কাঁকড়া চাষ
 |
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
সাধারণ
তথ্য
|
“মত্স্যচাষ” কথাটি এখন আর সঙ্কীর্ণ অর্থে কেবলমাত্র মাছের চাষ
বোঝায় না, এখন তা হল আকোয়াকালচার অর্থাত ব্যাপক
অর্থে জলজীবসম্পদের উত্পাদন, প্রতিপালন এবং সংরক্ষণ৷ এর মধ্যে "কর্কট-কৃষি” সোজা কথায়, কাঁকড়ার চাষও অন্তর্ভূক্ত৷ এই
চাষে খরচ কম৷ সময়ও কম লাগে৷ সামুদ্রিক খাদ্যের তালিকায় ডিমভরা কাঁকড়ার
চাহিদা খুব৷ চিংড়ির পরেই কাঁকড়ার স্থান৷ বিশেষ করে বিদেশে৷ তাই রপ্তানি আর
ডলার আমদানির জন্য চিংড়ির তুলনায় কাঁকড়া সহজ সাধ্য আর সহজলভ্য৷ কাঁকড়ার
মৃত্যুহারও রীতিমত কম৷ এইসব বিভিন্ন কারণে কাঁকড়া চাষ সুন্দরবনে উত্তরোত্তর
জনপ্রিয় হয়ে উঠছে৷ পরিকল্পিত পদ্ধতিতে চাষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে
জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সংরক্ষণও সম্ভব হয়েছে৷ একই সঙ্গে, উত্পাদনকারীরা
যাতে সরাসরি বাজার থেকে সঠিক দাম পায়, সরকার তার জন্যও চেষ্টা
করছেন৷
|
|
 |
জীবনচক্র
|
প্রজননক্ষম স্ত্রী/পুরুষ কাঁকড়া গভীর সমুদ্রে নিষিক্ত ডিম ছাড়ার পর
নিষিক্ত ডিমগুলি জোয়িয়া দশা পার করে মেগালোপা দশায় কম লবণাক্ত অঞ্চল অর্থাত
মোহনা অঞ্চলে পাড়ি দেয়৷ জুভেনাইলগুলি জোয়ার ভাঁটা খেলে এমন অঞ্চল পর্যন্ত
যাওয়ার পর মোহনার গভীরে চলে আসে৷ পরিণত কাঁকড়াগুলি ক্রমশঃ গভীর সমুদ্রে চলে
যায় আবার ডিম ছাড়ার জন্য৷ কাঁকড়া দেহের বৃদ্ধির জন্য অন্যান্য সন্ধিপদী
প্রাণীদের মতোই খোলস ত্যাগ করে৷ পদ্ধতিগুলি মোটামুটি এই রকম- (ক) খোলস
ত্যাগ(Ecdysis)- সময় লাগে ৪-৮ ঘন্টা৷ এই সময় কাঁকড়া তার শরীরের
অভ্যন্তরে অতিরিক্ত জল গ্রহণ
করার ফলে জলের চাপের কারণে পুরনো খোলস খসে পড়ে৷
(খ) পোষ্টমোল্ট দশা (Postmoult Period)- চারভাগে
বিভক্ত৷ ভাগগুলি হল A1, A2,
B1ও B2৷ এই
সময় কাঁকড়া খাবার খেতে শুরু করে৷ কাঁকড়ার খোলকে ধীরে ধীরে ক্যালসিয়াম জমে
খোলক শক্ত হয়৷
(গ) ইন্টারমোল্ট দশা(Intermoult Period)- সময় লাগে ৭৫-১১০ দিন৷ দশাগুলি
যথাক্রমে C1, C2, C3 ও C4৷ এই
দশা সক্রিয় খাদ্য গ্রহণের সময়৷ এই সময় খোলস ছাড়ার আগে গ্রহণ করা জল যা
সঞ্চিত ছিল কোষের মধ্যে, তার বদলে কোষে মাংসজ প্রোটিন যুক্ত হয়, ফলতঃ ওজন
বৃদ্ধি হয়৷ ইন্টারমোল্ট দশার শেষ দিকটা ফসল আহরণের পক্ষে আদর্শ, যেহেতু এ সময়
দেহের বিভিন্ন অংশে মাংস বেশী থাকে৷
(ঘ) খোলস ত্যাগ পূর্ববর্তী দশা
(Premoult Period)- প্রয়োজনীয় সময় ২৮-৩৫
দিন৷ যার চারটি দশা, দশাগুলি যথাক্রমে
D1, D2,
D3
ও
D4৷
এই সময় পুরনো খোলসের নিচে নতুন খোলস তৈরী হয়৷ বর্হিখোলক থেকে বেড়িয়ে আসার পর
কাঁকড়ার শরীরে মাংসপেশী যুক্ত হয়, অন্যান্য সন্ধিপদী পর্বের প্রাণীদের মতো৷
|

|
|

|
খোলক
ছাড়ার আগে উপরের শক্ত পুরনো খোলসের নীচে নতুন খোলস তৈরী হয়৷ পুরনো শক্ত মৃত
উপরের খোলসটির খসে পড়া এবং নতুন খোলস তৈরী হওয়ার সময় প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত
শক্তির৷ খোলস ছাড়ার আগে কাঁকড়া নিজের শরীরে অতিরিক্ত জল শোষণ করে, ফলে
আকারে বড় লাগে৷ শরীরে সঞ্চিত এই জলের চাপে পুরনো খোলসটি খসে পড়ে৷ এই সময়
কাঁকড়াকে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয়৷
খোলক ছাড়া কাঁকড়াগুলির কোষে
অতিরিক্ত জল থাকায়, খোলক নরম থাকায়, তারা প্রতিরোধ শক্তিবিহীন, সহজেই অন্য
প্রাণীর বিশেষ করে বাস্তুতন্ত্রের অন্য কাঁকড়াগুলির খাবারে পরিণত হয়৷
৩.৫ দিনের মধ্যে নতুন খোলস শক্ত হয়৷ জুভেনাইল এবং সাব
আলন্ডগুলি
বা প্রাক-পরিণত দশার ক্ষেত্রে খোলস ত্যাগ হয় ঘনঘন৷ পরিণত অবস্থায় খোলসত্যাগ
তুলনামূলকভাবে কম৷
|
|
 |
লিঙ্গ
নির্ধারন
|
কাঁকড়ার
জুভেনাইল দশায় পৌঁছানোর পর যখন তাদের উপরের খোলক বা ক্যারাপেস চওড়ায় অন্ততঃ
৩৫ মি.মি. হয়, সেসময় উদরখন্ডের ঢাকনা আকার দেখে স্ত্রী/পুরুষ চেনা যায়৷ ঐ আবডোমিনাল ফ্ল্যাপ বা উদরখন্ডের ঢাকনা সুচাকৃতি হলে
তা পুরুষ৷ আর উত্তল বা উল্টানো কড়াই-এর মতো হলে তা স্ত্রী৷ তাছাড়া স্ত্রী
কাঁকড়ার দাড়া ছোট, আর পুরুষ কাঁকড়ার দাড়া লম্বা নীল৷
|

|
|
 |
কাঁকড়া কি খায়
|
মাংসাশী,
আস্তে চলে এবং খামারের তলদেশে বাস করে এরকম ঝিনুক/ শামুক/ ছোট ও মরা কাঁকড়া/
চিংড়ি, এমনকি পচনশীল যে কোন পদার্থ, কমদামী মাছ, ছাগল, গরু, মুরগীর
নাড়িভূড়ি কাঁকড়ার পছন্দের খাদ্য৷ কাঁকড়াদের এইধরনের খাদ্যাভ্যাসের দরুন
জলের তলদেশ পরিষ্কার থাকে তাই এদেরকে ঝাড়ুদার প্রাণী বলে৷ এরা ভীষণ দ্রুত
খাদ্য গ্রহণ করে৷ কাঁকড়ারা আস্তে চলে, সেই কারণে জলের ভেতরে দ্রুতগামী কোন
প্রাণীকে এরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণে সক্ষম হয় না৷ গবেষণায় দেখা গেছে কাঁকড়ার
খাদ্য তালিকার সিংহভাগই কবচী প্রাণীর দেহাবশেষ(৪৪.৩%), এরপর আসে মাছ(২২.৩%),
কম্বোজ(১৪.৩%) এবং অন্যান্য প্রাণীর অবশেষ(১৯.১%)৷ চিংড়ি গুঁড়ে, বাদামখোল
এবং চালের কুঁড়ো৩:৪:৪ অনুপাতে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাদ্য কাঁকড়াদের
সাগ্রহে খেতে লক্ষ্য করা গেছে৷
|

|
|
 |
কাঁকড়ার বড়
হওয়া
|
প্রাকজুভেনাইল (৩-২০গ্রাম) প্রতি মাসে প্রায় ৫-১৫ গ্রাম বাড়ে,
জুভেনাইল(২৫.৭৫ গ্রাম) প্রতি মাসে প্রায় ৪৫-১০০ গ্রাম বাড়ে৷ তরুণ এবং পরিণত
কাঁকড়ার ক্ষেত্রে মাসিক বৃদ্ধির হার ১০০-১৩০ গ্রাম৷
Scylla tranquebarica-এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ২.৫ কেজি,
Scylla serrata-এর ক্ষেত্রে ৭০০ গ্রাম৷ স্ত্রী কাঁকড়ার উদরখন্ডের
নিচের ঢাকনাটি ত্রিভুজাকার থেকে অর্ধবৃত্তাকার বা ঘোড়ার ক্ষুরের মতো হয়ে
যায়৷ পুরুষ কাঁকড়ার ক্ষেত্রে এই ঢাকনাটি সুচালো শলার মতো হবে৷
মোটামুটিভাবে ১৫০ গ্রামের পরে কাঁকড়া পরিণত হয় অর্থাত জননাঙ্গ প্রজননক্ষম
হয়ে ওঠে৷ ডিম্বানু তৈরী শুরু হয় ভেতর থেকে৷ উজ্জ্বল কমলা বর্ণের ডিম্বাশয়ে
শেষের দিকে পরিণত অবস্থায় ডিম্বানু অনেকটা কালচে হলুদ রঙের হয়ে যায়৷
|
|
 |
সঙ্গম
|
প্রথমে
স্ত্রী কাঁকড়া খোলসত্যাগ করে, এই ধরনের খোলস ত্যাগের নাম প্রাক্ সঙ্গম খোলস
ত্যাগ
(Precopulatory
Moult)৷ নরম স্ত্রী কাঁকড়া অর্থাত যা
সদ্য খোলস ত্যাগ করেছে, তার সাথে শক্ত পুরুষ কাঁকড়ার মিলন হয়৷ সঙ্গমের
পূর্বে স্ত্রী কাঁকড়া সহয়তা করে প্রায় ২-৩ দিন ধরে৷ স্ত্রী কাঁকড়ার
খোলক ত্যাগের কয়েকঘন্টা পর প্রকৃত সম্পন্ন হয়, সঙ্গম প্রায় ৬-৮ ঘন্টা পর্যন্ত
স্থায়ী হয়৷ এই সময় পুরুষ কাঁকড়ার নিচের দিকে সাঁতারের পাগুলির সহায়তায়
স্ত্রী কাঁকড়া তার উদরখন্ডের নিচের ঢাকনা উন্মুক্ত করে৷ ফলস্বরূপ পুরুষ
কাঁকড়ার স্পারম্যাটোফোর শুক্রাণুগুলি স্ত্রী কাঁকড়া তার সেমিনাল রিসেপটেকল
যা ডিম্বনালীতে ধারণ করে৷
|
|
 |
নিষেক
|
ডিমগুলি
পরিণত হওয়ার পর সঞ্চিত স্পারম্যাটোফোর/ শুক্রাণু দ্বারা অন্তঃনিষেক সম্পূর্ণ
হয়৷ পরবর্তীতে নিষেক সম্পূর্ণ হবার পর নিষিক্ত ডিমগুলি ঠেলে বেরিয়ে এসে
উদরখন্ডের নিচের দিকে স্পঞ্জের মতো ঝোলে৷ নিষিক্ত ডিমের থলি যা “বেরি” নামে
পরিচিত, তা ঝুলতে থাকে উদরখন্ড সংলগ্ন নিচের চার জোড়া পায়ের মাঝে৷
Scylla serrata-এর ক্ষেত্রে বেরীতে নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ ৫-২৫
লক্ষ৷
Scylla
tranquebarica-এর ক্ষেত্রে বেরীতে
নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ ২০-৩০ লক্ষ৷ প্রায় ২ সপ্তাহ নিষিক্ত ডিমগুলি বেরিতে
থাকে৷ এই সময় নিষিক্ত ডিমগুলি ধীরে ধীরে কমলা খেকে বাদামী, পরবর্তীতে কালো
রঙের হয়৷ প্রজনন সময় এবং জুভেনাইল প্রাপ্তি ভারতীয় উপকূলে
নিম্নরূপ-
|
প্রজনন সময়
|
জুভেনাইল প্রাপ্তি
|
উপকূল
|
সর্বোচ্চ প্রাপ্তি
|
উপকূল
|
সর্বোচ্চ প্রাপ্তি
|
কেরালা
|
সেপ্টেম্বর-ফেব্রুয়ারী
|
ভীমবানান্দ ব্যাকওয়াটার
|
মে-অক্টোবর
|
অন্ধ্রপ্রদেশ
|
মে- জুন
|
পুলিকট লেক/ এন্নোর উপকূল
|
ডিসেম্বর-মে
|
অক্টোবর-ফেব্রুয়ারী
|
কোভালাস/ পিচাভারস
|
জানুয়ারী-মার্চ
|
তামিলনাড়ু
|
সেপ্টেম্বর-এপ্রিল
|
তুতিকোরিন
|
এপ্রিল-জুন/ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর
|
উড়িষ্যা
|
নভেম্বর-জানুয়ারী
|
কাঁকিনাড
|
ডিসেম্বর-এপ্রিল/ জুলাই-আগষ্ট
|
পশ্চিমবঙ্গ
|
মে-আগষ্ট
|
চিল্কা হ্রদ
|
মার্চ-জুন
|
হুগলী-মাতলা মোহনা
|
নভেম্বর-ফেব্রুয়ারী
|
|
|
 |
দশা
|
নিষিক্ত
ডিমগুলি লার্ভা দশায় রূপান্তরের আগে কালো রঙের হয়৷ যেহেতু এই সময় লার্ভা দশার
পুঞ্জাক্ষি গঠন শুরু হয়, তাই কালো রঙের দেখায়৷ মোট পাঁচটি জোয়িয়া দশা এবং
একটি মেগালোপা দশা পেরিয়ে একমাস সময়ের মধ্যে প্রথম কাঁকড়ার রূপ পায় যা
জুভেনাইল নামে পরিচিত৷ প্রতিটি জোয়িয়া দশার মধ্যবর্তীতে সময় লাগে ৩-৪ দিন,
মেগালোপা দশায় লাগে ১২ দিন৷ জোয়িয়া দশায় এরা প্রধানতঃ প্রাণীকণা খায় এমনকি
নিজেদের জোয়িয়া দশাগুলিকেও খায়, যাতে বোঝা যায় এদের মাংসাশী প্রবনতা৷
|
|
 |
বর্তমান কাঁকড়া
চাষের পরিস্থিতি, বাজার ও প্রতিবন্ধকতা
|
এটা দেখা
গেছে যে জোয়ার-ভাটা খেলা নদীগুলোর দু’পাশের গ্রামে কাঁকড়াধরাদের বাস৷
বুধাখালি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সার্ভে করে দেখা গেছে যে মোট জনসংখ্যার ৫
শতাংশ হল কাঁকড়াধরা৷ এক্ষেত্রে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, কয়েকটি গ্রাম আছে
যাতে শুধুমাত্র কাঁকড়াধরারাই থাকে, যেমন- কাকদ্বীপ পুলিস থানার উত্তর
কাশীয়াবাদ গ্রাম৷ এই গ্রামে প্রায় একশত মুন্ডা পরিবারের বাস৷ আবার
কাঁকড়াধরাদের শতকরা হার যত সমুদ্রের দিকে এগোন যায় তত বাড়তে
থাকে৷
কাঁকড়ার সবচেয়ে বড় বাজার হল ক্যানিং৷ এখানে অনেক আড়ত আছে
যেখানে কাঁকড়া নীলাম হয়৷ তাছাড়া, শামুকপোতা, প্রতাপনগর, সাতজেলিয়া, গোসাবা,
ঝড়খালি, ছোটমোল্লাখালি, দেউলবাড়ির কাঁকড়াধরারা এখানেই তাদের কাঁকড়া
বিক্রি করেন৷ এদের মধ্যে দাদন প্রথা খুবই প্রচলিত৷ তাঁরা আড়তদার, মালিক,
মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম নেয়৷ ব্যাতিক্রমও অবশ্য আছে৷ তাঁরা নিজেরা
স্বনির্ভর৷ কাঁকড়া চাষে মহাজন নামে আরও এক শ্রেণীর লোক আছে৷ যাদের একাধিক
নৌকা আছে এবং ভাড়া করা লোক নিয়োগ করে কাঁকড়া ধরে৷ এদের কেউ নৌকাটাও ভাড়া
করে৷ তারা আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে তার কিছু টাকা মাঝিদের গৃহস্থালীর
খরচ হিসাবে দেয়৷ মাঝিদের হয় নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে চুক্তি হয়, নয়তো শিকারের
পরিমানের ওপর টাকা পান৷
আড়তদাররা কাঁকড়া ধরাদের টাকা অগ্রিম দেয় এই
শর্তে যে তাদের আড়তের সরবরাহ ভাল থাকবে৷ এই অগ্রিমের পরিমান দল অনুযায়ী
পরিবর্তিত হয়৷ এইভাবে তার সুদও হয় রকমারী৷ সাধারণ হার হল প্রতি শ’তে প্রতি
যাত্রায় পাঁচ থেকে দশ টাকা৷ এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের টাকা কাটা হয়৷
যখন
শিকারের পরিমাণ কম হয় তখনও কাঁকড়াধরারা দাদন পেতে থাকে৷ এরফলে তারা আরও
ঋণজালে আবদ্ধ হয়৷ এমনকি খুব ভাল সময়েও তারা ঋণমুক্ত হতে পারে না৷
এখনও পর্যন্ত যথার্থভাবে কাঁকড়া চাষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি৷
প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যথাযথ প্রশাসনিক নীতি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শদান, আর্থিক
সহায়তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে ভারতবর্ষে এখনও পর্যন্ত খুব অল্প জলাশয়েই
কাঁকড়া চাষ হয়ে থাকে৷ কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে মত্স্যজাতীয় গবেষণাগারে
পরীক্ষামূলকভাবে এর মডেল তৈরীর সফলতা পাওয়া গেছে৷ এখন গবেষণাগারের ফলাফল
ছড়িয়ে দিতে হবে প্রকৃত মত্স্যচাষীদের কাছে৷ তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা এবং প্রাখমিকভাবে কিছু অনুদান যাতে সে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক চেতনা নিয়ে
কাঁকড়া চাষ শুরু শূরূ করতে পারে এবং এর ফলে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে
বৈদেশিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া সম্ভব৷ কিন্ত্ত তার জন্য কিছু
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এই মুহূর্তের জরুরী৷ (১) কৃত্রিম ভাবে কাঁকড়ার
ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা করা, যাতে কাঁকড়া মজুতের সময় জোগান স্বাভাবিক থাকে ৷
(২) ৪০-৮০ গ্রামের জুভেনাইল কাঁকড়াগুলিকে বাজারে সরাসরি (দালালের
মাধ্যমে নয়) বিক্রযোগ্য করে তোলা৷ আমরা সুন্দরবনে সামুদ্রিক কচ্ছপ ও অন্যান্য
জীববৈচিত্রের উপস্থিতি সমীক্ষা করে দেখার সময় দেখেছি প্রতি বছর শীতকালীন
অস্থায়ী বাজার তৈরী হয় বিভিন্ন খালের মুখে, সপ্তমুখীর কাছে৷ বাজার মানে
দু-তিনটি নৌকা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে৷এই সব নৌকার কাঠের পাটাতনের তলায় বরফ
রাখা থাকে৷কাঁকড়াধরারা বাঘের ভয়, কুমিরের ভয়, সাপের কামড়ের ভয় সাথে করে
সারাদিন সারারাত খাঁড়িতে বসে কাঁকড়া ধরে, তারপর অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে
নৌকাশুদ্ধ কাঁকড়া বিক্রি করে দেয় এই সব অস্থায়ী ভাসমান বাজারে৷ অন্যান্য মাছ
ধরা নৌকাগুলোও তাদের মাছ এখানে বিক্রি করে৷ এখান থেকে
Middle Man বা দালালদের মাধ্যমে রূপালি ফসল পৌঁছায় বাজারে৷ জীবনের কোনরকম ঝুঁকি
ছাড়াই এই মধ্যবর্তী বিক্রেতারা প্রকৃত মাছমারাদের থেকে দ্বিগুন লাভ লুটে
নেয়৷ তাই সরকারি তরফ থেকে
Co-operative তৈরী করে এদের
আর্থিক অনুদান দিয়ে নিজেদের বাজার নিজেরাই যাতে তৈরী করতে পারে তার ব্যবস্থা
করা যেতে পারে৷ (৩) সদ্য খোলস ছাড়া কাঁকড়া যা ওয়াটার ক্র্যাব নামে
পরিচিত এবং অপরিণত স্ত্রী কাঁকড়াগুলিকে প্রজনন অবস্থা পর্যন্ত পালন করা বা
ফ্যাটনিং করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করা৷
(৪) রপ্তানিযোগ্য কাঁকড়াগুলির সঠিক বাজারের ব্যবস্থা করা৷ বৈজ্ঞানিক
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বাজার, রাস্তা ও মিষ্টি জলের ব্যবস্থা আরও
রপ্তানিকারকদের ডেকে নিয়ে আসবে- এটা নিশ্চিত৷ (৫) জীবিত অবস্থায় ও
প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় কাঁকড়ার সঠিক রপ্তানীর ব্যবস্থা করা৷এর জন্য
ইনস্যুলেটড/পারফোরেটেড অর্থাত ছিদ্রছাড়া এবং ছিদ্রযুক্ত পরিবহন ব্যবস্থা
প্রয়োজন৷ প্রয়োজন ছোট ছোট দ্বিচক্রযানের
(Two wheller) গাড়ী যা কিনা শুধুমাত্র এই ফসল পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে নক্সা করা৷
|

|
|
 |
মজুতের জন্য কাঁকড়ার
জুভেনাইল উত্পাদন
|
বর্তমানে
২৩-৩৩ গ্রামের ছোট কাঁকড়ার মেগালোপা দশাগুলি, যা আহরিত হয় লবণাম্বু জঙ্গল
থেকে, লালন করা হয় ৪০-৫০ গ্রাম পর্যন্ত, মজুত পুকুরেই৷ এক্ষেত্রে সাধারণতঃ
প্রয়োজনীয় সময় ১৫-২৫ দিন পর্যন্ত৷ লালনকালীন সমস্ত নির্মিত খাঁচায় যদি
প্রতি বর্গ মিটারে ১২০টি হারে মজুত করে টাটকা কম দামি মাছ/শামুক/ঝিনুক মাংস
খাওয়ানো যায়, তাহলে দ্রুত বৃদ্ধি হয়ে জুভেনাইল দশার পৌঁছায় যা মজুতের যোগ্য৷
যদিও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্রক্ষিম ভাবে হ্যাচারীতে প্রজননের
মাধ্যমে ভান্ডার ডিম ফোটানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু তা এখনও পর্যন্ত বাণিজ্য
সফল জায়গায় পোঁছানো যায়নি৷ সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গও জুভেনাইল মজুত করে বাজারে
বিক্রয়যোগ্য অবস্থা পর্যন্ত পালন করে৷ ভারতের উপকূলবর্তী রাজ্যগুলির
মধ্যে কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ুতে কাঁকড়া এই
পদ্ধতিতে রপ্তানিজাত করে তোলার প্রয়াস শুরু হয়েছে৷
|

|
|
 |
কাঁকড়া চাষের
সতর্কতা
|
(১)
কাঁকড়া চাষের পুকুরের তলায় জমে থাকা বিষাক্ত ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নেওয়ার জন্য
উপযক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে হবে৷ জিওলাইট প্লাস দিতে হবে প্রতিটি ফ্যাটিনিং
চাষের পর৷ এরা যেহেকু জীবিত খাবার এবং প্রোটিনযুক্ত খাবার খায় ফলতঃ খামারের
তলায় অভুক্ত খাবার থেকে গ্যাস তৈরী হতে পারে৷ উপযুক্ত রাসায়নিক দিয়ে সেই
অবাঞ্ছিত গ্যাসকে শোষণকরা সম্ভব হবে৷ প্রতি দু’বার ফসল তোলার পর পুকুরের তলায়
জমে থাকা পলি তুলে ফেলে
CaO বা পাথুরে চুন দিয়ে সাতদিন পুকুর ফেলে
রাখার পর আবার জল ঢোকাতে হবে৷ (২) কাঁকড়া গর্ত কেটে একস্থান থেকে অন্য
স্থানে চলে যেতে পারে৷ এই স্থানান্থর এড়াতে স্লুইশ গেট সহ খামারের চারদিকে
বাঁশের পাটা ও নাইলন জালের বেড়া দিতে হবে, যা মাটির নিচে অন্ততঃ ২ফুট এবং
মাটির উপরে অন্ততঃ ৩ফুট থাকবে৷ প্লাস্টিক সীট পাড়ের ওপর দিয়ে তার ওপর মাটি
দিয়ে পাড় তৈরী করলেও কাঁকড়া পাড় ফুটো করে চলে যেতে পারবে না৷ যেহেতু
কাঁকড়া একে অপরকে খেয়ে ফেলতে পারে এই প্রবণতা এড়ানোর স্বর্থে নিয়মিত
অতিরিক্ত খাদ্যের যোগান রাখা জরুরী৷ খোলক যত তাড়াতাড়ি শক্ত হবে ততই বিক্রয়
উপযোগী হবে, সেই কারণে জলের গুণাগুণ উপযুক্ত মাত্রায় রাখা জরুরী৷ খামারে নরম
কাঁকড়াগুলির প্রয়োজনীয় লুকানোর জায়গা রাখা জরুরী৷ ভাঙ্গা পাইপ, অব্যবহৃত
টায়ার ইত্যাদি ব্যবহৃত হতে পারে লুকানোর আস্তানা হিসাবে, ১৫ সেমিঃ
ব্যাসার্ধের লম্বা পাইপের টুকরাগুলি খামারের তলদেশে ছড়িয়ে রাখতে হবে৷
খামারের মাঝখানে উঁচু মাটির ঢিবি বানিয়ে তাতে লবণাম্বু উদ্ভিদের কিছু চারা
যেমন বাণী, হেঁতাল, গেঁওয়া লাগালে কাঁকড়া যেমন স্বচ্ছন্দ বোধ করে তেমনি জলের
অতিরিক্ত খাদ্য শোষণ করে নিয়ে জলকে দূষণমুক্ত রাখে৷ কাঁকড়া বিক্রিযোগ্য হলে
গোণ বা কোটাল-এর সময় আঁটেলি বসিয়ে তা ধরা যেতে পারে অথবা দোন লাগিয়েও ধরা হয়৷
|
|
 |
কাদা কাঁকড়ার
পরিবহন
|
ফসল আহরণ পরবর্তী পরিবহন- আহরিত কাঁকড়া বাজারে নিয়ে যাবার আগে
প্রতিটিকে বাঁধা হয় সরু নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি অথবা ভিজে খড় দিয়ে, তার
পরে ঝুড়িতে রাখা হয়৷ ঝুড়িগুলি ভিজে চটে বস্তা চাপা দেওয়া থাকে৷ যাতে
জলীয়ভাব বজায় থাকে৷ এই ধরণের ঝুড়িতে যত বেশি বাতাস চলাচল করবে, তত বেঁচে
থাকার হারও বাড়বে৷ পরিবহনের সময় জলীয়ভাব ঠিক রাখতে পারলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত
কাঁকড়াগুলি বেঁচে থাকে সর্বোপরি পরিবহনের সময় কখনই সরাসরি সূর্য়ের আলো না
পড়াই ভালো৷ ৫০ সেমিঃ ব্যাসার্দ্ধের একটি ঝুড়িতে প্রায় ৩০০-৫০০ গ্রাম
কাঁকড়া (যার ক্যারাপেস ২.৫ সেমিঃ চওড়া) পরিবহন সম্ভব৷ যেহেতু শ্যাওলা/
ঝাঁঝি পচনশীল তাই অনেকসময় দূরবর্তী স্থানে ১০০% জীবিতপরিবহনের স্বার্থে
মোহনার জলে তুলা ভিজিয়ে কাঁকড়া পরিবহনের ঝুড়িতে দিলে কাঁকড়ার নড়াচড়াও
বন্ধ হবে৷ ভিজে কাঠের ভূষি প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যায় কাঁকড়া রপ্তানীর
ক্ষেত্রে৷ ৫০-১২০মিমি. চওড়া তার প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে আহরণের পর খোলামুখ
পাত্রে ২০-৫৩ কিমি. সড়কপথে পরিবহন করে ৫৫-১০০% বাঁচার হার লক্ষ্য করা গেছে৷
বিশ্বকৃষি এবং খাদ্য সংস্থা
(FAO) এর ১৬২ নং ধারা অনুযায়ী ২০০ গ্রামের কম এবং ১০ সেমি. এর কম চওড়া
ক্যারাপেসওলা কাঁকড়া রপ্তানী যোগ্য নয়৷ কাঁকড়ার মোট ওজনের ৩৬-৩৮% দাঁড়া
ও পা৷ ২২-২৪% খোলক, দেহের বাকী অংশে প্রাপ্ত মাংস ২৯-৩৬% ৷ আবার দাঁড়া ও
পা-এর মধ্যে মাংসের পরিমাণ ৩৩-৪২%, যা পুরোটাই মাংসজ প্রোটিন হিসাবে খাওয়ার
যোগ্য৷ মাংসের মধ্যে ভাল মাত্রায় প্রোটিন ও মুক্ত আমিনো আসিড আছে৷ প্রসেসিং
সেন্টারে প্রাপ্ত কাঁকড়ার খোলস থেকে যে সমস্ত ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ
রাসায়নিক পাওয়া যায় সেগুলি হল কাইটিন, কাইটোসান এবং গ্লুকোস আমিনো হাইড্রোক্লরাইড, বিশ্বের
বাজারে যার মূল্য অপরিসীম৷
|
|
 |
কাইটিন
|
কাইটিন
একটি প্রাকৃতিক জৈবরাসায়নিক পদার্থ যা আদপে শর্করার দীর্ঘশৃঙ্খল৷ বিভিন্ন প্রাণীর (যেমন চিংড়ি, কাঁকড়াইত্যাদির)
বহিঃকঙ্কালে (খোলক) এটি প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে৷ জাপানে কাইটিন খাদ্য
হিসাবে ব্যবহার হয়৷ রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা বাড়াতে, বার্ধক্যের বিলম্বিত করতে,
আরোগ্য লাভের পথে এবং জৈবছন্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে৷
উত্স- কবচী প্রাণীর খোলকই এর প্রধান উত্স৷ প্রকৃতপক্ষে কাঁকড়া ও চিংড়ির
Processing
Industry-র উদ্বৃত্ত খোলকজাত দূষণ নিয়ন্ত্রণের চিন্তা থেকেই
কাইটিন শিল্পের ধারণা জন্মায়৷ বাগদার মাথার খোলকে ৩৯ শতাংশ এবং দেহের খোলকে
৩৬.৫ শতাংশ কাইটিন বর্তমান৷ কাদা কাঁকড়ার
(Scylla serrata) দেহের খোলকে ১১.৭ শতাংশ, দাঁড়ায় ১০.৪ শতাংশ এবং
উপাঙ্গে ১৬.১ কাইটিন পাওয়া যায়৷ প্রস্ত্ততি পদ্ধতি- কবচী প্রাণীর খোলকে
কাইটিন ছাড়াও খনিজ পদার্থ ও প্রোটিন থাকে৷ প্রস্তুত প্রণালীর নীতি হল
কাইটিনকে বাকী পদার্থ থেকে আলাদা করা৷ ১) প্রথমে কাঁকড়ার খোলাকে গুঁড়ো
করা হয়৷ ২) গুঁড়ো পদার্থকে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড দিয়ে বিক্রিয়া ঘটানো হয়৷
বিক্রিয়াজাত পদার্থকে ভাল করে ধুয়ে নেওয়া হয়৷ এর ফলে প্রোটিন পদার্থ মুক্ত
হয়৷ ৩) এর পর হাইড্রোক্লোরিক আসিডের সঙ্গে
বিক্রিয়ার খনিজ পদার্থকে আলাদা করা হয়৷ ৪) বিক্রিয়াজাত পদার্থ ধুয়ে আলাদা
করে শুকিয়ে প্যাকিং করে রাখা হয়৷ এইভাবে প্রাপ্ত কাইটিন বহুদিন সংরক্ষণ করা
যায়৷
পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র উপকূলে নানা প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায় যার
মধ্যে কাদা কাঁকড়ার চাষ করা লাভজনক৷ বিশ্ববাজারে কাদা কাঁকড়ার চাহিদাও
প্রচুর৷ এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কাদা কাঁকড়া বা মেকো পাওয়া যায়৷ এগুলোকে
সংগ্রহ করে দুধরনের কাঁকড়া চাষের মডেল খামার করা সম্ভব হয়েছে৷ সুন্দরবন
এলাকায় জোয়ারভাটা প্লাবিত অঞ্চলে মাঝারি আকৃতির পুকুর (৪০মি.-৫০মি. লম্বা এবং
২০মি.- ২৫মি. চওড়া) খুঁড়ে খামার তৈরী করা হয়েছে৷
এইভাবে খনন করা পুকুরের মাঝে একটি চর রাখা প্রয়োজন যা পুকুরের তলদেশে গিয়ে
মিশবে৷ চরটির নীচের আয়তন হবে ৮মি.x৪মি. এবং জলের ওপর জেগে থাকা
পৃষ্ঠের আয়তন হবে ৪মি.x২মি.৷ পুকুরের চারপাশ ভালভাবে
বাঁশের বেড়া বা নাইলনের জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়া দরকার৷ একপাশে একটি জলবাহি নালা
ও অপরপাশে নির্গমন নালা থাকবে ও এদের মুখ বাঁশের জাল দিয়ে আটকান থাকবে৷
জোয়ারের সময় জল জলবাহী নালা দিয়ে পুকুরে আসবে৷ পুকুরের মাঝের চরটির উচ্চতা
এমন হবে যেন জোয়ারের সময় চরটি ডুবে যায় ও অন্য সময় জেগে থাকে৷ এই এলাকাতে
কাঁকড়ারা গর্ত করে থাকে ও তাদের খাবার দেওয়া হয়৷ চর এলাকা ও পুকুরের চারপাশে
কয়েকটি লবণান্বু উদ্ভিদ (ম্যানগ্রোভ) লাগানো দরকার, এতে কাঁকড়ার স্বাভাবিক
বাসস্থান তৈরী হয়৷ এক্ষেত্রে জলের গভীরতা ১.৫মি.-২মি. রাখা দরকার৷ ২-৩
সেমি. আকারের শিশু কাঁকড়া বিঘা প্রতি ৬০০-৬৫০টি চাষের পুকুরে ছাড়া হয়৷
লবণাক্ততা থাকা উচিত ৫-২০ পি.পি.টি.৷ যেহেতু এরা খাবার না থাকলে একে অপরকে
খেযে ফেলে তাই নিয়মিত এদের খাবার দেওয়া দরকার৷ কাঁকড়া নিশাচর প্রাণী বলে
সন্ধ্যার দিকে খাবার দেওয়া ভাল৷ এছাড়া জোয়ারের জলেও প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়ার
খাবার ভেসে আসে৷ কাঁকড়ারা ৫-৬ মাসে ২৫০-৩০০ গ্রাম ওজন লাভ করে তখন এদের
ধরে বিক্রী করা যায়৷ কাদা কাঁকড়া ৫-৫০ পি.পি.টি. লবণাক্ততা সম্পন্ন জলে
বেঁচে থাকতে পারে৷ কাঁকড়া চাষের জন্য যে জলাশয় নির্দিষ্ট করা হয় তাতে জোয়ার
ভাঁটার আনাগোনা থাকলে ভাল৷
|
|
 |
প্রকল্প
|
প্রাথমিকভাবে কাঁকড়ার খোলক শক্তকরণ ও বৃদ্ধিকরণের জন্য উত্তর ২৪
পরগণার সন্দেশখালি ১ ও ২ নং ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং ব্লক বেছে নেওয়া
হয়েছে৷ এসকল এলাকায় অবৈজ্ঞানিকভাবে প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে, কিন্তু
তাদের উত্পাদন কখনই আশানুরূপ নয়৷ যেমন -সন্দেশখালি ২নং ব্লকে ২৬০০ হেক্টর
এলাকা জুড়ে কাঁকড়ার খামার রয়েছে৷ তাছাড়া স্থানীয় মানুষ বিভিন্নভাবে
কাঁকড়া সংগ্রহ করে তার খোলক শক্ত করে বিক্রি করেন৷ এই চাষের কোন স্থায়ী
পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি৷ তাই প্রাথনিকভাবে বাছাই করা জেলা দুটিতে তিনটি খোলক
শক্তকরণ বা শক্ত হওয়া ও তিনটি বৃদ্ধিকরণ বা সহজ কথায় বৃদ্ধিপাওয়া খামারে
পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করা হয়েছে৷ এক্ষেত্রে খামারগুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের
নিয়ম মেনে চাষীদের বন্টন করা হয়েছে এবং চাষ মত্স্যদপ্তরের কারিগরী সহায়তা এবং
পরিবেশ দপ্তরের আর্থিক সহায়তায় শুরু হয়েছে৷
|
|
 |
কাঁকড়ার খোলক শক্তকরণ চাষ
(নরম কাঁকড়ার শক্ত হওয়া)
|
এই ধরনের
চাষের ক্ষেত্রে সদ্য খোলক বদলেছে এমন নরম কাঁকড়া সংগ্রহ করে তাদের ২০-৩০ দিন
খামারে প্রতিপালন করা হচ্ছে৷ এর ফলে কাঁকড়ার খোলক শক্ত হয় এবং পুরুষ কাঁকড়া
মাংসে ও স্ত্রী কাঁকড়া ডিম্বাশয়ে পরিপূর্ণ হয়৷ এই অবস্থায় কাঁকড়াগুলো
বিভিন্ন রপ্তানীকারক সংস্থা কিনে নিচ্ছে৷ কাঁকড়ার খোলক শক্তকরণ খুবই লাভজনক,
কারণ অতি অল্পসময়ে কম বিনিয়োগে প্রচুর লাভ করা যায়৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে
পরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়ার বাজারদর পুরুষ কাঁকড়ার চেয়ে অনেক বেশী৷
প্রকল্পাধীন খামারে চাষীরা নরম কাঁকড়া স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করে
প্রতিবর্গ মিটারে ২-৩টি করে কাঁকড়া ছাড়েন৷ স্ত্রী ও পুরুষ কাঁকড়া আলাদা
আলাদা পুকুরে ছাড়া হয়৷ ছাড়ার সময় স্ত্রী কাঁকড়াগুলি ১৮০-২০০ গ্রাম ও পুরুষ
কাঁকড়াগুলির ওজন ৩০০ গ্রাম ছিল৷ কাঁকড়াগুলিকে দৈনিক দেহের ওজনের ১০% হারে
খেতে দেওয়া হচ্ছে৷ এই খাবার দুবার দেওয়া হচ্ছে৷ খাবারের মধ্যে মূলত শুকনো ও
পরিত্যক্ত মাছ ও মাছের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছে৷ নিয়মিত জল পরিবর্তন”খোলক
শক্তকরণ” চাষের অত্যন্ত জরুরী বিষয়৷ মাঝে মাঝে,চুন ও জিওলাইট প্লাস ও পুকুরে
দেওয়া হয়৷ দুটি চাষের মাঝে ১৫-২০ দিন অন্তর রাখা দরকার৷ সম্ভব হলে পুকুর
শুকিয়ে পাঁক তুলে দেওয়া দরকার৷ নতুন জল ঢোকানোর পর জলের লবনাক্ততা, পি.এইচ.,
দ্রবীভূত অক্সিজেন ইত্যাদি দেখে কাঁকড়া ছাড়তে
হবে৷
|
|
 |
কাঁকড়ার বৃদ্ধিকরণ চাষ
|
দেড়
থেকে দুইঞ্চি সাইজের শিশু কাঁকড়া স্থানীয় সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কিনে
খামারের পুকুরে প্রতি বর্গ মিটারে ৪টি সংখ্যায় ছাড়া হচ্ছে৷ কাঁকড়াগুলিকে
দিনে দুবার শুকনো ও পরিত্যক্ত মাছ খাবার হিসাবে দেওয়া হচ্ছে৷ তিন খেকে চার
মাসে কাঁকড়াগুলি ২০০-২৫০ গ্রাম ওজন প্রাপ্ত হলে তাদের বাজারজাত করা হচ্ছে৷
কাঁকড়ার একটি বৈশিষ্ট্য হল একে অপরকে খেয়ে ফেলা৷ সেজন্য চাষের পুকুরে
কাঁকড়ার লুকোবার জায়গা হিসাবে পি.ভি.সি. পাইপ, ফাঁপা বাঁশের টুকরো ইত্যাদি
রাখা হয় যাতে তারা আক্রমণকারী কাঁকড়ার থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিতে পারে৷
কাঁকড়া খামারের পুকুরগুলির চারপাশের নাইলন জাল ও পলিথিন শীট দিয়ে ঘিরে দেওয়া
হয়৷ এছাড়া কাঁকড়াগুলিকে ছাড়ার আগে ০.৫% মিথিলিন ব্লু দ্রবণে দশমিনিট
ডুবিয়ে নিয়ে তবে ছাড়া হয়৷ এর ফলে কাঁকড়ার দেহে কোন রোগ জীবাণু থাকলে তা
খামারের জলে সংক্রমণ হবার আশঙ্কা থাকে না৷ প্রতিটি কাঁকড়া খামারে জল
পরিবর্তনের ব্যবস্থা ছিল৷
|
|
 |