চারাপোনা (ধানী) উত্পাদনের জন্য ছোটখাট অগভীর পুকুরই ভাল৷ মাপে ০.০৩-০.০৭ হেক্টর অথার্ত্ ০.০৭৫ হতে ০.১৭৫ একর (১০ মি:X৩০ মি: থেকে ২০ মি:X৩৫ মি: )এবং গভীরতায় ১মি:- ১.৫মি: অথার্ত্ ৩-৫ফুট হলেই চলে৷ ঢালু পাড় বিশিষ্ট দীর্ঘ আয়তকার পুকুর উত্পাদনের পক্ষে উপযুক্ত এবং সুবিধাজনক৷ এরমধ্যে গ্রীষ্মে যে সমস্ত পুকুর শুকিয়ে যায় সেই গুলিই ডিম ফোটানোর বেশী উপযুক্ত৷ এসব পুকুরে পাঁক প্রায় থাকা না এবং থাকলেও শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এবং রৌদ্রের তাপে সমস্ত দোষ নষ্ট হয়ে যায়, জংলাও থাকে না৷ সারা বছরে যে সব পুকুরে জল থাকে তাতেও ডিম ফোটানো যায়, তবে ভাল করে সংস্কার /তৈরী করে নেওয়া প্রয়োজন৷ চারাপোনা (ধানী) তৈরীর এধরণের পুকুরকে আঁতুড় পুকুর বলে৷
(১)জঙ্গল সাফ,(২)পঙ্কোদ্ধার,(৩)পাড় সংস্কার,(৪)অবাঞ্ছিত মাছ মারা,(৫)চূণ ও সার প্রয়োগ,(৬)পোকা-মাকড় নিধন ইত্যাদ৷
জলের মধ্যে এবং পুকুরের পাড়ের সব রকম জঙ্গলই মাছের পক্ষে ক্ষতিকারক৷ জলজউদ্ভিদ মাছের বাড়ে, চলা ফেরায় এবং জালটানায় বাধা দেয় এবং ডিম পোনার স্বাভাবিক খাদ্য উত্পাদনেও হানি ঘটায়৷ আর পাড়ের জঙ্গলে পোকামাকড় আস্তানা গারে এবং এরাও ডিম পোনা ধ্বংস কর৷ সমস্ত জঙ্গল লোক লাগিয়ে সাফ করে ফেলাই ভাল, ছোট পুকুরে একাজে কোন অসুবিধা নাই৷
বেশী পাঁক থাকলে জল শুকিয়ে পঙ্কোদ্ধার করে নেওয়া ভাল৷ কারণ
পাঁকে যে দূষিত গ্যাস জন্মে কোমল ডিম পোনার পক্ষে তা মারাত্মক৷ শুকনো পুকুরে
অগভীর লাঙ্গল দিয়ে উলটিয়ে দেওয়া ভাল৷
|
পুকুরের পাড় ভাঙ্গা থাকলে এবং বন্যায় বা বর্ষায় জলে ভেসে যাওয়ার ভয় থাকলে তা বেঁধে নেওয়া প্রয়োজন৷ অন্য পুকুরের সাথে যোগাযোগ থাকাও উচিত নয়৷ কারণ এতে অনেক আমাছা বা মত্স্যভূক মাছ ঢুকে সব পোনা খেয়ে ফেলবে এবং উত্পাদন ব্যর্থ হবে৷
ডিম পোনা ছাড়ার আগে আঁতুড় পুকুর সমস্ত রকম মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড় ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া প্রয়োজন৷ শুধু মত্স্যভূক শাল, শোল, বোয়াল ইত্যাদি মাছই নয় যাবতীয় চুনো, চাঁদা, মৌরলা, পুঁটি এমনকি রুই, কাতলা ইত্যাদির চারা পোনাও থাকা উচিত নয়৷ কারণ কচি কোমল মত্স্য শিশুরা মত্স্যভূক মাছেদের প্রিয় খাদ্য৷ অতএব এদের সবাইকে নির্মূল করে তবেই পুকুরে ডিম পোনা ছাড়া যেতে পারে৷ আবার চাঁদা, মৌরলা মাছ ডিম পোনার খাবারে ভাগ বসায়৷ ফলে ডিম পোনার খাদ্যে ঘাটতি হয় এবং চাষে ক্ষতি হয়৷
বারবার জাল টেনে সমস্ত মাছ তুলে ফেলা সম্ভব হলেও নির্মূল করা সম্ভব নয়৷ তাই পুকুর যদি না শুকোয় তবে বিষ প্রয়োগে এদের শেষ করতে হবে৷ রাসায়নিক বিষের ক্রিয়া অনেকদিন থাকে এবং উত্পাদনের পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে৷ মহুয়া খৈল এমন একটা সামগ্রী যা আদিতে বিষ হলেও অন্তে সার হিসাবে এর সুফল পাওয়া যায়৷ তাই এই খৈল প্রয়োগে অনেক সুবিধা৷
হেক্টর প্রতি ২৫০০ কেজি বা একর প্রতি ১০০০ কেজি প্রতি
মিটার (৩ ফুট) জলের গভীরতার জন্য মহুয়ার খৈল দেওয়া প্রয়োজন৷ পুকুরে ছড়িয়ে
দেবার পর ৪-৫ ঘন্টার মধ্যেই যাবতীয় মাছ ভাসতে শুরু করে৷ তখন জাল দিয়ে
এদের ধরে নিতে হয়৷ এই মাছ খাওয়া
স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক নয়৷ মহুয়া খৈল রোদের দিনে দেওয়া ভাল৷ পুকুরে গেঁড়ি, গুগলি
বেশী থাকলে মাছের পোনা ভাল বাড়ে না৷ চূণের ঘাটতি
পড়ে৷
মহুয়ার খৈল প্রয়োগে এরাও মারা পড়ে অথবা কিনারে চলে আসে তখন এদের তুলে ফেলা
যায়৷
|
শুকনো পুকুরে খৈল দেবার প্রয়োজন নাই৷ তবে বর্ষার জল জমে অন্য কোন জলার সাথে যোগাযোগে যদি কোন মাছ ঢুকে থাকে, দেখা যায় তখন মহুয়ার খৈল প্রয়োগ করা যেতে পারে ৷ অন্যথায় পুকুর শুকিয়ে গেলে অগভীর লাঙ্গল দিয়ে রাখতে হয়, তারপর চূণ ছড়িয়ে দিতে হয়৷ এই অবস্থায় বর্ষার জল জমলে দিন সাতেক বাদে সার প্রয়োগ করতে হয়৷
চূণ সব পুকুরে দেওয়া ভাল৷ বিশেষ করে আঁতুড় পুকুরে অবশ্যই দিতে হয়৷ চূণের অনেক গুণ৷ পুকুরের যাবতীয় দূষিত গ্যাস নষ্ট করে৷ মত্স্য শিশুর শরীরে হাড়ের বাড়ে সাহায্য করে৷ পুকুরের স্বাভাবিক উত্পাদন ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে এবং জলের অম্লতা নষ্ট কর৷
চূণ, সার প্রয়োগের আগে দেওয়াই ভাল৷ আঁতুড় পুকুরে প্রয়োজনমত হেক্টর প্রতি ২০০-৩০০ কেজি/একর প্রতি ৮০-১২০ কেজি চূণ দিতে হয়৷
আঁতুড় পুকুর ডিম পোনার খাবার উত্পাদনের জন্য পুকুরের সার হিসাবে গোবরই সবচেয়ে ভাল৷ ডিম পোনা ছাড়ার ১৫-২০ দিন আগে বিঘা প্রতি ১০০০-১৩০০ কেজি গোবর দেওয়া প্রয়োজন৷ মহুয়ার খৈল দিলে গোবর দিতে হয় না৷ |
সবুজ কণার জন্ম-নিয়ন্ত্রণ সূর্য়ের হাতে৷ সূর্য়ের আলো ঢেকে দিলে সবুজ কণার মৃত্যু হয় এবং বাড় বন্ধ হয়৷ তাই পুকুরের জল সুজিপানা বা তেপাতিপানা দিয়ে সপ্তাহ খানেক ঢেকে রাখলেই এদের বিস্তার রোধ করা যায়৷ তখন বাঞ্ছিত প্রাণীকণার বংশ বিস্তার শুরু হয়৷
এই সুজিপানা বা তেপাতিপানা হেক্টর প্রতি ৩০০০কেজি (একর প্রতি ১২০০ কেজি) দিলে সম্পূর্ণ জল ঢাকা দেওয়া যায়ন পুকুরে ডিম পোনা ছাড়ার আগে চট জাল দিয়ে এইসব পানা সরিয়ে ফেলতে হয়৷
গোবর সার প্রয়োগের দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রচুর খাদ্যানু জন্মে৷ প্রথমে সবুজ (উদ্ভিদ) কণা দেখা দিলেও তার সাথে সাথে প্রচুর প্রাণীকণা জন্মে যা রুই, কাতলা, মৃগেল শিশুদের প্রিয় খাদ্য৷ তাই দিন ১৫ পরই ডিম পোনা ছাড়া চলে৷ তবে ডিম পোনা ছাড়ার আগে দেখে নিতে হয় খাদ্য ঠিকমত জন্মেছে কিনা৷
জলের রং কালচে লাল বা বাদামী হলে বুঝতে হবে পুকুরে স্বাভাবিক খাদ্যের পরিমাণ ভালই আছে৷ এই অবস্থায় জলের মধ্যে মুঠি বন্ধ হাত কনুই পযর্ন্ত খাড়া ডুবিয়ে দিলে মুঠি দেখা যায় না৷ আরও একটি উপায় প্লাংকটন্ নেটের সাহায্যে পরিমাপ৷ এই নেটে ৫০ লিটার পুকুরের জল (বিভিন্ন স্থানের) ছেঁকে দেখা যাবে সংলগ্ন কাঁচের টিউব নলে সূক্ষ্ম খাদ্যানু জমা হয়েছে অনেক৷ রং বাদামী হলে এবং এগুলি ছটফট করতে দেখা গেলে বুঝতে হবে ডিম পোনার উপযুক্ত খাদ্য প্রাণীকণা জন্মেছে বেশী৷ আর সবুজ রং হলে বুঝতে হবে উদ্ভিদ কণা জন্মেছে৷ এর মধ্যে সামান্য নুন ফেলে কিছুক্ষণ রেখে দিলে ঐসব কণাগুলি মরে তলানি হিসাবে জমা হবে৷ তলানির পরিমাণ যদি ১ সি সি এর মত হয় তবে বুঝতে হবে পুকুরে ভালই খাদ্য জন্মেছে৷ আর ২ সি সি হলে প্রচুর৷ এ কাজ সূর্য়োদয়ের আগে করলে যথাযথ পরিমাণ পাওয়া যায়ন এই সময় পোনার ক্ষতিকারক অনেক বড় বড় পোকাও জলে জন্মে৷ ডিম পোনা ছাড়ার আগের দিন (২৪ ঘন্টা আগে) এদের মেরে ফেলতে হয়৷ |
বর্ষাকালে মাঠে ঘাটে বিশেষ করে সার দেওয়া পুকুরে বহু জন্মায়৷ ঘন চট জাল টেনে এদের তুলে ফেলা যায়৷ তবু বাকি যা থাকে তাও অনেক৷ এরমধ্যে হাঁস পোকাই বেশী ক্ষতি করে৷ আশপাশের মাঠঘাট থেকে এরা উড়ে লাফিয়ে এসে জলে পড়ে৷ কচি ডিম পোনার এরা ক্ষতি করে৷ এদের মারতে পুকুরে উদ্ভিজ তেল ও সাবান জল মিশ্রণ প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যায়৷
হেক্টর প্রতি ১৮ কেজি (একর প্রতি ৭.২ কেজি) সাবান সমপরিমাণে জলে গুলে ফুটিয়ে গাঢ় সাবান জল তৈরী করে ৫৪ (২১.৬) কেজি উদ্ভিদ তেলের (সরিষা, বাদাম, তিসি ইত্যাদি পাতলা তেল) এর সাথে মিশিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিতে হয়৷ তারপর পুকুরের চারিদিক থেকে ভালভাবে ছিটিয়ে দিতে হয় যাতে পুকুরের জলের উপরটা তেলের আবরণে ঢাকা পড়ে এবং সেই আবরণ কয়েকঘন্টা স্থায়ী হয়৷ তবেই পুকুরের সব পোকা মরা সম্ভব হবে৷ তাই ঝড় বৃষ্টির দিনে এটা করলে কোন কাজ হবে না৷ ভোরে বা সন্ধ্যায় যখন বাতাস থাকে না তখন এর প্রয়োগ ভাল হয়ন এই কাজ ডিম ছাড়ার ১২/২৪ ঘন্টা আগে সেরে ফেলতে হয়৷ বেশী আগে সারলে সময়ের ব্যবধানে পোকারা আবার জুটে যেতে পারে৷
হেক্টর প্রতি জলার মাপে শুধু ২০০লিটার (একর প্রতি ৮০ লিটার) কেরোসিন তেল একইভাবে প্রয়োগ করে জলের উপর কয়েক ঘন্টারএকটা আবরণ দিতে পারলে একই ফল পাওয়া যায়৷ অথচ এতে খরচ কম৷ ডিম পোনা ছাড়ার ২৪ ঘন্টা আগে দিলে কুফল নাই৷ বিশেষ পরীক্ষায় স্বীকৃত হয়েছে৷
ডিম ছাড়ার পর বেশী পোকা হলে পোনার উত্পাদন কমে যেতে পারে৷ অথচ এই সময়ে জলের উপর তেলের সম্পূর্ণ আবরণ দেওয়া ঠিক নয়৷ পোকারা সাধারণতঃ আলোকের ফাঁদে ধরা পড়ে৷ তাই পুকুরের মাঝে বাঁশের খোটায় লন্ঠন বা হ্যাজাক জ্বালিয়ে এদের আকর্ষণ করা যায়৷ এই আলোকের নীচে ৪টি ছোট বাঁশের (৩-৩১/২ ফুট) টুকরো অথবা কলাগাছ দিয়ে চৌকাঠা করে ভাসিয়ে খোটা দিয়ে আটকে স্থির রাখতে হয়৷ এই ভাসমান চৌকাঠার মধ্যে ফাঁকা জলে সিকি/আধ লিটার পরিমাণ কেরোসিন তেল ঢেলে দিলে দেখা যাবে ঐ তেল বাইরে ছড়িয়ে আসছে না৷ ঐখানে সীমাবদ্ধ আছ৷ রাতে আলোর টানে পোকা এলে কেরোসিন তেলে মারা যাবে৷ এইভাবে দেখা গেছে পুকুরের ৭৫ ভাগ পোকা মেরে ফেলা সম্ভব৷ |
ডিম পোনা এনে ডিমের পাত্র বা পলিথিন ব্যাগ পুকুরের জলে খানিকক্ষণ ভাসিয়ে রাখতে হয়, তাতে পাত্রের জলের তাপ ও পুকুরের জলের তাপের সমতা আসে৷ দুপুরের গরম জলে ডিম ছাড়তে নাই৷ সকালে বা সন্ধ্যার পর জলের তাপমাত্রা কম থাকে৷ তখন ডিমপোনা ছাড়া উচিত৷ বৃষ্টির মধ্যে ডিমপোনা ছাড়া উচিত নয়৷ তারপর ধীরে ধীরে পাত্রটি কাত করে অথবা মুখ খুলে পুকুরের জলের সাথে পাত্রের জল মিলিয়ে ধরতে হয়৷ ধীরে ধীরে ডিম পোনাগুলি আপনিই পুকুরে চলে যায়৷ হঠাত ডিম পুকুরে ঢেলে দিলে ডিম পোনারা মারা যেতে পারে৷ আঁতুড়ে পুকুরে হেক্টর প্রতি ২০-৩০ লক্ষ (একর প্রতি ৮-১২ লক্ষ) ডিম পোনা ছাড়া যেতে পারে৷ ডিম পোনার খাদ্যের প্রাচুর্য় থাকলেই বেশী মাত্রায় ডিম পোনা ছাড়া উচিত্- অন্যথায় কম৷
পুকুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ৫০ লিটার জল প্লাংকটন্ নেটে
ছেঁকে যদি দেখা যায় খাদ্যের ঘাটতি পড়েছে তবে পরিপূরক খাদ্যের যোগান দেওয়া
প্রয়োজন৷
অন্যথায় মাছের বাড়ের ক্ষতি হতে পারে৷ সংখ্যাও কম পাওয়া
যেতে পারে৷ উত্তমরূপে সার প্রয়োগে তৈরী পুকুরের খাদ্য এই সব
ডিমপোনার ৫/৭ দিনের মধ্যেই খেয়ে ফেলতে পারে৷ তাই অনেকে এই সময়
আঁতুড় পুকুরে ফুলধানি মাছ চেলে আরও পাঁচগুণ এলাকায় একইভাবে তৈরী পুকুরে
চালিয়ে দেওয়া পছন্দ করেন৷ এতে উত্পাদিত পোনার সংখ্যা অনেক বেশী পাওয়া যায়৷
|
চারা পোনা কবে নাগাদ তুলতে হয় |
|
একই পুকুরে বছরে কতবার চারা পোনা উত্পাদন করা যায় |
ক)ডিম পোনা ছাড়ার প্রথম পাঁচদিন-প্রতিদিন ২.৮০০
কেজি (১০ লক্ষ পোনার জন্য)৷
|
মোট কি পরিমাণ চারাপোনা তোলা সম্ভব |
|
চারা মাছ প্রস্তুতকারী চাষীদের কর্মসূচী |