ডিম পোনার চাষ

মাছের ডিম পোনা কোথায় পাওয়া যায়?

পুকুরে মহুয়া খৈল দেবার পরিমাণ ও সুবিধা

কেরোসিন তেল প্রয়োগের বিধি কি ?

মাছের ডিম পোনা কিভাবে পুকুরে আনা হয়?

শুকনো পুকুরে কি মহুয়ার খৈল দিতে হয়?

ডিম ছাড়ার পর পোকা হলে কিভাবে পোকা মারা যায় ?

পলিথিন প্যাকে কিভাবে ডিম পোনা আনতে হয়?

পুকুরে চূণ দিতে হয় কেন ?

আঁতুড় পুকুরে কি ভাবে কি পরিমাণ ডিম ছাড়তে হয় ?

কোন ডিম পোনা সবচেয়ে ভাল ?

কখন কি পরিমাণে চূণ দিতে হয় ?

পুকুরে খাদ্যের ঘাটতি হলে কি করা উচিত

ডিম পোনা থেকে চারাপোনা (ধানী) তৈরীর জন্য কি ধরনের পুকুর ভাল?

চূণ দেবার পর কি কি সার দিতে হয়?

পুকুর তৈরী বলতে কী বোঝায়?

আঁতুড় পুকুরে সবুজ কণার আধিক্য হলে কি করণীয়?

জঙ্গল সাফ করতে হয় কেন?

পানা কি পরিমাণ দিতে হয়?

পাঁক থাকলে কি ক্ষতি হয়?

গোবর সার প্রয়োগের কতদিন পরে ডিম পোনা ছাড়তে হয়?

পাড় বাঁধার প্রয়োজনীয়তা

পুকুরে খাদ্যানু পরিমাণ করার নিয়ম

আঁতুড় পুকুরে অন্য মাছ বা প্রাণী থাকলে কি হয় ?

পুকুরে পোকা মারার পদ্ধতি

আমাছা কি ভাবে মারতে হয়?

তেল সাবান মিশ্রণ কিভাবে ও কি পরিমাণে দিতে হয় ?

চারা মাছ প্রস্তুতকারী চাষীদের কর্মসূচী  

মোট কি পরিমাণ চারাপোনা তোলা সম্ভব

পরিপূরক খাদ্য কি পরিমাণে দিতে হয়

চারা পোনা কবে নাগাদ তুলতে হয়

 

একই পুকুরে বছরে কতবার চারা পোনা উত্পাদন করা যায়

 

মাছের ডিম পোনা কোথায় পাওয়া যায় ?

রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবোস ইত্যাদি যে সব মাছ আমরা চাষ করি এরা বর্ষাকালে নদীতে ডিম পাড়ে আবার বাঁকুড়া, মেদিনীপুর অঞ্চলের কিছু সংখ্যক বিশেষ ধরণের বাঁধেও ডিম পাড় বাজারে যে পোনা পাওয়া যায় তা নদী থেকে ধরা মাছের ডিম পোনা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় লালগোলা, ধুলিয়ান অঞ্চলে এবং মালদহ মাণিকচক অঞ্চলে নদী থেকে নদী থেকে মাছের ডিম পোনা ব্যাপক ভাবে ধরা হয়  বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় আধুনিক হ্যাচারী তৈরী হয়েছে  এই সকল হ্যাচারী থেকেও বাছাই করা ভাল মানের ডিমপোনা পাওয়া যায়

মাছের ডিম পোনা কিভাবে পুকুরে আনা হয়?

এই সব ডিম পোনা বড় বড় হাঁড়িতে করে ট্রেন, লরী, মানুষের কাঁধে, বিভিন্ন যানবাহনে বাজারে বিক্রির জন্য আসে  এতে অনেক সময় অনেক ডিম পোনা নষ্ট হয়  পলিথিন প্যাকে অক্সিজেন দিয়ে আনলে এই অবস্থায় মড়কের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়

পলিথিন প্যাকে কিভাবে ডিম পোনা আনতে হয়?

 

টিনের মুখ কেটে ঢাকনা দিয়ে নিতে হয় ঐ মাপের পলিথিনের থলি ভিতরে দিয়ে তারমধ্যে ডিম পোনার জন্য ৫/৬লিটার নদীর জল /বাঁধের জল ভরে দিতে হয়  তারপর আধ বাটি/২০ডিবা (প্রায় ২০/ ২৫ হাজার সংখ্যক)ডিম পোনা ঐ জলে রেখে অক্সিজেন দিয়ে থলির বাকি অংশটা ভরিয়ে ফুলিয়ে বেলুনের মত আঁট করে বেঁধে দিতে হয় তারপর ডালাচাপা দিয়ে অতি সহজে ২৪ ঘন্টা হতে ৩৬ ঘন্টা পযর্ন্ত কোন রকম জল না পালটিয়ে যেখানে খুশী নিয়ে যাওয়া যায়

কোন ডিম পোনা সবচেয়ে ভাল ?

 

নদীতে প্রথম দিকের গলনের ডিম পোনা ভাল  এতে রুই, কাতলা জাতের ডিম পোনা বেশী থাকে শেষের দিকে বাটা, মৌরলা এবং অন্যান্য আমাছা মাছের ডিম পোনা মিশে যায়  নদীর ডিম পোনা বেশ করে দেখে কিনতে হয়  নদীর বুকে হাপায় ১০/১২ ঘন্টা রেখে কিনলে আর ঠকতে হয় না  এইসব আমাছার ডিম ঐ সময়ের মধ্যে মরে যায় এবং সতেজ ভাল জাতের ডিম পাওয়া যায়  ভাল গলনের ডিম পোনাতে আমাছা কম থাকে নদীর চেয়ে বাঁধের পোনা কেনা নিরাপদ, কারণ এতে ভেজাল থাকে না, জাত মাছের ডিম পোনা থাকে  এই ডিম পোনা কমপক্ষে তিনদিন বয়সের হলে তবে কেনা উচিত

ডিম পোনা থেকে চারাপোনা (ধানী) তৈরীর জন্য কি ধরনের পুকুরে ভাল?

চারাপোনা (ধানী) উত্পাদনের জন্য ছোটখাট অগভীর পুকুরই ভাল  মাপে ০.০৩-০.০৭ হেক্টর অথার্ত্ ০.০৭৫ হতে ০.১৭৫ একর (১০ মি:X৩০ মি: থেকে ২০ মি:X৩৫ মি: )এবং গভীরতায় ১মি:-.মি: অথার্ত্ ৩-৫ফুট হলেই চলে  ঢালু পাড় বিশিষ্ট দীর্ঘ আয়তকার পুকুর উত্পাদনের পক্ষে উপযুক্ত এবং সুবিধাজনক  এরমধ্যে গ্রীষ্মে যে সমস্ত পুকুর শুকিয়ে যায় সেই গুলিই ডিম ফোটানোর বেশী উপযুক্ত  এসব পুকুরে পাঁক প্রায় থাকা না এবং থাকলেও শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এবং রৌদ্রের তাপে সমস্ত দোষ নষ্ট হয়ে যায়, জংলাও থাকে না  সারা বছরে যে সব পুকুরে জল থাকে তাতেও ডিম ফোটানো যায়, তবে ভাল করে সংস্কার /তৈরী করে নেওয়া প্রয়োজন চারাপোনা (ধানী) তৈরীর এধরণের পুকুরকে আঁতুড় পুকুর বলে

পুকুর তৈরী বলতে কী বোঝায়?

 

(১)জঙ্গল সাফ,(২)পঙ্কোদ্ধার,(৩)পাড় সংস্কার,(৪)অবাঞ্ছিত মাছ মারা,(৫)চূণ ও সার প্রয়োগ,(৬)পোকা-মাকড় নিধন ইত্যাদ

জঙ্গল সাফ করতে হয় কেন?

 

জলের মধ্যে এবং পুকুরের পাড়ের সব রকম জঙ্গলই মাছের পক্ষে ক্ষতিকারক  জলজউদ্ভিদ মাছের বাড়ে, চলা ফেরায় এবং জালটানায় বাধা দেয় এবং ডিম পোনার স্বাভাবিক খাদ্য উত্পাদনেও হানি ঘটায়  আর পাড়ের জঙ্গলে পোকামাকড় আস্তানা গারে এবং এরাও ডিম পোনা ধ্বংস কর  সমস্ত জঙ্গল লোক লাগিয়ে সাফ করে ফেলাই ভাল, ছোট পুকুরে একাজে কোন অসুবিধা নাই

পাঁক থাকলে কি ক্ষতি হয় ?

বেশী পাঁক থাকলে জল শুকিয়ে পঙ্কোদ্ধার করে নেওয়া ভাল  কারণ পাঁকে যে দূষিত গ্যাস জন্মে কোমল ডিম পোনার পক্ষে তা মারাত্মক  শুকনো পুকুরে অগভীর লাঙ্গল দিয়ে উলটিয়ে দেওয়া ভাল
 

পাড় বাঁধার প্রয়োজনীয়তা ?

 

পুকুরের পাড় ভাঙ্গা থাকলে এবং বন্যায় বা বর্ষায় জলে ভেসে যাওয়ার ভয় থাকলে তা বেঁধে নেওয়া প্রয়োজন  অন্য পুকুরের সাথে যোগাযোগ থাকাও উচিত নয়  কারণ এতে অনেক মাছা বা মত্স্যভূক মাছ ঢুকে সব পোনা খেয়ে ফেলবে এবং উত্পাদন ব্যর্থ হবে

আঁতুড় পুকুরে অন্য মাছ বা প্রাণী থাকলে কি হয় ?

 

ডিম পোনা ছাড়ার আগে আঁতুড় পুকুর সমস্ত রকম মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড় ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া প্রয়োজন  শুধু মত্স্যভূক শাল, শোল, বোয়াল ইত্যাদি মাছই নয় যাবতীয় চুনো, চাঁদা, মৌরলা, পুঁটি এমনকি রুই, কাতলা ইত্যাদির চারা পোনাও থাকা উচিত নয়  কারণ কচি কোমল মত্স্য শিশুরা মত্স্যভূক মাছেদের প্রিয় খাদ্য  অতএব এদের সবাইকে নির্মূল করে তবেই পুকুরে ডিম পোনা ছাড়া যেতে পারে  আবার চাঁদা, মৌরলা মাছ ডিম পোনার খাবারে ভাগ বসায়  ফলে ডিম পোনার খাদ্যে ঘাটতি হয় এবং চাষে ক্ষতি হয়

আমাছা কি ভাবে মারতে হয়?

 

বারবার জাল টেনে সমস্ত মাছ তুলে ফেলা সম্ভব হলেও নির্মূল করা সম্ভব নয়  তাই পুকুর যদি না শুকোয় তবে বিষ প্রয়োগে এদের শেষ করতে হবে রাসায়নিক বিষের ক্রিয়া অনেকদিন থাকে এবং উত্পাদনের পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে  মহুয়া খৈল এমন একটা সামগ্রী যা আদিতে বিষ হলেও অন্তে সার হিসাবে এর সুফল পাওয়া যায়  তাই এই খৈল প্রয়োগে অনেক সুবিধা

পুকুরে মহুয়া খৈল দেবার পরিমাণ ও সুবিধা :

 

হেক্টর প্রতি ২৫০০ কেজি বা একর প্রতি ১০০০ কেজি প্রতি মিটার (৩ ফুট) জলের গভীরতার জন্য মহুয়ার খৈল দেওয়া প্রয়োজন  পুকুরে ছড়িয়ে দেবার পর ৪-৫ ঘন্টার মধ্যেই যাবতীয় মাছ ভাসতে শুরু করে  তখন জাল দিয়ে এদের ধরে নিতে এই মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক নয়  মহুয়া খৈল রোদের দিনে দেওয়া ভাল পুকুরে গেঁড়ি, গুগলি বেশী থাকলে মাছের পোনা ভাল বাড়ে না  চূণের ঘাটতি পড়ে মহুয়ার খৈল প্রয়োগে এরাও মারা পড়ে অথবা কিনারে চলে আসে তখন এদের তুলে ফেলা যায়
মহুয়া খৈলের বিষক্রিয়া ১৫-২১ দিন থাকে  তাই জল বিষমুক্ত হলে তবেই ডিম পোনা ছাড়তে হবে

 শুকনো পুকুরে কি মহুয়ার খৈল দিতে হয়? 

 

শুকনো পুকুরে খৈল দেবার প্রয়োজন নাই  তবে বর্ষার জল জমে অন্য কোন জলার সাথে যোগাযোগে যদি কোন মাছ ঢুকে থাকে, দেখা যায় তখন মহুয়ার খৈল প্রয়োগ করা যেতে পারে অন্যথায় পুকুর শুকিয়ে গেলে অগভীর লাঙ্গল দিয়ে রাখতে হয়, তারপর চূণ ছড়িয়ে দিতে হয়  এই অবস্থায় বর্ষার জল জমলে দিন সাতেক বাদে সার প্রয়োগ করতে হয়

পুকুরে চূণ দিতে হয় কেন ? 

 

চূণ সব পুকুরে দেওয়া ভাল  বিশেষ করে আঁতুড় পুকুরে অবশ্যই দিতে হয়  চূণের অনেক গুণ পুকুরের যাবতীয় দূষিত গ্যাস নষ্ট করে  মত্স্য শিশুর শরীরে হাড়ের বাড়ে সাহায্য করে  পুকুরের স্বাভাবিক উত্পাদন ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে এবং জলের অম্লতা নষ্ট কর

কখন কি পরিমাণে চূণ দিতে হয় ? 

চূণ, সার প্রয়োগের আগে দেওয়াই ভাল  আঁতুড় পুকুরে প্রয়োজনমত হেক্টর প্রতি ২০০-৩০০ কেজি/একর প্রতি ৮০-১২০ কেজি চূণ দিতে হয়

চূণ দেবার পর কি কি সার দিতে হয়?

 

আঁতুড় পুকুর ডিম পোনার খাবার উত্পাদনের জন্য পুকুরের সার হিসাবে গোবরই সবচেয়ে ভাল  ডিম পোনা ছাড়ার ১৫-২০ দিন আগে বিঘা প্রতি ১০০০-১৩০০ কেজি গোবর দেওয়া প্রয়োজন  মহুয়ার খৈল দিলে গোবর দিতে হয় না

আঁতুড় পুকুরে সবুজ কণার আধিক্য হলে কি করণীয়?

 

সবুজ কণার জন্ম-নিয়ন্ত্রণ সূর্য়ের হাতে  সূর্য়ের আলো ঢেকে দিলে সবুজ কণার মৃত্যু হয় এবং বাড় বন্ধ হয়  তাই পুকুরের জল সুজিপানা বা তেপাতিপানা দিয়ে সপ্তাহ খানেক ঢেকে রাখলেই এদের বিস্তার রোধ করা যায়  তখন বাঞ্ছিত প্রাণীকণার বংশ বিস্তার শুরু হয়

পানা কি পরিমাণ দিতে হয় ?  

 

এই সুজিপানা বা তেপাতিপানা হেক্টর প্রতি ৩০০০কেজি (একর প্রতি ১২০০ কেজি) দিলে সম্পূর্ণ জল ঢাকা দেওয়া যায় পুকুরে ডিম পোনা ছাড়ার আগে চট জাল দিয়ে এইসব পানা সরিয়ে ফেলতে হয়

গোবর সার প্রয়োগের কতদিন পরে ডিম পোনা ছাড়তে হয় ? 

 

গোবর সার প্রয়োগের দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রচুর খাদ্যানু জন্মে  প্রথমে সবুজ (উদ্ভিদ) কণা দেখা দিলেও তার সাথে সাথে প্রচুর প্রাণীকণা জন্মে যা রুই, কাতলা, মৃগেল শিশুদের প্রিয় খাদ্য তাই দিন ১৫ পরই ডিম পোনা ছাড়া চলে তবে ডিম পোনা ছাড়ার আগে দেখে নিতে হয় খাদ্য ঠিকমত জন্মেছে কিনা

পুকুরে খাদ্যানু পরিমাণ করার নিয়ম : 

 

জলের রং কালচে লাল বা বাদামী হলে বুঝতে হবে পুকুরে স্বাভাবিক খাদ্যের পরিমাণ ভালই আছে  এই অবস্থায় জলের মধ্যে মুঠি বন্ধ হাত কনুই পযর্ন্ত খাড়া ডুবিয়ে দিলে মুঠি দেখা যায় না আরও একটি উপায় প্লাংকটন্ নেটের সাহায্যে পরিমাপ এই নেটে ৫০ লিটার পুকুরের জল (বিভিন্ন স্থানের) ছেঁকে দেখা যাবে সংলগ্ন কাঁচের টিউব নলে সূক্ষ্ম খাদ্যানু জমা হয়েছে অনেক রং বাদামী হলে এবং এগুলি ছটফট করতে দেখা গেলে বুঝতে হবে ডিম পোনার উপযুক্ত খাদ্য প্রাণীকণা জন্মেছে বেশী আর সবুজ রং হলে বুঝতে হবে উদ্ভিদ কণা জন্মেছে এর মধ্যে সামান্য নুন ফেলে কিছুক্ষণ রেখে দিলে ঐসব কণাগুলি মরে তলানি হিসাবে জমা হবে তলানির পরিমাণ যদি ১ সি সি এর মত হয় তবে বুঝতে হবে পুকুরে ভালই খাদ্য জন্মেছে আর ২ সি সি হলে প্রচুর এ কাজ সূর্য়োদয়ের আগে করলে যথাযথ পরিমাণ পাওয়া যায় এই সময় পোনার ক্ষতিকারক অনেক বড় বড় পোকাও জলে জন্মে ডিম পোনা ছাড়ার আগের দিন (২৪ ঘন্টা আগে) এদের মেরে ফেলতে হয়

পুকুরে পোকা মারার পদ্ধতি ?

 

বর্ষাকালে মাঠে ঘাটে বিশেষ করে সার দেওয়া পুকুরে বহু জন্মায় ঘন চট জাল টেনে এদের তুলে ফেলা যায় তবু বাকি যা থাকে তাও অনেক এরমধ্যে হাঁস পোকাই বেশী ক্ষতি করে আশপাশের মাঠঘাট থেকে এরা উড়ে লাফিয়ে এসে জলে পড়ে কচি ডিম পোনার এরা ক্ষতি করে এদের মারতে পুকুরে উদ্ভিজ তেল ও সাবান জল মিশ্রণ প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যায়

তেল সাবান মিশ্রণ কিভাবে ও কি পরিমাণে দিতে হয় ?  

 

হেক্টর প্রতি ১৮ কেজি (একর প্রতি ৭.২ কেজি) সাবান সমপরিমাণে জলে গুলে ফুটিয়ে গাঢ় সাবান জল তৈরী করে ৫৪ (২১.৬) কেজি উদ্ভিদ তেলের (সরিষা, বাদাম, তিসি ইত্যাদি পাতলা তেল) এর সাথে মিশিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিতে হয় তারপর পুকুরের চারিদিক থেকে ভালভাবে ছিটিয়ে দিতে হয় যাতে পুকুরের জলের উপরটা তেলের আবরণে ঢাকা পড়ে এবং সেই আবরণ কয়েকঘন্টা স্থায়ী হয় তবেই পুকুরের সব পোকা মরা সম্ভব হবে তাই ঝড় বৃষ্টির দিনে এটা করলে কোন কাজ হবে না ভোরে বা সন্ধ্যায় যখন বাতাস থাকে না তখন এর প্রয়োগ ভাল হয় এই কাজ ডিম ছাড়ার ১২/২৪ ঘন্টা আগে সেরে ফেলতে হয় বেশী আগে সারলে সময়ের ব্যবধানে পোকারা আবার জুটে যেতে পারে

কেরোসিন তেল প্রয়োগের বিধি কি ?  

 

হেক্টর প্রতি জলার মাপে শুধু ২০০লিটার (একর প্রতি ৮০ লিটার) কেরোসিন তেল একইভাবে প্রয়োগ করে জলের উপর কয়েক ঘন্টারএকটা আবরণ দিতে পারলে একই ফল পাওয়া যায় অথচ এতে খরচ কম ডিম পোনা ছাড়ার ২৪ ঘন্টা আগে দিলে কুফল নাই বিশেষ পরীক্ষায়  স্বীকৃত হয়েছে

ডিম ছাড়ার পর পোকা হলে কিভাবে পোকা মারা যায় ?  

 

ডিম ছাড়ার পর বেশী পোকা হলে পোনার উত্পাদন কমে যেতে পারে অথচ এই সময়ে জলের উপর তেলের সম্পূর্ণ আবরণ দেওয়া ঠিক নয় পোকারা সাধারণতঃ আলোকের ফাঁদে ধরা পড়ে তাই পুকুরের মাঝে বাঁশের খোটায় লন্ঠন বা হ্যাজাক জ্বালিয়ে এদের আকর্ষণ করা যায় এই আলোকের নীচে ৪টি ছোট বাঁশের (৩-৩১/২ ফুট) টুকরো অথবা কলাগাছ দিয়ে চৌকাঠা করে ভাসিয়ে খোটা দিয়ে আটকে স্থির রাখতে হয় এই ভাসমান চৌকাঠার মধ্যে ফাঁকা জলে সিকি/আধ লিটার পরিমাণ কেরোসিন তেল ঢেলে দিলে দেখা যাবে ঐ তেল বাইরে ছড়িয়ে আসছে না ঐখানে সীমাবদ্ধ আছ রাতে আলোর টানে পোকা এলে কেরোসিন তেলে মারা যাবে এইভাবে দেখা গেছে পুকুরের ৭৫ ভাগ পোকা মেরে ফেলা সম্ভব

আঁতুড় পুকুরে কি ভাবে কি পরিমাণ ডিম ছাড়তে হয় ?

 

ডিম পোনা এনে ডিমের পাত্র বা পলিথিন ব্যাগ পুকুরের জলে খানিকক্ষণ ভাসিয়ে রাখতে হয়, তাতে পাত্রের জলের তাপ ও পুকুরের জলে তাপের সমতা আসে দুপুরের গরম জলে ডিম ছাড়তে নাই সকালে বা সন্ধ্যার পর জলের তাপমাত্রা কম থাকে তখন ডিমপোনা ছাড়া উচিত বৃষ্টির মধ্যে ডিমপোনা ছাড়া উচিত নয় তারপর ধীরে ধীরে পাত্রটি কাত করে অথবা মুখ খুলে পুকুরের জলের সাথে পাত্রের জল মিলিয়ে ধরতে হয় ধীরে ধীরে ডিম পোনাগুলি আপনিই পুকুরে চলে যায় হঠা ডিম পুকুরে ঢেলে দিলে ডিম পোনারা মারা যেতে পারে  আঁতুড়ে পুকুরে হেক্টর প্রতি ২০-৩০ লক্ষ (একর প্রতি ৮-১২ লক্ষ) ডিম পোনা ছাড়া যেতে পারে ডিম পোনার খাদ্যের প্রাচুর্য় থাকলেই বেশী মাত্রায় ডিম পোনা ছাড়া উচিত্- অন্যথায় কম

পুকুরে খাদ্যের ঘাটতি হলে কি করা উচিত্   

 

পুকুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ৫০ লিটার জল প্লাংকটন্ নেটে ছেঁকে যদি দেখা যায় খাদ্যের ঘাটতি পড়েছে তবে পরিপূরক খাদ্যের যোগান দেওয়া প্রয়োজন অন্যথায় মাছের বাড়ের ক্ষতি হতে পারে সংখ্যাও কম পাওয়া যেতে পারে উত্তমরূপে সার প্রয়োগে তৈরী পুকুরের খাদ্য এই সব ডিমপোনার ৫/৭ দিনের মধ্যেই খেয়ে ফেলতে পারে তাই অনেকে এই সময় আঁতুড় পুকুরে ফুলধানি মাছ চেলে আরও পাঁচগুণ এলাকায় একইভাবে তৈরী পুকুরে চালিয়ে দেওয়া পছন্দ করেন এতে উত্পাদিত পোনার সংখ্যা অনেক বেশী পাওয়া যায়
খাদ্যের ঘাটতি মেটাতে বাদাম, সরিষা বা নারকেল খৈল-এর গুড়ো এবং চালের কুড়ো সমপরিমাণে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে একই সময়ে জলে ছড়িয়ে দিতে হয় এই খাদ্যের কণাগুলি খুব সূক্ষ্ম হওয়া দরকার যাতে করে কণাগুলি জলের উপরে অনেকক্ষণ ভেসে থাকে এজন্য সরু ছাকনিতে চেলে খাদ্য দিলে ভাল হয়

চারা পোনা কবে নাগাদ তুলতে হয়   

 

এইভাবে চাষ করলে স্বাভবিক অবস্থায় ১৫ দিনের মধ্যেই চারা পোনা বিক্রির উপযুক্ত মান ২.৫ -৩ সে.মি. হয়ে যাবে এবং ৫০%-৬০% বেঁচে থাকবে এই সময় ভালভাবে চট জাল টেনে মাছের সংখ্যা ও স্বাস্থ্য দেখে নিতে হয় এই অবস্থায় মাছ ঘন হয়ে থাকলে দিনে দিনে কমতে থাকে তাই সাথে সাথে পালন পুকুরে চালিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হয়

একই পুকুরে বছরে কতবার চারা পোনা উত্পাদন করা যায় 

 

রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি মাছের চারা পোনা বর্ষাকালে উত্পন্ন করা হয় এই সময় তিনটি ফসল তোলা যায় তবে প্রতিবার আঁতুড় পুকুর পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে প্রস্তুত করে নিতে হয় যদিও দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় সার প্রয়োগ কম হারে করা চলে যথা গোবর হেক্টর প্রতি ২০০০ কেজি এবং এইভাবে গোবর প্রয়োগের ৭ দিন বাদেই পুকুরে ডিম ছাড়ার উপযুক্ত হয় কিন্তু প্রতিবারই পুকুরের সমস্ত মাছ/আমাছা নির্মূল করে নিতে হয়
সাইপ্রিনাস কার্পিও বা বিলাতী রুই এর চাষ শীতকালে সবচেয়ে ভাল হয় ডিসেম্বর হতে মার্চ মাস সব্বোর্ত্কৃষ্ট সময় এই সময় একই পুকুরে এই মাছের চারা পোনার দুই/তিনটি ফসল তোলা যায় তবে সব সময়ই পুকুরের পূব্বোর্ক্ত পদ্ধতিতে প্রস্তুতি প্রয়োজন
 

পরিপূরক খাদ্য কি পরিমাণে দিতে হয়

 ক)ডিম পোনা ছাড়ার প্রথম পাঁচদিন-প্রতিদিন ২.৮০০ কেজি (১০ লক্ষ পোনার জন্য)
 খ) ডিম পোনা ছাড়ার পরের পাঁচদিন-প্রতিদিন ৪.২০০ কেজি (১০ লক্ষ পোনার জন্য)
 গ)ডিম পোনা ছাড়ার শেষের পাঁচদিন-প্রতিদিন ৫.৬০০ কেজি (১০ লক্ষ পোনার জন্য)

মোট কি পরিমাণ চারাপোনা তোলা সম্ভব  

 

বর্ষায় ২/৩ বার এবং শীতকালে ২/৩ বার মোট ৪ হতে ৬ বার চারা পোনা তোলা সম্ভব প্রথমবারে সবচেয়ে বেশী পোনা উত্পাদন করা যায়- তারপর ক্রমান্বয়ে কমে যায় এই হিসেবে হেক্টর প্রতি গড়ে ১০ লক্ষ পোনা প্রতিবারে উত্পন্ন হলে বছরে ৪০ লক্ষ হতে ৬০ লক্ষ পযর্ন্ত পোনা উত্পাদন সম্ভব

চারা মাছ প্রস্তুতকারী চাষীদের কর্মসূচী  

 

এপ্রিল-মে মাস- রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবোস ইত্যাদি মাছের চারার জন্য আঁতুড়/ পালন পুকুর তৈরী প্রজননক্ষম স্ত্রী ও পুরুষ মাছ আলাদা করে ভিন্ন পুকুরে রাখা ও তত্ত্বাবধানের যথাযথ ব্যবস্থা করা জুন মাসে মাছের প্রজনন করা, ডিম পোনা ছাড়া এবং চারা পোনা তৈরীর সময়
জুলাই মাস- মাছের প্রজনন করা , চারা পোনার প্রথম ফসল তোলা ও বিক্রী করা  দ্বিতীয় দফার জন্য প্রস্ত্ততি এবং মাসের শেষ ভাগে  ডিম পোনা  ছাড়ার সময়
আগষ্ট মাস- প্রথম দিকে দ্বিতীয় দফার চারা পোনার ফসল তোলা ও বিক্রী শেষ ভাগে তৃতীয় দফার জন্য প্রস্ত্ততি ও ডিম পোনা ছাড়া
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস- তৃতীয় বা শেষ দফার চারা পোনা তোলা ও বিক্রয় এবং বিক্রয়ের উদ্বৃত্ত পোনা বাড়ের জন্য পালন করা যায় ১০-১২ সে.মি.হলে মজুত পুকুরে বৃদ্ধির জন্য রাখা যায় মজুত পুকুরে হেক্টর প্রতি ৭৫০০ (একর প্রতি ৩০০০) পর্যন্ত পোনা (৩ সে.মি.-৫ সে.মি.) ছাড়া যেতে পার আগের মাছ থাকলে কম ছাড়তে হয়
নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস- পুকুর প্রস্ত্ততি প্রজননক্ষম স্ত্রী ও পুরুষ মাছ (বিলাতী রুই) আলাদা করে রাখা সম্ভব হলে প্রজনন করা
জানুয়ারী মাস- সাইপ্রিনাস কার্পিওর প্রজননও প্রথম ফসল উত্পাদন ও বিক্রয় করার সময়
ফেব্রুয়ারী মাস- ঐ প্রজনন ও দ্বিতীয় ফসল উত্পাদন ও বিক্রী
মার্চ মাস- সম্ভব হলে তৃতীয় দফায় ফসল উত্পাদন ও বিক্রী বিক্রয়ের উদ্বৃত্ত ভাল বাড়ের মাছ পালন পুকুরে বড় করে মজুত পুকুরে রাখা যাবে  
উত্পাদন-চারা পোনা উত্পাদন কমপক্ষে ৪ বারে, প্রতিবারে এক হেক্টর গড়ে ১০ লক্ষ হিসাবে ৪০ লক্ষ অথবা এক একরে প্রতিবারে ৪ লক্ষ হিসাবে ১৬ লক্ষ পূর্বেই বলা হয়েছে ৬ বার পযর্ন্ত চারা পোনা উত্পাদন করা সম্ভব উপরের চারবারের হিসাব দেওয়া হল সুতরাং আর দুবার বেশী চারা পোনা উত্পাদন করতে পারলে হেক্টর প্রতি আরও উত্পাদন ও আয় হবে