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় ৷ স্নায়ুবিকার, পক্ষাঘাত, বাকবন্ধ, চৈতন্যলোপও হতে পারে, এমনকী এর ক্ষতিকর প্রভাবে মাতৃজঠরের ভ্রূণ বিকলাঙ্গ হতে পারে ৷ হতে পারে ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ ৷ পশ্চিমবঙ্গের অনেক গ্রামের দিকে তাকালে দেখা যাবে একদিকে সবুজ ফসলের আশাতীত সাফল্য, অপরদিকে চাষীদের মধ্যে ক্যানসার রোগের বিষাক্ত ছোবল ৷ বর্তমানে বেশীরভাগ চাষীই ব্যবহার করছেন অরগ্যানোক্লোরিন জাতীয় কীটনাশক অর্থাত ডি.ডি.টি., বি.এইচ.সি., এনড্রিন ইত্যাদি যা দীর্ঘসময় অবিকৃত অবস্থায় থেকে মাছের শরীরে, মানুষের শরীরে ভয়াবহ রোগ তৈরী করছে ৷ পশ্চিমী দেশগুলিতে জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এই কারনে কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ৷ কীট দমনের জন্য প্রচলিত হয়েছে বিকল্প পদ্ধতি ৷ অথচ আমাদের দেশে বিভিন্ন কীটনাশক উত্পাদনকারী সংস্থা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিনা বাধায় চরম ক্ষতিকারক মারাত্মক কীটনাশক বিষগুলিকে চাষীদের হাতে তুলে দিতে পারছেন ৷

 

তৃতীয়তঃ  যে কোন রাসায়নিক বিষ উর্বরতাকে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে নষ্ট করে দেয় ৷

 

সাধারণভাবে আমরা বুঝি বিষাক্ত রাসায়নিক (যথা কীটনাশক) একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় উপস্থিত থাকলে তবেই তা Lethal হয় ৷ তার কম মাত্রায় এর উপস্থিতি তত  ক্ষতিকারক নয় ৷ কিন্তু কই ও ল্যাটা মাছের ওপর ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষায় দেখা গেছে যে Sub-Lethal মাত্রায় এর উপস্থিতিও মাছের নার্ভতন্ত্রের যথেষ্ট ক্ষতি করে ৷

 

মাছের ক্ষেত্রে কোলিনার্জিক নার্ভ (অর্থাত যারা আসিটাইলকোলিন তৈরী করে) হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারী গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে ৷ আর এটা লক্ষ্য করা গেছে যে  Sub-Lethal মাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতিতে GTH GnRH এর মাত্রা কমে যায় যা ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কাজে বাধা সৃস্টি করে স্বাভাবিক প্রজননে ও Fish population এ বিরূপ প্রভাব ফেলে ৷

 

মাছের Detoxification System খুবই উন্নত ৷ যার জন্য পরিবেশে অল্প পরিমাণে বিষাক্ত কীটনাশকের উপস্থিতিতেও মাছ প্রায় স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে ৷ এর মূল কারণ হচ্ছে -

 

১) মাছের Glutathione (GSH)-GSH-S-transferase (GST) system খুব উন্নত ,

 

২) মাছের প্লাজমায় বিভিন্ন ধরনের Stress protein যথা C-reactive protein (CRP) থাকে যা অর্গানোফসফেট বা কার্বামেট জাতীয় কীটনাশকের উপস্থিতিতে সংশ্লেষ বেড়ে যায় ৷ স্তন্যপায়ী প্রাণীতে এই CRP কম থাকে ৷

 

সুতরাং যে মাত্রায় কীটনাশক মাছের ক্ষতিকারক নয় তা কিন্তু মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের  পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে ৷ আবার Sub-lethal dose এ উপস্থিত কীটনাশক প্রাণীদের  পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকর ৷

 

হয়ত অনেক মত্স্য চাষীই জানেন না যে, চাষের জমিতে বেশী ফলনের লোভে ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আজ জলজ প্রাণী মাছ ৷ প্রায় উনচল্লিশ (৩৯) রকম মাছ শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে ৷ অথচ নিম্নবিত্ত মানুষের পুষ্টিকর প্রোটিন খাদ্য হিসাবে চিহ্নিত - চেলা, চাঁদা, পুঁটি, মৌরলা প্রভৃতি ছোট ছোট মাছের মাছের ভূমিকা বর্তমানে কম নয় ৷