গো-পালন |
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
ভূমিকা |
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে দেখা গেছে মানুষে গরুতে সহাবস্থান৷
ভারতবর্ষে বৈদিক যুগে গাভীকে ভক্তি করা হত মা বলে৷
গরু থেকে দুধ ছাড়া যা ব্যবহার করা হয় বা যা রপ্তানি করে বৈদেশিক মূদ্রা
আমদানি হয় তা হল মাংস, হাড়, চামড়া ইত্যাদি তাছাড়া গোবর গ্যাস, সার ও শ্রম
তো আছেই৷
|
|

|
বিভিন্ন প্রজাতি |
দেশী বলতে সেই ধরনের গরু যার আদি বাসস্থান এই ভারতবর্ষ৷
এই গরুকে প্রকৃতিগত ভাবে তিন ভাগে ভাগ করা যায়৷ |
-
দুধেল জাতের গরু - সাইওয়াল, সিন্ধ্রি, গির ও দেওয়ানি৷
-
মাল-বহন কারী গরু - অমৃতমহল, কাঙ্গায়াম, মালভি, সিরি ও হালিকার৷
-
দৈতকাজের জন্য গরু - হরিয়ানা, ওংগোল, থারপারকার ও কাঙ্গরাজ৷ |
এদের মধ্যে কিছু গরু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল - |
সাইওয়াল - এখন ভারতবর্ষে সরচেয়ে ভাল দুধেলা গাইগরু এই প্রজাতিই৷
চওড়া
মাথা, ছোট পা, ছোট ও মোটা শিং, সুদৃঢ় চেহারা, ঢিলে চামড়া এদের বৈশিষ্ট্য৷
রং লাল বা ফিকে লাল ও কখনও ছোপ থাকে৷ পুরুষদের ভারী ও চওড়া কুঁজ ও গলকম্বল
থাকে৷ গাভীদের ছেড়ে পুষলে দৈনিক ৬ - ৭ কেজি ও খামারে
সুষম খাদ্য দিয়ে পুষলে দৈনিক ৯ - ১০ কেজি দুধ দেয়৷
সিন্ধ্রি - দুধ উত্পাদনের ক্ষেত্রে সাইওয়ালের পরেই এর স্থান৷ মাঝারি গঠন৷
সুঠাম দেহ মোটা শিং বাইরের দিকে বারকরা, লেজ মাটিতে ঝোলানো ও ছোট ছোট পা আর
গায়ের রং লাল৷ প্রতিকুল আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নিতে পারে৷ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও
বেশী৷ ছেড়ে পুষলেও এরা প্রতিদিন গড়ে ৪ - ৫
কেজি দুধ দেয় আর সুসংহত খামারে পুষলে ৭ কেজির ওপর দুধ দেবে৷
হরিয়ানা - লম্বায় ও উচ্চতায় এরা বিরাট আকার৷ গায়ের রং সাদা, শিং মোটা ও
লম্বা৷ পিছনের দিকে শিং জোড়া মিলে একটা বৃত্ত তৈরী
করে৷ ছেড়ে পুষলে গড়ে দিনে এরা তিন কেজি দুধ দেয় আর সুসংহত ভাবে পুষলে গড়ে
দিনে ৩ - ৪ কেজি দুধ দেয়৷
ওংগোল - ভারতের সবচেয়ে ভাল জাতের গরু৷ বলদগুলি যেমন কাজে পটু গাইগুলিও
তেমনি দুধ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ বিজ্ঞান সম্মত ভাবে
পুষলে ৩ - ৫ কেজি গড়ে দিনে দুধ দেয়৷ না হলেও কম করে ২ - ৩ কেজি দেয়৷ গায়ের
রং সাদা তবে পুরুষের পায়ে বা লেজের শেষের দিকটা ধুসর রংয়ের হয়৷ |
বিদেশী গরুর সুবিধা |
-
বিদেশী গরু দেশী গরুর তুলনায় বেশ কয়েকগুণ বেশী দুধ দেয়৷ -
দেশী গরুর তুলনায় অল্প বয়সে যৌবনে পদার্পন করে৷ -
দু বার বাচ্চা দেওয়ার অন্তবর্তী সময় দেশী গাভীর চাইতে অনেক কম৷
|
বিদেশী গরুর অসুবিধা |
-
অধিক পরিচর্যার দরকার হয়৷ -
সুষম খাদ্যের দরকার৷
-
বেশী ক্লেশ সহ্য করতে পারে না৷
-
রোগের প্রকোপ বেশী৷
|
এই সব কারণে বিদেশী গাই ঠিকমত পালন করা প্রায় অসম্ভব৷ তাই বিদেশী উচ্চ
দুধ দেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত প্রজাতির ষাঁড়ের বীর্য দিয়ে দেশী গাইকে সংকরায়ন
করালে যে বাচ্চা হবে তাকে বলে সংকর বাচ্চা৷ তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হবে দেশী
ও বিদেশী গরুর মাঝামাঝি যেমন - |
-
দেশী গরুর তুলনায় ২ - ৪ গুণ বেশী দুধ দেয়৷
-
দেশী গরুর তুলনায় অল্প বয়সে যৌবন প্রাপ্ত হয়৷
-
গাই এর দুবার বাচ্চা দেওয়ার অন্তবর্তী কালীন সময় অনেক কম হয়৷
-
দেশী আবহাওয়ায় ভাল ভাবেই টিকে থাকতে পারে৷
-
বিদেশী গরুর তুলনায় রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশী৷ |
জার্সি - ইংলিস চ্যানেলের জার্সি নামক দ্বীপে এদের আদি বাসস্থান৷
গায়ের রং হালকা লাল থেকে কালো হতে পারে এবং সাদা ছোপ ছোপ আছে৷ লেজের চুলের
অংশ কালো বা সাদা হতে পারে৷ এদের কুঁজ বলতে কিছু নেই৷ ঘাড়, কুঁজের অংশ, পিঠ,
কোমর ও লেজের গোড়া একই সরলরেখায় থাকে৷ পালানের গঠন ও আকৃতি খুবই ভাল এবং দুধ
দেওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ জার্সির দুধে কঠিন পদার্থের ভাগ শতকরা ১৫ ও স্নেহ
পদার্থের ভাগ শতকরা ৫.৩৷
জার্সি ষাঁড়ের সঙ্গে দেশী গাভীর সংকরায়নের
বাচ্চার দুধ দেওয়ার ক্ষমতা দিনে ৫ - ৭ কেজি৷ |
|
|
হলষ্টীন ফ্রেসিয়ান - হল্যান্ড দেশের গরু, গায়ের রং সাদা কালো মেশানো৷
এদের শরীরটা সম্পূর্ণ কালো রং এর হয়৷ অথবা সাদার উপর কালো ছোপ ছোপ হয়৷ এদের
মাথা লম্বা সরু ও সোজা৷ দেহ খুবই শক্ত সমর্থ সরু সোজা ও রূঢ় হয়৷ এদের খুব
বড় ধরনের পালান৷ গাই গরুরা শান্ত প্রকৃতির হয় কিন্তু প্রচুর দুধ দেয়৷ দুধে
চর্বি জাতীয় পদার্থ ২.৫ থেকে ৪.৩ শতাংশ৷
খাটি হলষ্টীন গরু দিনে ৩০ কেজি ও তার
বেশী দুধ দেয়৷ পশ্চিমবাংলায় সংকর হলষ্টীন গরু কম করে
দিনে ১০ কেজি ও বেশী করে দিনে ২০ কেজি দুধ দিচ্ছে৷ |
|
ব্রাউন সুইস - সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য এলাকায় এই জাতের গরু প্রথম দেখা
যায়৷ এদের শরীর লম্বাটে ধরনের৷ মাথা বড় মনে হয় একটা থালার মত৷ গায়ের চামড়া
মোটা ও আলাদা হয়৷ গায়ের রং কালো বা হালকা হরিদ্রাভ বাদামী বিশিষ্ট৷ মুখ ও
পিঠের রং হাল্কা৷ লেজের গোড়া নাক ও শিং-এর ওপরের রং কালো৷ সুইজারল্যান্ডে
এদের দুধ ও মাংস উত্পাদনের কাজে এবং জমিতে চাষ ও গাড়ী টানার কাজে ব্যবহার
হচ্ছে৷ দুধে স্নেহ পদার্থের ভাগ শতকরা ৪৷
এদের দুধ দেওয়ার ক্ষমতা দিনে ২২
- ২৫ কেজি৷ আমাদের দেশে খাঁটি ব্রাউন সুইস পালন
করা না হলেও ব্রাউন সুইসের সাথে দেশী গরুর মিলন ঘটিয়ে সংকর উত্পন্ন করা হচ্ছে৷ |
|

|
গাই নির্বাচন |
ভাল দুধেলা গাই - যে গাই দিনে কম করে ৬ - ৭ কেজি দুধ দেবে তাকে আমরা
দুধেলা গাই বলে গণ্য করব৷ ২ - ৩ কেজি দুধ দেওয়া গাই পুষে অর্থনৈতিক দিক
থেকে লাভবান হওয়া যায় না৷ তাই
কোন গাই ঠিক কতটা দুধ দেবে তা মোটা মুটি চারটি নীতির উপর ভিত্তি করে নির্বাচন
সম্ভব৷ |
জাত - জাত দেখে গরু নির্বাচন করাই ভাল৷
যেমন সাইওয়াল, সিন্ধ্রি এবং বিদেশীদের বেলায় জার্সি, হলস্টাইন ও ফ্রেসিয়ান
ইত্যাদি৷ |
|
বংশ পঞ্জি - গাভীটির বংশপঞ্জিও দেখতে হবে৷ দেখতে
হবে তার মা কতটা দুধ দিত বা তার বাবার বংশের গাইটাই বা কতটা দুধ দিত ইত্যাদি৷ |
|
দুধ দেওয়ার ক্ষমতার নথিপত্র - আগের বার বাচ্চা দেওয়ার পর পরবর্তী বাচ্চা
দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে মোট কতটা দুধ দিয়েছিল ইত্যাদি৷ |
|
বাহ্যিক রূপ - জাত, বংশপঞ্জি বা নথিপত্র অনুসারে নির্বাচন করা গেলেও
বাহ্যিক রূপের গুরুত্ব অপরিসীম৷ |
|

|
প্রকৃত দুধেলা গরুর বৈশিষ্ট্য |
-
গলা - লম্বা ও সরু এবং কাঁধ ও বক্ষস্থলের সাথে ভাল ভাবে
মিশেছে৷
-
কুঁজ - সুস্পষ্ট ও গোঁজের মত৷
-
পাঁজর - দুটো পাঁজরের মধ্যবর্তী যায়গা সুস্পষ্ট৷
অর্থাত বাইরের থেকেই
পাঁজরের হাড় গোনা যাবে৷ পাঁজরগুলি লম্বা ও চ্যাপ্টা
প্রকৃতির হবে৷
-
উরু - চ্যাপ্টা ও ভিতরের দিকে বাঁকানো যাতে বিরাট পালান ধরে
রাখতে পারে৷
-
চামড়া - আলগা ও নরম, সুক্ষ্ম ও সুন্দর লোমে ঢাকা থাকবে৷
-
পালানের গঠন - পালান হবে লম্বা ও চওড়ায় বড়৷
মনে রাখতে হবে দুধ
দোওয়ার পর যেন পালান একে বারে চুপসে যায়৷
পেটের সাথে পালান যেন ভাল ভাবে
আটকে থাকে৷ পালানের পিছন দিকটা অনেকটা উচু থেকে ঝুলবে৷
পালানের চারটি
প্রকোষ্ঠই সমান মাপের হওয়া চাই হাতে ধরে দেখলে পালান হবে নরম তুলতুলে এবং
স্থিতিস্থাপকতা হবে অনেক বেশী৷
বাঁটগুলি সমান মাপে এবং সমান দুরত্বে
অবস্থিত থাকবে৷ পালানশিরা হবে লম্বাটে আকাবাঁকা সুস্পষ্ট শাখাপ্রশাখা যুক্ত
ও মোটা৷
|
|

|
প্রজনন |
সঠিক উত্তেজনা কাল নির্ণয় ও গরু গরম হওয়ার লক্ষণ |
প্রজননের ক্ষেত্রে সঠিক উত্তেজনা কাল নির্ণয় খুবই জরুরী৷ সাধারণতঃ শতকরা
৫০ ভাগ গাভীন হওয়া নির্ভর করে সঠিক উত্তেজনা কাল নির্ণয়ের উপর৷ |
গরম হওয়ার লক্ষণ - গরম বা উত্তেজনা কালের প্রথম দশায় লক্ষণগুলি সুস্পষ্ট
নয়৷ কিন্তু ঐ সময় গাইগরুটি অন্য গরুকে চাটতে চাইবে, ডাকবে ও অন্য গরুর উপর
উঠতে চাইবে৷ গরুটি তখন একটু চনমনে থাকবে৷ যোনিদ্বার ভিজে এবং ফুলে উঠবে৷ এর ৬
- ৭ ঘন্টা পর গরমের লক্ষণগুলি ব্যাপক ভাবে প্রকাশ পায়৷ যতক্ষণ অন্যগরু বা
ষাঁড় গরুটির গায়ে চাপছে ততক্ষণ গরুটি স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে৷ এই সময়টাকে
বলে দন্ডায়মান উত্তেজনাকাল৷ এর মেয়াদ সাধারণতঃ ১৪ - ১৬ ঘন্টা৷ এই সময় গাভীটি
চঞ্চল অবস্থায় থাকবে৷ জোরে জোরে ডাকবে,
ঠিকমত খাবে না৷ শরীরের পেছনের অংশটি
সংকুচিত করবে৷ দুধ কম দেবে৷
যোনিদ্বার থেকে স্বচ্ছ নালসানি বেরুতে থাকবে৷ |
|
|
সংকর জাতের গাভী কিভাবে পাবেন ও কৃত্রিম প্রজনন কেন |
কৃত্রিম গো প্রজনন কথাটির অর্থ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নতমানের নীরোগ ও
সবল ষাঁড়ের প্রচুর জীবিত শুক্রাণু সমেত বীর্য সংগ্রহ করে অধিকতর পরিমাণে
বর্ধিত করে এক বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সঠিক পদ্ধতিতে গাভীর জননেন্দ্রীয় এর
মধ্যে প্রয়োগ করা৷ |
স্বাভাবিক প্রজননের তুলনায় কৃত্রিম প্রজননের সুবিধা |
-
উন্নত জাতের বাচ্চা পাওয়া যায়৷ -
বিভিন্ন যৌন রোগ প্রতিরোধ করা যায়৷
-
ষাঁড় পালনের প্রয়োজন হয় না৷
-
খরচ কম৷
-
উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ বহুদিন পরেও ব্যবহার করা যায়৷
-
গাভীকে ষাঁড়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন হয় না৷
-
বহুদূর থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও ষাঁড়ের বীজ আনা যায়৷
-
এই পদ্ধতিতে উত্পন্ন বকনা ১৮ মাস বয়সেই প্রজননের উপযুক্ত হয়৷
-
সংকর জাতের গাভী প্রতি বছর বাচ্চা দেয়৷
-
সংকর জাতের বলদ হালের উপযুক্ত নয় - এ ধারণা ঠিক নয়৷
-
এই পদ্ধতিতে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রজনন কর্মসূচি নেওয়া যায়৷
|
হিমায়িত গোবীজ |
শীতল অবস্থায় যেকোন বীজ কোষকে তার বিপাকীয় কাজ কিছুটা কমিয়ে বেশ কিছু
দিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখা যায়৷ যেমন তরল গোবীজের জীবনশক্তি ২ - ৩ দিন পর্যন্ত
অটুট রাখার জন্য ৪ - ৫ ডিগ্রি সেঃ তাপমাত্রা ব্যবহার
করা হয়৷ কিন্তু ঐ বীজকোষকে যদি হিমশীতল অবস্থায় রাখা যায়,
তবে তাকে দীর্ঘদিন অবিকৃত ভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়৷ |
হিমায়িত গোবীজ ব্যবহারের বিশেষ সুবিধা |
-
কোন ষাঁড়ের মৃত্যু হলে বা অন্য কোথাও দূরবর্তী স্থানে স্থানান্তরিত
করলে ঐ ষাঁড়ের হিমায়িত বীর্য অনেক বছর ধরে সংরক্ষিত করা যায়৷
-
একটা ভাল জাতের ষাঁড়ের বীজ হিমায়িত করলে কোনও অপচয় হয় না৷
-
কৃষক, খামারী, গোপালকেরা যে কোন সময়ে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী হিমায়িত
গোবীজ পেতে পারেন৷
-
নির্দিষ্ট গরুকে নির্দিষ্ট বীজ দিয়ে সংকরায়ন করা হিমায়িতগোবীজ দ্বারাই
সম্ভব৷
-
প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের সুবিধা অনুযায়ী হিমায়িত গোবীজ মাসে একবার প্রেরণ
করলেই চলে৷ কিন্তু তরল গোবীজ রোজ অথবা একদিন অন্তর
প্রেরণ করতে হবে৷
-
একদেশের ভালজাতের হিমায়িত গোবীজ অন্য দেশে বহন করে নিয়ে ব্যবহার করা
যেতে পারে৷
-
সন্তানের ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য হিমায়িত গোবীজের ব্যবহার খুব হয়৷
-
তরলবীজ সংরক্ষণের জন্য বরফ অথবা রেফ্রিজরেটরের প্রয়োজন৷ কিন্তু
গ্রামাঞ্চলে সবসময় বরফ পাওয়া যায় না, আবার রেফ্রিজরেটরের থেকে বরফ পেতে
গেলে বিদ্যুতের উপর নির্ভর করতে হয়৷
এইসব অসুবিধা এড়ানোর জন্য হিমায়িত গোবীজের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী৷
-
পরিবহনের সময় রাস্তায় ঝাঁকুনিতে তরল গোবীজের গুণগত মান কমে যায়৷
হিমায়িত গোবীজের ক্ষেত্রে এসব সমস্যার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷
-
গোবীজের চাহিদা রোজ মেটানে সম্ভব৷
-
হিমায়িত বীজদ্বারা একটি ভাল জাতের ষাঁড় থেকে বছরে কমপক্ষে ১৫,০০০
গরুকে প্রজনন করানো যায়৷ তরল গোবীজের সংখ্যা
এক্ষেত্রে ১,০০০ গরু৷
-
হিমায়িত গোবীজের প্রয়োগ পদ্ধতি দ্বারা গাইগরুর প্রজনন ঘটিত রোগগুলি
অনেকাংশে এড়ানো যায়৷
-
হিমায়িত গোবীজের উত্পাদনের জন্য একটি বিরাট উত্পাদন কেন্দ্র দরকার৷
উত্পাদন সঠিক মাত্রায় হলে সারা রাজ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব৷
বহুসংখ্যক কেন্দ্র ছাড়া তরল গোবীজ উত্পন্ন করা সম্ভব নয়৷
-
একটি ভাল জাতের ষাঁড়ের বংশধরের বৈশিষ্ট্য জানতে হিমায়িত গোবীজের
ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয়৷
-
হিমায়িত গোবীজ খুব সহজেই দূর দূরান্ত গ্রামে প্রেরণ করা যায়৷
|
|

|
সংকর জাত |
সংকর বকনা পেতে হলে কিভাবে দেশী গরুর প্রজনন করানো যায় |
গাই গরুটি কখন গরম হলো ডাকলো সেদিকে নজর রাখতে হবে৷ গরু গরম হলে নিচের
লক্ষণগুলি নজর রাখতে হবে৷ |
-
হঠাত ক্ষিদেটা কমে যাবে৷ -
হঠাত দুধ কমে যাবে৷
-
গরু চঞ্চল হয়ে উঠবে৷
-
অনবরত অকারণবশত ডাকাডাকি করবে৷
-
অন্য গরু পেলে তার উপর চড়ে বসার চেষ্টা করবে৷
-
প্রস্রাবের দ্বার ফোলে ও স্বচ্ছ কাঁচের মতো ন্যালসানি ভাঙবে৷
-
মাঝেমাঝে পাতলা পায়খানা হয়৷
অনেক গরু গরম হলেও ডাকাডাকি করে না বা চঞ্চল হয় না৷
ন্যালসানি ভাঙতে থাকে৷ তখন বোঝা যায় গরুটি গরম হয়েছে৷
|
প্রজনন করার ব্যাপারে কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় |
-
গরুর যখন গরম হওয়ার লক্ষণ দেখা যাবে তখন থেকে ১২ ঘন্টা পর গরুটিকে বীজ
দেবেন৷ অর্থাত গরু সকালে ডাকলে (গরম হলে) বিকালে এবং বিকালে গরম হলে তার
পরদিন সকালে প্রজনন করলে ভাল হয়৷ এরজন্য নিকটস্থ
গো-প্রজনন কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখা দরকার৷
-
প্রজননের জন্য উন্নত জাতের যেমন হলস্টিন বা জার্সি জাতের ষাঁড়ের বীজ
ব্যবহার করা দরকার৷ এই বীজ নিকটস্থ সরকারী গো-
প্রজনন কেন্দ্রে পাওয়া যায়৷
-
প্রথম প্রজনন করার ৮ থেকে ১২ ঘন্টা পর দ্বিতীয় প্রজনন করলে গাভীন হওয়ার
সম্ভাবনা বেশী থাকে৷
-
গরুটি ১৮ থেকে ২৪ দিনের মাথায় আবার গরম হল কিনা লক্ষ্য রাখতে হবে৷ যদি
গরম হয় তাহলে আবার প্রজনন করা দরকার৷ এইভাবে
দু-তিনবার পুনরায় গরম হলে বুঝতে হবে গরুটি কোন স্ত্রীরোগে ভুগছে অথবা বীজের
যথাযথ গুণ নষ্ট হয়েছে৷
-
প্রজনন করার পর গরু আর গরম না হলে বুঝতে হবে গরুটি গাভীন হয়েছে৷
দুই থেকে আড়াই মাস পর গরুটি গাভীন হয়েছে কিনা
পশুচিকিত্সককে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে৷ |
|
|
গরুর বাসস্থান |
বাড়ীর লাগোয়া জমিতে গাছের ছায়ায় দুএকটা গরুকে বেঁধে পোষা যায়৷
কিন্তু
অনেক সংখ্যক গরু পোষা খুবই কষ্ট-সাধ্য৷ ঝড়, বৃষ্টি,
খুব গরম বা ঠান্ডা থেকে এদের রক্ষা করতে গেলে একটা বাসস্থানের প্রয়োজন৷ |
বিভিন্ন প্রকার বাসস্থান- প্রধানত দুইপ্রকার
বাসস্থানে গরুবাছুর পালন করা যায়৷ |
-
প্রচলিত গোয়াল ঘর৷ -
মুক্ত গোয়াল ঘর৷
-
আর একভাবে পালন করা যায় যা হল পুরোপুরি ছেড়ে পোষা৷
|
|
প্রচলিত গোয়াল ঘর - এখানে উচু শক্ত জায়গায় গরুকে দড়িদিয়ে বেঁধে রাখা হয়৷
ঐ গোয়াল ঘরেই গরুকে খেতে দেওয়া হয়৷ দুধ দোয়ানো হয়৷ ঐ গোয়াল ঘরে ছাদ, দরজা
জানলা চারিদিকে দেওয়াল সবই থাকবে৷ এই অবস্থায় পালন
করলে গরুকে প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা করা যায়৷
মুক্ত গোয়াল ঘর - এখানে একটি মুক্ত বিচরণ ভূমি খাকবে৷ যেখানে গরু বাছুরকে
সারা দিন রাত ছেড়ে রাখা হবে৷ শুধু দুধ দোয়ানোর সময় এদের বেঁধে রাখা হবে৷
বিচরণ ভূমির একপাশে একটি ছোট চালা ঘর থাকবে যেখানে খুব ঠান্ডা, গরম বা
বৃষ্টির বা ঝড়ের সময় আশ্রয় পাবে৷ একই জলের পাত্র থেকে
ও খাবারের পাত্র থেকে সবুজ ঘাস বা অন্যান্য খাবার সবাই খাবে৷ |
বিভিন্ন বয়সের প্রত্যেক গরুর দাঁড়াবার বা বসার জন্য
জমির মাপ |
বয়স |
বদ্ধ জায়গায়
( বঃ মিঃ ) |
ছেড়ে পুষলে ( বঃ মিঃ ) |
তিন মাস বয়স পর্যন্ত বাছুর |
১ |
১ - ১.৫ |
চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বাছুর |
১ - ২ |
২ - ২.৫ |
ছয় মাসের বেশী বয়সের বাছুর |
২ |
৩.৫ - ৪ |
বড় গাই |
৩.৫ |
৭ | |
গাভীর প্রসব ঘর - বাচ্চা দেওয়ার ২ - ৩ সপ্তাহ আগে গাভীন গরুকে প্রসব
ঘরে আনা হয়৷ আবদ্ধ জায়গায় প্রসব ঘরের মাপ দৈর্ঘ্যে ৪
মিটার ও প্রস্থে মিটার ৷ মুক্ত অবস্থায় পুষলে প্রসব ঘরের মাপ দৈর্ঘ্যে ৫
মিটার ও চওড়ায় ৪ মিটার৷ |
|

|
গাভীন গরুর পরিচর্যা |
গাভীন গরুর পরিচর্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ প্রথম তিনমাস ও শেষের তিন মাস
গাভীন অবস্থায় গরুর যত্ন নিতে হবে৷ প্রথম তিন মাস গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা
থাকে৷ শেষের তিন মাস বাড়ন্ত বাচ্চার জন্য মাকে সঠিক মাত্রায় সুষম খাবার দিতে
হবে৷ কিছু সাবধাণতা মেনে চলা উচিত৷ |
-
অনেক দূর পর্যন্ত গাভীন গরুকে হাঁটানো চলবে না৷
এতে গরুটি ক্লান্ত হয়ে যাবে৷
-
গোয়াল ঘরের মেঝে পিচ্ছিল হবে না, এতে গরু পড়ে গিয়ে হাড় সরে যেতে পারে
হাড় ভাঙ্গতে পারে, গর্ভপাত হতে পারে৷
-
পর্যাপ্ত পরিমানে বিশুদ্ধ পানীয় জল দিতে হবে এবং ঝড়, বৃষ্টি, রোদ ও
অত্যধিক ঠান্ডা থেকে গাভীন গরুকে বাঁচাতে হবে৷
-
ছয়মাস গর্ভাবস্থা পর্যন্ত দেশী গরুর নিজের জন্য দিনে ১.৫ কেজি এবং
প্রতি কেজি দুধের জন্য ৫০০ গ্রাম সুষম খাদ্য দিতে হবে৷ ৭/৮ মাসের গাভীনকে
পুষ্টির জন্য দৈনিক আরও ১.৫ কেজি সুষম খাদ্য দিতে হবে এর সঙ্গে যথেষ্ট
পরিমাণ কাঁচা ঘাসও দেওয়া উচিত৷ এ সময় দৈনিক ১০ থেকে
১৫ গ্রাম করে খনিজ লবণ (মিনারেল মিকশ্চার) খাওয়ালে ভাল হয়৷
-
দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি সবুজ ঘাস খাওয়ালে যথেষ্ট উপকার হয়৷ সব সময় সবুজ
পাওয়া যায় না৷ সেজন্য প্রতি ৫ কেজি সবুজ ঘাসের বদলে ১ কেজি বিচালি বা খড়
দেওয়া যেতে পারে৷ যেহেতু বিচালিতে ভিটামিন-এ নেই সেইহেতু ভিটামিন এডি-৩
পাউডার প্রতি টনে ২০০ গ্রাম হারে খইলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে৷
গাভীন গরুকে ২/৩ মাস অন্তর কৃমি নাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে৷
|
গাভীন অবস্থায় জোর করে দুধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা |
গরু গাভীন হলে অন্ততপক্ষে বাচ্চা দেওয়ার ৪৫ - ৬০ দিন আগে দুধ দোয়ানো
বন্ধ রাখতে হবে৷ অর্থাত ২ মাস শুকনো রাখতে হবে৷ |
দুধ বন্ধ করার নিয়ম / ড্রাই করার নিয়ম -
সাধারণত তিনটি উপায়ে দুধ বন্ধ করা যায়৷ |
-
ছেড়ে ছেড়ে দোয়ানো - দুবেলা দোহন না করে এক বেলা ছেড়ে ছেড়ে দোহন
করতে হবে৷ এরপর এক দিন অন্তর দোহন করে দোহন বন্ধ করে দিতে হবে৷
-
অসম্পূর্ণ দোহন করা৷ প্রথম কয়দিন অসম্পূর্ণ দোহন
করে দোহন বন্ধ করে দেওয়া হয়৷
-
হঠাত দোহন বন্ধ করা৷ |
|

|
গাভীন গরুর প্রসবকালীন পরিচর্যা |
-
বাচ্চা দেওয়ার ১৫ দিন আগে গাভীন গরুকে প্রসূতি ঘরে নিয়ে যেতে হবে৷ ঘরে
খড়ের নরম বিছানা থাকা চাই৷ -
প্রসবের সময় উপযুক্ত যত্ন না নিলে যে বকনাটি তৈরী হবে তার থেকে বেশী
দুধ নাও পাওয়া যেতে পারে৷
-
প্রসূতি ঘরের মেঝে শুকনো হওয়া দরকার৷
-
প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়াতে হবে৷ শীতের সময় গরম জল খেতে দিতে হবে৷
-
প্রসব হতে কষ্ট হলে বেশী দেরী না করে পশুচিকিত্সকের সাহায্য নিতে হবে৷
-
প্রসবের পর বাছুরের নাড়ী কাটতে হবে৷ শক্ত সূতো, কাঁচি, গরম জলে ফুটিয়ে
জীবাণুমুক্ত করতে হবে৷ দেড় ইঞ্চিমত নাড়ী রেখে বাকীটা কাঁচি দিয়ে কেটে বাদ
দিতে হবে৷ কাটা জায়গায় তুলো দিয়ে টিনচার আয়োডিন
ভালভাবে লাগিয়ে দিতে হবে৷
-
বাছুর হওয়ার পর মাকে জিভ দিয়ে চাটতে দিতে হবে, এতে বাছুরের শরীরে রক্ত
চলাচলের সুবিধা হবে৷ বাছুর তাড়াতাড়ি সজীব হয়ে উঠবে৷
একটি পরিস্কার পুরানো কাপড়ের লম্বা ফালি ২/৩ ভাঁজ করে নাভিটিকে ঢেকে পিঠের
উপর বেধে দিতে হবে৷
-
সাধারণতঃ বাছুর হওয়ার ৬ - ৮ ঘন্টার মধ্যে ফুল পড়ে যায়৷ ফুল পড়ে গেলে
গরু যেন সেটা খেয়ে না ফেলে৷ ফুল না পড়লে
পশুচিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া ভাল৷
-
মাঝারি এক বালতি অল্প গরম জলে আঙ্গুলের দুই তিন টিপ পটাশিয়াম
পারম্যাঙ্গানেট অথবা একটি সলিউশন মিশিয়ে গরুর পালান ও পিছনের দিকটা ভাল করে
ধুয়ে দিতে হবে৷
-
বাছুর হওয়ার পর গোয়ালঘর পরিস্কার করতে হবে৷ ফিনাইল দিয়ে পরিস্কার করলে
ভাল৷
|
|

|
প্রসবের পর গরুর পরিচর্যা |
প্রসবের পর পিপাসা লাগতেই ঊষ্ণ গরম জল খেতে দিতে হবে৷ পরের তিনদিন বাচ্চা
দেওয়ার আগে যে সুষম খাবার দেওয়া হচ্ছিল সেই খাবারই খাবে৷ খোল চুনি ভূষি সবই
জলের সাথে মিশিয়ে ভিজিয়ে খাওয়াতে হবে৷ সঙ্গে এক চিমটি নুন মেশাতে হবে৷ চতুর্থ
দিন থেকে স্বাভাবিক দুধের উত্পাদনের হিসাব মত সুষম খাদ্য দিতে হবে৷
ক্ষিদে বাড়লে দানা জাতীয় খাবারের পরিমাণও বাড়াতে হবে৷
|
|

|
দুধেল গরুর প্রতিদিনের খাবার |
প্রতি ২ লিটার দুধের জন্য ১ কেজি সুষম খাদ্য দিতে হবে৷ |
এছাড়া শরীর ও স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ২ কেজি সুষম খাদ্য দিতে হবে৷ |
|
খাবারের পরিমাণ |
দৈনিক দুধের পরিমাণ (লিটার) |
দৈনিক সুষম গো খাদ্যের পরিমাণ (কেজি) |
দৈনিক সবুজ ঘাসের পরিমাণ (কেজি) |
৬ |
৫ |
১৫ - ২০ |
১০ |
৭ |
২০ - ২২ |
১৬ |
১০ |
২২ - ২৫ |
২০ |
১২ |
২৫ - ৩০ | |
প্রতিদিন দুবার দুধ দোয়াতে হবে৷ দুধ দোয়ানোর আগে সুষম খাবার খেতে দিতে
হবে৷ এতে গরু তাড়াতাড়ি দুধ ছাড়ে৷ |
|
|
দুধ পানানো ও দোয়ানো ব্যাপারে কয়েকটি জ্ঞাতব্য
বিষয় |
-
যে জায়গায় দুধ দোয়ানো হবে সেই জায়গাটা পরিস্কার থাকা চাই৷ সেখানে কোন
বাজে গন্ধ থাকবে না৷ দুধের পাত্র সবসময় পরিস্কার রাখা চাই৷
যে গরু দোহন করবে তার হাত সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে৷ -
দোহন করার আগে জল দিয়ে বাটগুলি ও বানগুলি ভালভাবে পরিস্কার করে শুকিয়ে
নিতে হবে৷
-
দুধ দোয়ানোর আগে চারটে বাট থেকে অল্প অল্প করে দুধ স্ট্রিপ কাপে টেনে
পরীক্ষা করতে হবে, দুধটা ছানা কেটে বা জল হয়ে যাচ্ছে কিনা নজর রাখতে হবে৷
-
সাধারণতঃ গাইগরুর বাঁ পাশে বসে দুধ দোহন করতে হয়৷
-
বাঁট ধরার আগে দুধ বা জল দিয়ে হাতদুটি ভালভাবে ভিজিয়ে নিতে হবে৷
-
সাধারণতঃ দিনে দুবার সকাল ও সন্ধ্যায় দুধ দোহন করা উচিত৷ বেশী দুধের
গরু হলে দিনে তিনবার দোহন করা উচিত৷
-
শীতকালে বাট শুষ্ক হয়ে যায়৷ বাটের চামড়ায় ফাটল ধরে৷
সেই সময় বাটে ভেসলিন জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করতে হবে৷
-
দোহন করার সময় গরুকে কখনই ভয় দেখানো চলবে না৷
এতে গরু কম পানাবে ও কম দুধ দেবে৷
|
|

|
সংকর বাছুর প্রতিপালন পদ্ধতি |
ভাল সংকর গরু তৈরী করতে ছোটবেলা থেকে সংকর বাছুরের উপযুক্ত যত্ন পরিচর্যা
পুষ্টিকর খাবারের যোগান ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা করতে হবে না হলে উন্নত জাতের
সংকর বাছুরগুলি অধিক দুধ দেওয়ার বা পরিশ্রম করার মত জন্মগত ক্ষমতা হারিয়ে
ফেলবে এবং সহজেই রোগাক্রান্ত হবে৷ দেখা যাচ্ছে শতকরা ২৫ থেকে ৩৩ ভাগ বাছুরের
মৃত্যু হয় জন্মের চারমাসের মধ্যেই৷ বাছুরের এই মৃত্যু
অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপুষ্টিজনিত, নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা ও নাভীর ঘা জনিত৷ |
মনে রাখতে হবে যে, বাছুরের যত্ন ও পরিচর্যা শুরু হয় জন্মের পূর্ব থেকেই৷
তাই গর্ভাবস্থায় গরুর যত্ন খুব প্রয়োজন৷ এই জন্য ৬ মাস
গর্ভকাল থেকে গরুটির প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্যের যোগান দিতে হবে৷ |
|

|
সদ্যজাত বাছুরের যত্ন |
সংকর বাছুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম ১৫ - ২০ দিন গুরুত্বপূর্ণ সময়৷
ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যেগুলি লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন- |
-
গাই গরু বাচ্চা দেওয়ার সময় কেউ সামনে থাকা দরকার৷ অনেক সময় বাচ্চা
মাতৃজঠরে ঠিক জায়গায় অবস্থান করে না৷ তাতে বাচ্চা প্রসব করতে দেরি হয়৷
বাচ্চা প্রসব পথে আটকে যেতে পারে৷ এতে বাচ্চা মারা যেতে পারে৷
সেইজন্য প্রসবের সময় কেউ সামনে থাকা দরকার৷
-
বাছুরের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই বাছুরের নাক, মুখ শুকনো কাপড় দিয়ে বা
পরিস্কার চট দিয়ে পরিস্কার করতে হবে৷ এতে বাছুর স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস
নিতে পারে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাইগরু নিজেই জিভ দিয়ে
চেটে এ কাজটা সম্পন্ন করে৷
-
জন্মাবার পর বাছুরের নাক মুখ থেকে শ্লেষ্মা পরিস্কার করার পর দেখতে হবে
বাছুরটি শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া শুরু করছে কিনা৷ শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া না
শুরু হলে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস চালু করা দরকার৷ এটা দুভাবে করা যায়৷ যেমন -
(ক) বুকের দুপাশে বিচালি দিয়ে ভাল করে মালিশ করা দরকার হয়৷
(খ) পিছনের দুটি পা ধরে বাছুরটিকে শূন্যে ঝুলিয়ে মাথা বাঁকিয়ে জিভ টেনে বের
করে দেওয়া৷
-
গাইগরুটিকে জিভদিয়ে বাছুরকে চাটতে দিতে হবে৷
তাতে বাছুরের রক্ত চলাচল বা সঞ্চালন কাজও ত্বরান্বিত হবে৷
-
বাছুরটিকে শুকনো জায়গায় বিচালি বিছিয়ে শুইয়ে রাখতে হবে৷ কোন মতেই
স্যাঁত স্যাঁতে জায়গায় রাখা চলবে না৷ এতে বাছুরের
ঠান্ডা লাগতে পারে৷
-
সবল বাছুর ১/২ থেকে ১ ঘন্টার মধ্যে উঠে দাঁড়াবে৷
উঠে দাঁড়তে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে পশুচিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে৷
-
বাছুরের নাভীর নাড়ী ২ ইঞ্চির বেশী লম্বা থাকলে নতুন ব্লেড দিয়ে কেটে
টিংচার আয়োডিন লাগিয়ে দিতে হবে৷ রক্তপাত রোধ করার জন্য নাড়ীর গোড়ার দিকে
নাইলন সূতো দিয়ে বেঁধে দিতে হবে৷ পরপর ৫ দিন নাড়ীতে
টিংচার আয়োডিন লাগাতে হবে৷
-
জন্মানোর ১ থেকে ২ ঘন্টার মধ্যে বাছুরকে অবশ্যই গাজলা দুধ খাওয়াতে হবে৷
জন্মের পর প্রথম ২৪ ঘন্টায় বাছুরটি গাজলা দুধ না পেলে তার রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা কমে যায়৷ প্রতিদিন বাছুরের দেহের ওজনের ১/১০ ভাগ পরিমাণ দুধ দিতে
হবে৷ এই পরিমাণ দুধ বারে বারে খাওয়াতে হবে৷ গাজলা দুধ কোন কারণে পাওয়া না
গেলে নিম্নলিখিত দুইটি পৃথক দ্রবণ দিনে তিনবার করে সদ্যোজাত বাছুরকে
খাওয়াতে হবে৷ (ক) ১/৩ লিটার জলে ১ টি ডিম ভালভাবে মেশাতে হবে৷
(খ) ২/৩ লিটার জলে ১/২ চামচ ক্যাষ্টার অয়েল মেশাতে হবে৷ |
|

|
সংকর বাছুরের খাবার |
তিন মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরের খাবার অধিক প্রোটিন যুক্ত হওয়া চাই৷ দ্বিতীয়
সপ্তাহ থেকে বাছুরকে দুধের বিকল্প খাবার হিসাবে শুকনো সুষম খাবার দিতে হয়৷
সুষম খাবারের নমুনা -
প্রথম ফর্মূলা |
দ্বিতীয় ফর্মূলা |
হলুদ ভূট্টার গুড়ো
৩০
ভাগ |
হলুদ ভূট্টার গুড়ো
৫০ ভাগ |
বাদাম খইল
৩০
ভাগ |
তিল / তিসি / বাদাম খইল
৩০
ভাগ |
ছোলার গুড়ো
২০
ভাগ |
গমের ভূষি
১২
ভাগ |
গমের ভূষি
১৭
ভাগ |
চিটা গুড়
৫ ভাগ |
খনিজ লবণ
২ ভাগ |
খনিজ লবণ
২ ভাগ |
খাদ্য লবণ
১ ভাগ |
খাদ্য লব
১ ভাগ |
মোট - ১০০ ভাগ |
মোট - ১০০
ভাগ | |
|
তিন মাস বয়স পর্যন্ত সংকর বাছুরের দৈনিক খাদ্য তালিকা |
-
প্রথম ৭ দিন - বাছুর জন্মানোর পর থেকে প্রথম সাতদিন বাছুরের ওজনের ১/১০
গাজলা দুধ খাওয়াতে হবে৷ অর্থাত প্রায় ২ কেজির মত
গাজলা দুধ খাওয়াতে হবে৷
-
৮ থেকে ১৪ দিন - দৈনিক মোট আড়াই কেজি দুধ ভাগে ভাগে খাওয়াতে হবে৷
সুষম খাবার ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম ও সবুজ ঘাস ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম খাওয়ানো
অভ্যাস করতে হবে৷
-
১৫ থেকে ২১ দিন - দৈনিক মোট ২ কেজি ৭৫০ গ্রামের মত দুধ খাওয়াতে হবে৷
সুষম খাবার ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম ও সবুজ ঘাস ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামের মত খাওয়াতে
হবে৷
-
২২ থেকে ২৮ দিন - ২ কেজি ৫০০ গ্রাম দুধ, ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম সুষম খাবার
ও ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম সবুজ ঘাস দৈনিক দিতে হবে৷
-
২৯ থেকে ৩৫ দিন - সারাদিনে ২ কেজি দুধ, ৩৫০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম দুধের
বিকল্প খাবার (সুষম খাবার) ও ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম সবুজ ঘাস খাওয়াতে হবে৷
-
৩৬ থেকে ৪২ দিন - দেড় কেজি দুধ, ৫৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম দুধের বিকল্প
খাবার ও ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সবুজ ঘাস সারাদিনে ভাগ করে খাওয়াতে হবে৷
-
৪৩ থেকে ৪৯ দিন - সারাদিনে ১ কেজি দুধ, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম দুধের
বিকল্প খাবার ও ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সবুজ ঘাস ভাগ করে খাওয়াতে হবে৷
-
৫০ থেকে ৫৬ দিন - সারাদিনে ৫০০ গ্রাম দুধ, ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি দুধের
বিকল্প খাবার (সুষম খাবার) ও ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি সবুজ ঘাস দেওয়া উচিত৷
-
৫৭ থেকে ৬৩ দিন - সারাদিনে ২৫০ গ্রাম দুধ, ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ২০০
গ্রাম সুষম খাদ্য ও ১ কেজি থেকে ১ কেজি ২০০ গ্রাম পর্যন্ত সবুজ ঘাস দিতে
হবে৷
-
৬৪ থেকে ৭০ দিন - শুধু সুষম খাবার দিলেই চলবে৷
সুষম খাবার ৮৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ও সবুজ ঘাস ১ কেজি ২০০ গ্রাম
থেকে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম সারাদিনে দিতে হবে৷
-
৭১ থেকে ৮৪ দিন - সুষম খাবার ১ কেজি থেকে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম ও সবুজ ঘাস
১ কেজি ৪০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৬০০ গ্রাম দিতে হবে৷
-
৮৫ থেকে ৯০ দিন - সুষম খাবার ১ কেজি ৪০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৫০০ গ্রাম ও
সবুজ ঘাস ২ কেজি থেকে ২ কেজি ৫০০ গ্রাম রোজ দিতে হবে৷ |
|

|
বাছুরের খাবারের সাথে বিভিন্ন ঔষধ |
-
জন্মের পর অনেক সময় বাছুর নিউমোনিয়া, স্কাওয়ার ইত্যাদি নানা রোগে
আক্রান্ত হয়৷ এই সমস্ত রোগ থেকে রক্ষা করতে হলে
বাছুরকে জন্মাবার পরই পাঁচ গ্রাম থেকে ১০ গ্রাম অরিওমাইসিন, টেরামাইসিন জলে
গুলে খাওয়াতে হবে৷
-
ভিটামিন AD3 - ২ গ্রাম করে প্রতিদিন খাওয়াতে হবে৷
-
বাছুর জন্মাবার ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে পাইপেরাজিন ঔষধ ৫ গ্রাম জলে গুলে
খাওয়াতে হবে৷ এই ঔষধ তিনমাস অবধি চলবে৷
দ্বিতীয় মাসে ৮ থেকে ১০ গ্রাম ও তৃতীয় মাসে ১০ থেকে ১২ গ্রাম খাওয়াতে হবে৷
|
|

|
গরুর খাবার |
সুষম খাদ্য - সুষম খাদ্য বলতে বোঝায় এমন একটি খাদ্য যার থেকে গরু তার
শরীর স্বাস্থ্য ভাল রাখতে, উত্পাদন ঠিক রাখতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায়
রাখতে যে সব উপাদান দরকার তার সকল উপাদান পরিমাণ মত থাকে৷ এই উপাদান
গুলি হল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও জল৷
এছাড়াও যেহেতু গরু বেশী পরিমাণে খায় তাই এদের পেট ভরতেও প্রচুর পরিমাণ খাদ্য
দরকার হয়৷ পেট ভরাতে সাধারণতঃ রাফেজ জাতীয় খাদ্য
দরকার৷ যেমন ঘাস, বিচালি, সাইলেজ, খড় ইত্যাদি এর থেকে সামান্য পুষ্টিও পায়৷ |
তিন মাস বয়স থেকে গাভীন হওয়া পর্যন্ত খাদ্যের তালিকা |
৩ - ৬ মাস পর্যন্ত - সুষম খাবার ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ১
কেজি ৫০০ গ্রাম, ৫ - ৯ কেজি সবুজ ঘাস প্রতিদিন৷
৬ মাস থেকে ১ বত্সর পর্যন্ত - সবুজ ঘাস ৮ থেকে ১০ কেজি, সুষম খাবার
১.৫ - ২ কেজি প্রতিদিন৷
১ বত্সর থেকে গাভীন পর্যন্ত - সুষম খাবার ২ - ৩ কেজি,
১০
- ১৫ কেজি সবুজ ঘাস প্রতিদিন৷ |
১০ কেজি সুষম খাবার তৈরী করতে যা যা লাগবে |
-
শস্য জাতীয় - ভুট্টা, গমভাঙ্গা, যব, খুদ চাল - ২.৫
কেজি থেকে ৩.৫ কেজি যেকোন একটি, আবার মিশিয়ে ও দেওয়া যাবে৷
-
খইল জাতীয় - বাদাম, তিসি, সরিষা, তিল - ২.৫ কেজি থেকে ৩.৫ কেজি
যেকোন একটি তবে তিনটি মিশিয়ে দিলেও হবে৷
-
দানা শস্যের উপজাত - ১.৫ - ২.৫ কেজি গমের ভুষি, চালের কুড়ো৷
-
ডাল জাতীয় শস্যের গুড়ো - অড়হর, মুসুর, ছোলা, মটর ৫০০ গ্রাম
থেকে ২ কেজি সবগুলি মিশিয়ে দেওয়াই ভাল৷
-
লবণ ১/৪ কেজি৷
-
খনিজ লবণ বা মিনারেল মিক্সচার ১০০ - ১৫০ গ্রাম৷
-
ভিটামিন এ, ডি, ই ২ - ৩ গ্রাম৷
-
বিভিন্ন ধরনের ভাল জাতের সবুজ ঘাস যেমন হাইব্রিড নেপিয়ার, দীননাথ,
লুসার্ন বারসীম, প্যারা ঘাস, ওটস, জোয়ার ভুট্টা৷ |
গাভীর সুষম খাদ্য |
প্রধানত তিনটি অবস্থায় গাই গরুর খাদ্যের প্রয়োজন হয়৷ (১)শরীর
রক্ষা৷ (২)গর্ভধারণ৷
(৩)দুগ্ধ উত্পাদন৷
শরীর স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য খাদ্য |
|
খড় |
দানা জাতীয় |
দেশী গরুর বেলায় |
৪ কেজি দৈনিক |
১ - ১১/৪ কেজি দৈনিক |
সংকর গরুর বেলায় |
৪ - ৬ কেজি দৈনিক |
২ কেজি দৈনিক |
দুধ দেওয়া কালীন |
দেশী গরুর বেলায় |
৪ কেজি দৈনিক |
১ - ১১/৪ কেজি প্রতি ২১/২ কেজি দুধের জন্য
অতিরিক্ত ১ কেজি দৈনিক |
সংকর গরুর বেলায় |
৪ - ৬ কেজি |
১ কেজি প্রতি ২ কেজি দুধের দুধের জন্য অতিরিক্ত ১ কেজি
দৈনিক |
গর্ভাবস্থা কালীন ( ৫ মাসের পর) |
দেশী গরুর বেলায় |
৪ কেজি দৈনিক |
১ - ১১/৪ কেজি এবং আরও ১১/৪ কেজি
দৈনিক |
সংকর গরুর বেলায় |
৪ - ৬ কেজি |
২ কেজি এবং আরও ১৩/৪ কেজি দৈনিক | |
সুষম খাদ্য তৈরী করার ফর্মূলা |
দানা জাতীয় সুষম খাদ্য তৈরী করতে যে যে উপাদানগুলি লাগবে তা বাজারে যেন
পাওয়া যায়৷ সুতরাং খুব সহজেই বাড়ীতে সুষম খাদ্য তৈরী করে নেওয়া যেতে পারে৷
১০০ কেজি সুষম খাদ্য তৈরী করতে হলে কোন কোন জিনিষ কতটা মেশাতে হবে তার পরিমাণ
দেওয়া হল |
-
ছোট ও বড় জাতের দানার গুড়ো যেমন - ভাঙ্গা ভূট্টা, জোয়ার, গম, যব
ইত্যাদি ২৫ থেকে ৩৫ কেজি৷
-
খৈইল জাতীয় খাদ্য যেমন - বাদাম, তিল, তিষি, সরষে খইল ২৫ থেকে ৩৫
কেজি৷
-
শস্যের উপজাত দ্রব্য যেমন - গমের ভূষি, চালের কুড়ো ইত্যাদি ১০ থেকে ২৫
কেজি৷
-
ডাল জাতীয় শস্যের গুড়ো যেমন - অড়হর, ছোলা, মুসুর, মটর, চুনী ইত্যাদি
৫ থেকে ২০ কেজি৷
-
লবণ- ১ কেজি৷
-
মিনারেল মিক্সচার-
১ কেজি৷
-
ভিটামিন এ ও ডি- ২০ - ৩০ গ্রাম৷ |
|

|
গরুর রোগ ও প্রতিকার |
গরুর রোগ হলে খাওয়ার রুচি না থাকা, কম খাওয়া বা না খাওয়া, চুপচাপ পড়ে
থাকা, দুর্বল হয়ে যাওয়া আবার অনেক সময় শুল বেদনার জন্য ছটফট করা, উত্পাদন কমে
যাওয়া, শরীরের ওজন কমে যাওয়া, লোম খসখসে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি৷ |
মিল্ক ফিভার / ঠুনকো রোগ
এই রোগ সাধারণতঃ বাচ্চা দেওয়ার সপ্তাহের মধ্যে হয়৷ বেশীর ভাগ
ক্ষেত্রে ২ দিনের মধ্যেই হয়৷ বাচ্চা দেওয়ার আগে
খাবারে কম ক্যালসিয়াম থাকলে বা গাই-এর রক্তে কম ক্যালসিয়াম থাকলে এই
রোগ হয়৷ |
|
লক্ষণ |
-
এই রোগ হলে গরুর হঠাত করে দুধ কমে যাবে, কাঁপতে থাকবে,
শরীরে জোর কমে যাবে৷ দাঁড়াতে পারবে না৷ শরীর ঠান্ডা হয়ে যাবে৷
চোখের তারা বড় হয় লালা ঝরে, এমন ভাবে শুয়ে থাকে যে ঘাড়
বেঁকিয়ে মাথা পেটের উপর পড়ে, শ্বাস কষ্ট হয়৷ |
|
প্রতিকার |
-
ক্যালসিয়াম জাতীয় ইনজেকশন যেমন মাইফেক্স, ক্যালরোরোল,
ক্যালমেক্স ইত্যাদি শিরায় দিতে হবে, পরে খাবারে ক্যালসিয়ামের
পরিমাণ বাড়তে হবে৷ |
কিটোসিস
এই রোগ হয় গাই বাচ্চা দেওয়ার ৬ - ৮ সপ্তাহ পরে, বিশেষ
করে যখন খুব বেশী দুধ দেয়৷ এর কারণ হল কম শ্বেতসার জাতীয়
খাদ্য৷ |
লক্ষণ |
-
এই রোগে স্নায়বিক অসুস্থতা দেখা দেবে৷ সাধারণ ভাবে
তাপমাত্রা, নাড়ীর মাত্রার কোন হেরফের হবে না৷ তবে শ্বাস ও
মূত্র থেকে মিষ্টি গন্ধ বেরোবে৷ ম্যাস
জাতীয় খাবার না খেয়ে খড় চিবুবে৷ |
প্রতিকার |
-
গ্লুকোজ জাতীয় ঔষধ শিরায় দিতে হবে৷
যেমন- ডেক্সট্রোজ ২৫ - ৫০ শতাংশ ও রিনটোজ ৫০ শতাংশ
ইত্যাদি৷ | | |
|

|
সংক্রামক রোগ - |
যে রোগ একটা গরু থেকে অন্য গরুতে যেতে পারে বা যার কারণ হল আনুবীক্ষণিক
জীব৷ |
|
আনথ্রাক্স বা তড়কা- এটি ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ৷ এই রোগে সাধারণত কোন
লক্ষণ দেখানোর আগেই গরু মারা যায়৷ মৃত্যুর আগে খুব জ্বর হয়, তখন পড়ে যায় এবং
মৃত্যু৷ মৃত্যুর সময় বা পরে নাক, পায়ু, চোখ, কান দিয়ে রক্ত বের হয় যা জমাট
বাঁধে না৷ এই রোগে মৃত্যু হলে মৃত দেহ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, না হলে চুন দিয়ে
গভীর গর্তে পুতে দিতে হবে৷ চামড়া ছাড়ানো চলবে না৷ যে
স্থানে রক্ত পড়েছে ঐ স্থানটি ভাল করে জীবানু মুক্ত করতে হবে৷ |
চিকিত্সা- সময় পেলে আন্টি আনথ্রাক্স সিরাম ১০০ - ২০০ মিলি শিরায়
দিলে ফল পাওয়া যাবে৷ তাছাড়া পেনিসিলিন ৪০ - ৮০ লাখ শিরায় ৬ ঘন্টা অন্তর দিতে
হবে৷ এর ভাল প্রতিষেধক টীকার ব্যবস্থা আছে৷ |
|
ব্লাক কোয়ার্টার বা বজবজে- এটিও একটি ব্যাকটিরিয়া জনিত অসুখ৷ ২ বত্সর
বয়সের কম বাচ্চাদের এই অসুখ হয়৷ বজবজে হলে খুব জ্বর, খুঁড়িয়ে চলা, পায়ের
মোটা মাংসল অংশ ফুলে যাবে এবং চাপ দিলে বজবজ করে আওয়াজ হবে৷
এর বিষক্রিয়ায় বাচ্চা মারা যায়৷ |
চিকিত্সা- পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে এবং বেশী মাত্রায় টেরামাইসিনও
দেওয়া যায়৷ |
|
ব্রুসেলোসিস- এটি একটি ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ৷ এই রোগ খুব সহজেই সংক্রামিত
হতে পারে৷ এই রোগে ৬ - ৯ মাসের বাচ্চার গর্ভপাত হয়৷ তখন ফুল ঠিক মত বের হয়
না৷ আর কোন ফার্মে এই রোগ হলে বেশীর ভাগ গাইর গর্ভপাত
হবে৷ |
চিকিত্সা- ষ্ট্রেপটোমাইসিন এবং ক্লোরামফেনিকল অনেক দিন ধরে দিলে কাজ হবে৷
তবে সম্পূর্ণ এই রোগের জীবানু ধ্বংস করা খুব কঠিন৷ এই
রোগের ভাল টীকার ব্যবস্থা আছে৷ |
|
হিমেরেজিক সেপটিসেমিয়া ( এইচ এস)- এটি একটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ৷ এটা
বর্ষার প্রথম দিকে হয়৷ রোগ হলে হঠাত খুব জ্বর হবে, গলা
ও জিহ্বা ফুলে যাবে, প্রচন্ড লাল ঝরবে, জিহ্বা বেরিয়ে আসবে, শ্বাসকষ্ট হবে
এবং শ্লেষ্মা বেরোবে ও পাতলা পায়খানা করবে৷ ২ - ৩ দিন এই অবস্থা থাকবে৷
মৃত্যুর হার খুব বেশী৷ |
চিকিত্সা- সালফা মেজাথিন, ডায়াডিন বা ডিমিডিন জাতীয় ঔষধ ১০০ - ২০০ মিলি
(৩৩১/৩ শতাংশ) শিরার মধ্যে, পরবর্তী কালে চামড়ার নীচে৷
হোষ্টাকর্টিন ১০ মিলি চামড়ার তলায়, টেট্রাসাইক্লিন ৪০ - ৬০ মিলি শিরায় দিতে
হবে৷ |
|
ম্যাসটাইটিস- এই রোগ হয় উচ্চ-দুধ উত্পাদন ক্ষম গাভীদের পালানে৷ এই রোগ
যখন বেশী দুধ দেয় তখনই হওয়ার সুযোগ খুব বেশী৷ ঠিকমত চিকিত্সা না করালে
পালানের এক একটি দিক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে৷ রোগ হলে প্রথমে পালান খুব
ফুলে যাবে, অত্যন্ত ব্যাথা হবে যে ছুঁতে পর্যন্ত দেবে না এবং পালান খুব
গরম থাকবে৷ তখন দুধ ছানা কেটে যাবে কখনো শুধু জল মত বেরোবে৷ আবার কখনো রক্তও
বেরোবে৷ এরপর ধীরে ধীরে ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে যাবে৷
তাতে কখনো কখনো কোন বাঁট থেকে দুধ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে৷ |
চিকিত্সা- প্রথম দিকে চিকিত্সা করলে সহজে সেরে যাবে৷ একই সঙ্গে মাংসে বা
শিরায় আন্টিবায়োটিক ইনজেকসন ও বাঁটের মধ্যে মলম ঢুকাতে হবে৷
টেট্রাসাইক্লিন, আরিওমাইসিন, পেনডিষ্ট্রিন ও পেনডিষ্ট্রিন এম.এইচ ইত্যাদি
ব্যবহার করা যেতে পারে৷ |
|
ফুট এন্ড মাউথ ডিসিস- এই ভাইরাস জনিত রোগ গরুর পায়ের খুরে ও জিহ্বা বা
মুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে এর নাম এই রকম৷ এটি একটি মারাত্মক সংক্রামক
রোগ এই রোগে মৃত্যুর হার কম হলেও উত্পাদন ক্ষমতা খুব কমে যায় এবং গাভী বা বলদ
খুব দুর্বল হয়ে পড়ে৷ সাধারণত মুখে ঘায়ের জন্য খেতে পারে না বলে অনেক সময়
মারা যায়৷ এই রোগ হলে জ্বর, পায়ের খুরের মধ্যে ও মুখে
ঘা হয়, ও মুখ থেকে লালা ঝরে৷ |
চিকিত্সা- মুখ পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা ফিটকিরির জল দিয়ে ধুয়ে দিতে
হবে৷ পা পরিষ্কার করে হিমাক্স মলম লাগাতে হবে৷ |
|
গোলকৃমি- বিভিন্ন রকমের হয়৷ কৃমি হলে পাতলা
পায়খানা, বৃদ্ধি ব্যহত, পেট বড় হয়, চামড়া বা লোম খসখসে হয়, দাঁতে খটমট শব্দ
করে ও বেশী আক্রান্ত হলে খিঁচুনি হতে পারে৷ |
চিকিত্সা- পাইপারজিন আন্টিপেট বাচ্চাদের এবং ৮ - ১০ গ্রাম
নিলভার্ম আলবেন্টাডা জোল, প্যানাকুর ইত্যাদি বড়দের জন্য৷ |
|
পেটফোলা- এত পেটে প্রচুর গ্যাস জমা হয়৷ পেটের বাঁদিকের খাঁজ বেলুনের মত
ফুলে ওঠে৷ রুমেনের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়৷ এক জায়গায় ঠিক মত দাঁড়াতে বা শুতে
পারে না৷ এটা হয় বেশী ভাত, বাসি বিভিন্ন ধরনের খাবার
খেলে৷ |
চিকিত্সা- (১) টিমপল ১০০ - ৫০০ মিলি গরম জলে খাওয়াতে হবে৷ (২)
আভিল বা
ফেনাভিল ইনজেকসন দিতে হবে৷ (৩) টেরামাইসিন (তরল) ২০ -
১০০ মিলি খাইয়ে দিতে হবে৷ |
|
পাতলা পায়খানা- হঠাত করে পাতলা পায়খানা শুরু হলে তার কারণ জানার আগে যে
চিকিত্সা করতে হবে৷ |
চিকিত্সা- (১) ডায়ারেক্স ৫টি ট্যাবলেট দিনে দুবার৷ (২) নেবলন ১৫ গ্রাম
দিনে দুবার৷ (৩) সালফাবোলাস/সালফামেজাথিন, ওরিপ্রিম বোলাস ৪ - ৬ টি
দিনে ২ বার দিতে হবে৷ |
|
সংক্রামন রোগের প্রতিষেধক টীকা- |
মনে রাখবেন রোগ সারানোর চেয়ে যাতে না হয় তার জন্য আগে থেকে ব্যবস্থা
নেওয়া একান্ত জরুরী৷ তাই প্রতিষেধক টীকার গুরুত্ব
অপিরিসীম৷ |
|
গরু ও মহিষ |
রোগের নাম |
কোন সময় দেবেন |
টীকা দেবার বয়স |
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা |
রোগের প্রধান লক্ষণ |
এঁসো বা ক্ষুরাই
(ফুট এন্ড মাউথ) |
বর্ষার আগে |
২ মাসে প্রথমবার, ৬ মাসে দ্বিতীয়বার, পরে প্রতি ৬ মাস অন্তর বছরে
দুবার |
১ বছর |
খুব জ্বর, মুখ থেকে লালা পড়া, জিভের উপর, মাড়িতে, ও পায়ের ক্ষুরে
ঘা হলে৷ |
গলাফোলা
(হেমারহেজিক সেপটিসেমিয়া) |
বর্ষার আগে |
৩ মাস বয়সে |
১ বছর |
জ্বর, গলার নীচে ও বুকের সামনে থলথলে ফোলা ও শ্বাসকষ্ট হলে৷ |
বাদলা (ব্ল্যাক কোয়ার্টার) |
বর্ষার আগে |
৪ মাস বয়সে |
১ বছর |
বেশী জ্বর, দাবনায় এবং পেছনের পেশীতে বজবজে ফোলা ব্যাথা হলে৷
২ বছর বয়সের নীচে বেশী হয়৷ |
তড়কা (আনথ্রাক্স ) |
বর্ষার আগে |
৩ মাস বয়সে |
১ বছর |
খুব জ্বর, নাক, মুখ, মলদ্বার দিয়ে রক্ত নির্গত হয়ে হঠাত মারা যায়৷ | |
|
|
|
|

|
১০ টি সংকর গরুর খামার (নমুনা প্রকল্প) |
স্থায়ী খরচ- |
(১) ঘর
বাবদ
৩০,০০০ টাকা |
(২) গরু বাবদ ১৫,০০০ প্রতি
গাভী
১,৫০,০০০ টাকা |
মোট ১,৮০,০০০ টাকা |
আবর্ত খরচ (প্রতি মাসে) |
(১) খাদ্য
(ক) ম্যাস জাতীয় ৬ কেজি প্রতিদিন
৬×১০×৩০ = ১৮০০ কেজি৷
(৬ টাকা
প্রতি
কেজি)
১০,৮০০ টাকা |
(খ) খড় বা সবুজ ঘাস
৬×১০×৩০ = ১৮০০ কেজি৷
(৬ টাকা প্রতি
কেজি)
৩৬,০০০
টাকা প্রতি দিন |
(২) ঔষধ টীকা প্রজনন ইত্যাদি
২০০ টাকা |
২০ টাকা প্রতি
গাভী
মোট ১৪, ৬০০
টাকা |
আয় |
(১) দুধ ৮ টাকা কেজি প্রতিদিন
৮×১০×৩০ = ২৪০০ কেজি৷
(১০ টাকা প্রতি কেজি) ২৪,০০০ টাকা |
(২) গোবর খাবারের ব্যাগ
ইত্যাদি
১,০০০ টাকা |
১০০ টাকা প্রতি গাই মোট
২৫,০০০ টাকা
সুতরাং প্রকৃত আয় =
২৫,০০০ - (১৪,৬০০ + ১,৮০,০০০ এর ১.৫% )
= ৭,৭০০
টাকা প্রতি মাসে৷ |
|

|
এক পলকে গো-পালন |
-
গাভী ১৮ - ২৪ দিন অন্তর (গড়ে ২১ দিন) গরম হয়৷
-
গরম অবস্থা ১২ - ২৪ ঘন্টা (গড়ে ১৮ ঘন্টা) স্থায়ী হয়৷
-
গাভীর সকালে গরমের লক্ষণ দেখা দিলে বিকালে
বা বিকালে গরমের লক্ষণ
দেখা দিলে পরদিন সকালে
কৃত্রিম প্রজনন করা উচিত৷
-
গাভীর গাভীনকাল প্রায় ২৮০ দিন৷
-
স্বাভাবিকভাবে প্রসবের পর গাভীর ফুল ৬ ঘন্টার
মধ্যে বেরিয়ে যায়৷
-
১০ কেজি সবুজ ঘাসের পরিবর্তে ১ কেজি সুষম
বা দানাজাতীয় খাবার
দেওয়া যেতে পারে৷
-
জন্মাবার দুঘন্টার মধ্যে বাছুরকে ৪ দিন বয়স
পর্যন্ত গাঁজলা দুধ
খাওয়াতে হবে বাছুরের শরীরের
ওজনের ১০ ভাগের এক ভাগ
হিসাবে৷
-
পরিণত বয়সের প্রতিটি গরুর জন্য গড়ে ৪০ - ৫০
বর্গফুট আচ্ছাদিত এলাকা
প্রয়োজন৷
-
কয়েকটি উন্নত প্রজাতির গরুর নাম হল -
-
ভারতীয় - সাহিওয়াল, গির, সিন্ধি, হরিয়ানা প্রভৃতি৷
-
বিদেশী - হলষ্টিন-ফ্রেজিয়ান, জার্সি, রেড-ডন প্রভৃতি৷
-
গরুর দুধের উপাদান - (শতকরা)
জল শর্করা প্রোটিন ফ্যাট
এস.এন.
এফ. টোটাল সলিড
৮৭ ৪.৯ ৩.৫৮
৪.১৪
৯.২৫
১৩.১৯
-
হিমায়িত বীজ দ্বারা একটি ভাল ষাঁড় থেকে
বছরে কমপক্ষে ১৫,০০০
গরুকে প্রজনন করা যায়৷
-
গরুর শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১০১.৬ডিগ্রী
ফারেনহাইট, হৃত্স্পন্দন ৬০ - ৮০ বার প্রতি মিনিটে
এবং শ্বাসহার ১৮ -
২৪ বার প্রতি
মিনিটে৷
|
|

|
|
|