রঙিন মাছের চাষ

সূচনা

কোয়ারিয়াম এর ভেতরের পরিবেশ ও কোয়ারিয়াম সজ্জা

কোয়ারিয়াম কি এবং কেন

কোয়ারিয়াম পরিচর্যার ক্ষেত্রে কিছু লক্ষ্যনীয় বিষয়

কোয়ারিয়াম পরিচর্যা

কোথায় কিভাবে রঙিন মাছের চাষ শুরু করবেন

কোয়ারিয়াম রাখবার জায়গা

বিভিন্ন প্রকার রঙিন মাছের সাধারণ পরিচয়

রঙিন মাছ চাষের বিভিন্ন ধাপ

রঙিন মাছের বিভিন্ন প্রকার রোগ ও  তার প্রতিকার

রঙিন মাছ চাষের উপকরণ

ক্যাপটেন ভেড়ি মত্স্য গবেষণাগারের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান

রঙিন মাছের প্রজনন

কিছু তথ্য

রঙিন মাছ চাষের আয় ব্যয়

কোয়ারিয়ামে ব্যবহৃত  কিছু ওষুধ এবং তাদের  ব্যবহার বিধি

 

সূচনা

প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাসে মাছের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য দ্রব্য হিসাবে মাছের খাদ্যগুন মাছকে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলে সাহায্য করেছে আবার বাহারী গুনের জন্য বহু মাছকে ঘর সাজানোর  উপকরণ হিসাবে ব্যবহারও বহুকাল যাবত্ রোমান যুগে প্রথম মাছকে পোষ মানিয়ে কৃত্রিম জলাধারে রাখা  হয় বলে অনেকের বিশ্বাস তবে চীন ও জাপানে প্রায় ১০০০ বছর ধরে gold Fish এবং Koi Carp বাহারী মাছ হিসাবে ঘর সাজানোর কাজে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ক্রমে বিভিন্ন মাছ নানান রঙ ও বৈচিত্রের জন্য বিভিন্ন দেশে সমাদৃত হয় মানুষের এই শখ বা নেশার চাহিদা পূরনের জন্য প্রথমের দিকে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে সংগ্রহ করে শুরু হলেও ক্রমবর্দ্ধমান চাহিদা পূরনের জন্য এর প্রজনন ও চাষ শুরু হয়বর্তমানে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, ইজরায়েল, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে রঙিন মাছের ব্যবসায়িক ভাবে   চাষ হচ্ছে

ভারতবর্ষে রঙিন মাছ পোষার শখ যথেষ্ট বৃদ্ধি হলেও এর ব্যবসানুযায়ী  চাষ এখনও খুব একটা জনপ্রিয়তা  অর্জন করেনি৷   মূলত প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে সংগ্রহ করে পোষা হয় বা রপ্তানী করা হআমাদের দেশে বিভিন্ন জলাশয় নানা বৈচিত্রের মাছ বসবাস করে বেশীরভাগ মাছের গুরুত্ব আমরা এখনও উপলব্ধি করতে পারিনি এবং সেগুলিকে আমরা অবহেলাভরে অবাঞ্ছিত মাছ ভেবে নষ্ট করে ফেলেছি বা ফেলা হচ্ছে কিন্তু    এই সব দেশীয় রঙিন মাছের বিদেশের বাজারে যথেষ্ট কদর আছে

পশ্চিমবঙ্গে ব্যক্তি প্রচেষ্টায় রঙিন মাছের চাষ কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় শুরু হয়েছে যা কলকাতা, হাওড়া,  দক্ষিণ ২৪ পরগণা, উত্তর ২৪ পরগণার বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় বহু মানুষ রঙিন মাছ চাষের বিভিন্ন পর্যায়ের উপর তাদের পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছেন কেউ প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে কেবল বাচ্চা সংগ্রহ করেন, কেউ শুধু মাছের বাচ্চা সংগ্রহ করে নিজ জলাশয়ে বা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পালন করে বিক্রি করেন  আবার কেউ কেঁচো বা ডাফনিয়া সংগ্রহ করে রঙিন মাছের খাদ্য হিসাবে বিক্রি করেন কেউ মাছের প্রজনন করে বাচ্চা উত্পাদনের সঙ্গে যুক্ত, আবার কেউ রঙিন মাছের আমদানি বা রপ্তানীর সঙ্গে যুক্ত

কোয়ারিয়াম কি এবং কেন

মানুষ মাত্রেই কিছু না কিছু শখ থাকে মাছ পোষাও তেমনি একটা শখ এ শখ অপরাপর কোন শখ থেকে  কম বিচিত্র তো নয়ই বরং অনেক কিছুর থেকেই বেশী আকর্ষনীয়, আনন্দদায়ক ও পরিচ্ছন্নতায় শ্রেষ্ঠভারতবর্ষ ক্রান্তীয় দেশের মধ্যে অন্যতম এবং আমাদের দেশের মত আবহাওয়া পৃথিবীর যে যে জায়গায় আছে সেখানের মিষ্টি ও নোনা জলাশয় বহু সংখ্যক রঙিন মাছের প্রাকৃতিক বিচরণ স্থানএই সব মাছ সাধারণত কাঁচের তৈরী কৃত্রিম জলাধারে রাখা হয়, যা Aquariam নামে খ্যাত

সাধারণত বাড়ীর বৈঠকখানায় Aquariam রাখা হয় ঘরের সৌন্দর্য্য বাড়াবার জন্য৷ এছাড়া কাঁচের তৈরী কৃত্রিম জলাধার মাছ সম্বন্ধে জানবার একটি গবেষণাগার  কৃত্রিম জলস্থান দেখবার আগ্রহে তাকিয়ে মানুষ ও মাছ সন্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারে

কৃত্রিম জলাধারে মাছ পুষে আমরা জানতে পারি--

মাছ কি খেতে ভালবাসে
কি খাবার কোন ধরনের মাছ পছন্দ করেন

কোনগুলি রাক্ষুসে মাছ

রাক্ষুসে মাছের শিকার ধরার প্রকৃতি

কোন কোন মাছগুলি কেবলমাত্র খেলার জন্য অন্য মাছকে তাড়া করে

কোন সময় মাছের শ্বাসকষ্ট উপস্থিত হয়

কোন সময় জলাধারের জল পাল্টানো উচিত

মাছের স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা

মাছের প্রজনন, বংশ বিস্তার, সন্তান রক্ষার প্রচেষ্টা
 
কোন গভীরতায় কোন কোন মাছ থাকতে পছন্দ করে

 

কোয়ারিয়াম এর ভেতরের পরিবেশ ও কোয়ারিয়াম সজ্জা

একটা জলাধারের তলার জীবন্ত দৃশ্য সকলের আকর্ষণ লাভ করতে বাধ্য  অবশ্য এর জন্য Aquariam কে সাজানো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নীচের জিনিষগুলি এই সাজ-সজ্জায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে

বালি-  জলাধারের তলাতে মোটা বালি বিছিয়ে দিতে হবে বালি বিছানোর সময় জলাধারের পেছন দিকে ২ ইঞ্চি পুরু থাকবে এবং ক্রমশ ঢালু হয়ে সামনের দিকে ১ ইঞ্চি হবে এই ভাবে বালিকে ঢালু করে দেবার উদ্দেশ্য হলো সামনের দিক থেকে সমস্ত মাছ ও গাছ দেখা যাবে  দেখা যাবে অন্য যা কিছু দিয়ে Aquarium সাজানো হবে সব কিছু এছাড়াও ময়লা যা কিছু জমা হবে সবই সামনের দিকে চলে   আসায় সহজেই পরিস্কারের সুবিধা হবে

জলজ উদ্ভিদ-   বালিতে কয়েকটি জলজ উদ্ভিদ বসিয়ে দেওয়া দরকার  গাছের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট  রঙিন মাছ যখন খেলা করবে তখন দেখতে যেমন সুন্দর লাগবে তেমনি দিনের বেলায় দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস গ্রহন করে বিনিময়ে অক্সিজেন গ্যাস উত্পাদন করে মাছেদের জীবন রক্ষায় অনেক- খানি সাহায্য করে  এছাড়া আকোয়ারিয়ামে গাছ পচন ও নাইট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে উত্পন্ন নাইট্রেট   শোষন করে, বড় মাছের হাত থেকে ছোট মাছকে রক্ষা করে ও আশ্রয় দেয়, ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত  স্থান ও পরিবেশ প্রদান করে সাধারণত  Aquarium  এর পক্ষে উপযোগী গাছ হলো ভ্যালিসনেরিয়াকারণ, এই জাতীয় গাছ জলের মধ্যে খুব সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে  

এছাড়াও আরও কতকগুলি গাছ আকোয়ারিয়ামে ব্যবহার হয়  যেমন-

AQUARIUM PLANT-এর তালিকা-

প্রচলিত নাম

বিজ্ঞানসম্মত নাম

ভ্যালিসনারিয়া

Vallisneria spiralis

লুডিজিয়া

Ludwigia natana

ক্যাবমবা

Cabomba coroliniana

সূচী ঘাস

Eleocharis acicularis

ওয়াটার ফার্ণ

Ceratopteris sp.

ক্রিপটোকরিনি

Cryptocoryne sp.

আমাজন সোর্ড প্লান্ট

Echinodorous amazonicus

হাইগ্রোফিলা

Hygrophila spinosa

মবুলিয়া

Ambulia sp.

হাইড্রিলা

Hydrilla verticillata

কচুরিপানা

Eichhornia crassipes

মাইরিওফাইলাম

Myriophyllum aquaticum

ব্যাকোপা

Bacopa moneri

 

গেঁড়ি ও ঝিনুক-   জলের মধ্যে দু চারটে গেঁড়ি ও ঝিনুক ছেড়ে দেওয়া দরকার এরা চৌবাচ্চায় বা জলাধারের ময়লা খেয়ে ফেলেফলে জল পরিস্কার থাকবেতবে এদের বংশ বাড়তে দেওয়া উচিত হবে না 

Aquarium- এর ভেতরে সাজানোর জন্য অথবা দূর থেকে যাতে দেখতে সুন্দর লাগে সেই কারণে বালির উপর নুড়ি সাজিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু এগুলি সংখ্যায় বেশী থাকা উচিত নয়  কারণ, এতে মাছের খাবার খুঁজে পেতে অসুবিধার সৃষ্টি হয়

জল-  Aquarium  এ জল ভর্ত্তি করে দেবার পরই যেন মাছ ছাড়া না হয় কমপক্ষে ৭ দিন অপেক্ষা    করে তারপর মাছ ছাড়া চলতে  পারে  Aquqrium  এ যে জল দেওয়া হবে সেটা পুকুর অথবা বৃষ্টির জল হলে ভাল হয়  অবশ্য কলের জলও ব্যবহার করা যেতে পারে সেক্ষেত্রে দেখতে হবে যাতে ক্লোরিন বেশী না থাকে  যে জলই ব্যবহার করা হোক না কেন, প্রতি গ্যালন জলের জন্য ৫ গ্রাম অথবা ছোট চায়ের  চামচের এক চামচ খাবার নুন মিশিয়ে দেওয়া দরকার

 

কোয়ারিয়াম রাখবার জায়গা

Aquarium এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে খুব আলো বাতাস পাওয়া যাবে সাধারণভাবে Aquarium রাখা হয় বাড়ীর বৈঠকখানায় অথবা শোবার ঘরে তবে যে জায়গাতেই রাখা হোক না কেন দেখতে হবে সরাসরি রোদ যেন না লাগে  Aquarium  অন্যান্য ক্ষেত্রেও নানা ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যেমন-

অফিসে    ----   সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে 
পার্কে      ----   পর্যটকদের আকর্ষণ করতে
 
হোটেলে   ----    অতিথিদের মনোরঞ্জন করতে

ফার্মে     ----    পরীক্ষামূলকভাবে, বাচ্চা তৈরী করতে ও লালন পালন করতে

 

কোয়ারিয়াম পরিচর্যা

কাঁচ পরিস্কার-   Aquarium  এর চার দেওয়ালের গায়ে এক ধরনের সবুজ শ্যাওলা জমা হয়যদিও এই শ্যাওলা মাছেরা খেয়ে থাকে এবং ক্ষতিকারক নয়, তবুও মাঝে মাঝে পরিস্কার করা দরকারকারণ, এতে সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়  আর যে উদ্দেশ্যে করা অর্থাত্ মাছের দৃশ্য দেখা, সেটাও ব্যাঘাত ঘটে সেই কারণে মাঝে মাঝে পরিস্কার কাপড় দিয়ে ভেতরের অংশ মুছে দেওয়া দরকার

তলদেশের ময়লা পরিস্কার-   Aquarium  এর তলায় শ্যাওলা বা অন্যান্য ময়লা জমা হয়ে থাকে মাসে অন্ততঃপক্ষে দু’ বার এই ময়লা পরিস্কার করা দরকার   দরকারে জল পাল্টানো জরুরীজল পাল্টানো-    জলের রং যদি ঘোলা হয়ে যায় অথবা বাদামী দেখায় তা হলে অবশ্যই জল পাল্টে দিতে হবে

ওষুধ প্রয়োগ-   Aquarium   এর জল যাতে দূষিত না হয় এবং মাছের শরীরে ছত্রাক জনিত রোগের  আক্রমণ না ঘটে তার জন্য মেথিলিন ব্লু  সপ্তাহে একদিন চার ফোঁটা সকালের দিকে জলে প্রয়োগ করা  দরকার

অক্সিজেনের অভাব-    অক্সিজেনের অভাব হলে Aquarium  এর মাছেরা ঘন ঘন জলের ওপর দিকে উঠে অক্সিজেন নেবার চেষ্টা করে  মাছেদের এই রকম করতে দেখলেই জল সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিয়ে নতুন জল দিয়ে Aquariumর্তি করতে হবে 

 

কোয়ারিয়াম পরিচর্যার ক্ষেত্রে কিছু লক্ষ্যনীয় বিষয়-

স্বাভাবিক অবস্থায় কোয়ারিয়ামের জলে কোন রকম দূর্গন্ধ থাকবে নাকোয়ারিয়ামের ভেতরে উদ্ভিদ-এর   রং সব সময় উজ্বল থাকবে  উদ্ভিদের কোন অংশে যদি পচন ধরে তবে তাত্ক্ষনিক সেই অংশ বাদ দিয়ে দিতে হবে প্রয়োজনে সম্পূর্ণ গাছটি পাল্টে ফেলতে হবেকোয়ারিয়ামের জল সব সময় স্বচ্ছ বা হাল্কা সবুজ হবেজলস্তরের উপরাংশে কোন রকম ময়লা- স্তর বা তৈলাক্ত পদার্থ থাকবে না কোয়ারিয়ামের ভেতরে বালি ব্যবহার করলে লক্ষ্য রাখতে হবে সেই বালিস্তর যেন সব সময় পরিস্কার থাকে বালিস্তর যেন ঝুরঝুরে থাকে  সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় মাছ চনমনে থাকবে এবং পাখনা সোজা রেখে চলাফেরা করবে  মাছের পেট থেকে কালো সূতোর মত পায়খানা ঝুলবে না  কোয়ারিয়ামের মধ্যে কোন মরা মাছ বা দূর্বল মাছ থাকবে নারঙিন মাছ চাষের শুরুতেই যে তথ্যগুলি জানা দরকার এবং যা থেকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোনো  যায় তা হল-

রঙিন মাছ চাষের দরকারী কথা

রঙিন মাছ চাষের শুরুতেই যে তথ্যগুলি জানা দরকার এবং যা থেকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোনো  যায় তা হল-

* কি ধরনের মাছ পালন করা হবে

* জলাধারের আয়তন অনুযায়ী মাছের মাপ ঠিক হচ্ছে কিনা

* মিষ্টি জলের মাছ বা নোনা জলের মাছ

* নির্বাচিত মাছ ক্রান্তীয় মাছ কিনা

* মাছের বিশেষ প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও বসতি

* মাছের সঠিক চাহিদা পূরণ সম্ভব কিনা 

 

 

রঙিন মাছ চাষের উপকরণ

রঙিন মাছ চাষে বেশ কিছু উপকরণ প্রয়োজন উপকরণ নির্বাচনের সঠিকতা এবং সহজ প্রাপ্যতা রঙিন     মাছ চাষে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি

 

কোথায় কিভাবে রঙিন মাছের চাষ শুরু করবেন

বাড়ীতে এক কাঠা জায়গা থাকলে কিংবা ছোট উঠোন হলে রঙিন মাছ যে কেউ চাষ করতে পারেনসে জায়গা যদি নাও থাকে তবে ঘরের মধ্যে বা বাড়ীর ছাদে কৃত্রিম জলাধার বানিয়ে রঙিন মাছ চাষ করে  কিছু আয় করা যায় জলাধারগুলি আয়তাকার হলে ভাল সাধারণত কাঁচ দিয়ে এই জলাধার বানানো হয়কোয়ারিয়ামের গভীরতার উপর কাঁচের থিকনেস কম বা বেশী করতে হয় সাধারণত  ১৬-১৮ ইঞ্চি গভীরতার জন্য ১/৪ ইঞ্চি পুরু প্লেট কাঁচ, ১৯-২২ ইঞ্চির জন্য ৩/৮ ইঞ্চি পুরু প্লেট কাঁচ এবং ২৩-৩০ ইঞ্চি গভীরতার জন্য ১/২ ইঞ্চি পুরু প্লেট কাঁচ ব্যবহার করতে হয় সিমেন্টের চৌবাচ্চা কৃত্রিম জলাধার রূপে  ব্যবহার করলে ৩-৫ ইঞ্চি দেওয়ালই যথেষ্ট  প্লাস্টিকের চাদর দিয়েও জলাধার বানিয়ে রঙিন মাছের চাষ  সম্ভব জলাধার কত বড় বানাতে হবে তা নির্ভর করে একসাথে কতগুলো মাছ চাষ করা হবে তার উপর  মাছের চারা মজুত সংখ্যা নির্ভর করে জলাধারের উপরিতলের ক্ষেত্রফলের উপর সাধারণত মিষ্টি জলের  মাছের ক্ষেত্রে (লেজ বাদ দিয়ে) প্রতি সেন্টিমিটার মাছের জন্য ২০ বর্গ সেন্টিমিটার জায়গা প্রয়োজনচৌবাচ্চা মাটির নীচে অর্থাত জমির সমতল থেকে নীচে করা উচিত নয় তাতে নিয়মিত জল পরিবর্তন করতে  অসুবিধা হবে এবং জল নিষ্কাশনের জন্য পাম্প ব্যবহার করার দরকার হবে তাই চৌবাচ্চা জমির সমতল   থেকে একটু উঁচুতে করাই ভাল  সাধারণত রঙিন মাছের চাষে চৌবাচ্চার মাপ লম্বায় ২ মিটার, চওড়ায় ১ মিটার এবং গভীরতায় ০.৫ মিটার করা ভালো

 

বিভিন্ন প্রকার রঙিন মাছের সাধারণ পরিচয়

রঙিন মাছ বলতে আমরা সাধারণভাবে বিদেশী রঙিন মাছ যেমন সোর্ডটেল, প্লাটি, মলি, নজেল, ডিসকাস্, ফাইটার, গোল্ডফিস, টাইগার শার্ক, সিলভার শার্ক, টাইগার বার্ব প্রভৃতি মাছের কথা ভাবিকিন্তু আমাদের  দেশের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সুন্দর রঙ ও বৈচিত্র্য, শান্ত স্বভাব, সাধারণ খাবার খাওয়ার স্বভাব ও ছোট আবদ্ধ স্থানে সহজে থাকতে পারার কারণে বিদেশের বাজারে ইন্ডিয়ান কোয়ারিয়াম ফিস হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে   সাধারণত  ভারতের যে মাছগুলি দেশে ও বিদেশে রঙিন মাছ  হিসেবে সমাদৃত তা নীচে দেওয়া হল-

ভারতীয় রঙিন মাছের তালিকা
(Indian Aquarium Fish)

স্থানীয় নাম

বিজ্ঞানসম্মত নাম

মৌরালা

Amblypharyngodon mola

কই

Anabus testudineus

তেচোখো

Aplocheilus panchax

ভূতো বেলে, কালিপৌসি

Badis badis

বাতাসী টাংরা

Batasio batasio

ব্যাঙ মাছ

Boleopthalmus boddariti

ঘুঁতে, রুটি মাছ

Botia macrognatha

ঘুঁতে

B. lohachata

চ্যাং

Channa gachua

শাল

C. marulius

ল্যাটা

C. punctatus

শোল

C. striatus

মাগুর

Clarias batrachus

খোলসে

Colisa fasciata

খোলসে

C. lalia

লাবুকা, ঘোড়া দাঁড়কে

Chela labuca

চাঁদা

Chanda name, C. ranga

জেব্রা, নিরা

Danio rerio

দাঁড়কে

Esomus danricus

বেলে

Glossogobius giuris

বক মাছ

Hemirhamphus far

কালবোস

Labeo calbasu

বাটা

L. bata

বান মাছ

Macrognathus aculeatus

পাঁকাল

Mastocembelus armatus

পাঁকাল

M. pancalus

নোনা ট্যাংরা

Mystus gulio

আড় ট্যাংরা

M. seenghala

ট্যাংরা

M. vittatus

ফলুই

Notopterus notopterus

চিতোল

N. chitala

ন্যাদাস

Nandus nandus

পাবদা

Ompok pabda

তিত পুঁটি

Puntius ticto

রাসবোরা

Rasbora daniconius

চেলা

Salmostoma bacaila

পায়রাচাঁদা

Scatophagus argus

ট্যাপা

Tetradon cutcutia

কাঁকলে

Xenontodon cancila

 

রঙিন মাছের প্রজনন

রঙিন মাছের প্রজনন বিভিন্ন প্রজাতির জন্য বিভিন্ন রূপ যাই হোক প্রজননের বৈশিষ্ট অনুযায়ী রঙিন  মাছকে মূলত  বাচ্চা পাড়া বা অন্তজ জনন (Live bearer) গোষ্ঠী ও ডিম পাড়া বা অন্ডজ জনন (Egg layar) গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়  বাচ্চা পাড়া গোষ্ঠীর মধ্যে গাপ্পি, সোর্ড টেল, মলি, প্লাটি, গাম্বুসিয়া উল্লেখযোগ্য  এবং ডিমপাড়া গোষ্ঠীর মধ্যে পুঁটি, খলসে, চাঁদা, পায়রাচাঁদা, জেব্রা, দাঁড়কে, ট্যাংরা, মৌরলা, ঘুঁতে, ভুতো  বেলে, আনজেল, ডিসকাস, ফাইটার, টেট্রা, শার্ক এবং গোল্ডফিসআবার ডিমপাড়া গোষ্ঠীর স্বকীয় বৈশিষ্টের   জন্য এদেরকে চারটি ছোট দলে ভাগ করা যেতে পারে- আলগা ডিম পাড়ে এমন দল   যেমন-  জেব্রাআঠালো ডিম পাড়ে এমন দল   যেমন-  গোল্ডফিস, বিভিন্ন জাতের পুঁটি, টেট্রাবাবল নেষ্টের মধ্যে ডিম    পাড়ে এমন দল  যেমন-  খোলসে, ফাইটার, গোরামীআঠালো ডিম যত্ন নিয়ে পাড়ে এমন দল   যেমন-  নজেল, ডিসকাস্Live bearing মাছেদের বাচ্চা তোলা খুবই সোজা এরা প্রায় বারো মাসেই বাচ্চা  দেয় দেখা যায় এরা বেশীর ভাগ একাদশী, আমাবস্যা, পূর্ণিমা এইসব দিনে বাচ্চা দেয় বাচ্চা ছাড়তে  আরম্ভ করলে সাধারণত ৪ ঘন্টার মধ্যে সব বাচ্চা ছেড়ে দেয়   এই জাতের মাছেরা যখন বাচ্চা দিতে    আরম্ভ করে তখন তিনবার পর পর ২০-২১ দিন বাদে বাদে দেয়   অনেক সময় মাছেরা নিজেদের পেট      ভরা খাবার না পেলে নিজেদের বাচ্চাদের খেয়ে ফেলেLive bearing মাছেদের পুরুষ ও স্ত্রী চেনা খুব  সহজ   পুরুষদের পেটের কাছে একটি ছুঁচালো পাখনা হয় যাকে ইংরাজীতে Gonopodium বলে, স্ত্রী মাছেদের পাখনা গোল হয় এবং মোটা পেটে কালো দাগ দেখা যায় যাকে Gravid spot বলে

সারা বছর ধরে গাপ্পি ও গোল্ড ফিসের প্রজনন ও চাষ করা হয়   যদিও শীতে গাপ্পি কম বাচ্চা দেয় ও  গ্রীষ্মে গোল্ডফিস কম ডিম পাড়ে  শীতকালের প্রজননের জন্য আদর্শ-মাছ হচ্ছে গোল্ড ফিস, কই কার্প, ম্যানিলা কার্প, ক্যাট ফিস ইত্যাদি গ্রীষ্মকালে টাইগার বার্ব, রোজীবার্ব, উইডো টেট্রা, শার্পে টেট্রা, সোর্ডটেল, মলি,    প্লাটি প্রজনন করানো ভাল  বর্ষাকালে পার্ল গোরামী, কিসিং গোরামী, ডোয়ার্ফ গোরামী, ব্লু চিকলিড, জেব্রা চিকলিড, টেট্রা, টাইগার বার্ব করা ভাল

 

রঙিন মাছ চাষের বিভিন্ন ধাপ

রঙিন মাছের চাষ ব্যাপক, প্রায় নিবিড়, নিবিড় বিভিন্ন পদ্ধতিতে হয় তবে যে কোন চাষে সাধারণ যে বিষয়গুলির উপর নজর দিতে হয় তা হল-

জলাধার প্রস্তুতি-   কাঁচ, সিমেন্টের চৌবাচ্চা বা প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে জলাধার তৈরীর পর জল ভর্তি করে     ৩-৪ দিন রেখে দেবেন জলাধার-এর উপর আচ্ছাদন থাকা ভাল  তবে ভাল  আলো বাতাস যাতে লাগতে পারে সে দিকেও নজর দিতে হবে পুকুরের জল, বৃষ্টির ধারা বা কলের জল, যেটা সুবিধে হয় চৌবাচ্চায় ব্যবহার করা যেতে পারে  মাছ ছাড়ার ২৪ ঘন্টা আগে প্রতি পাঁচ গ্যালন জলে ৫ শতাংশ মেথিলিন ব্লু     এক ফোঁটা ও লবন চায়ের চামচের ২চামচ মিশিয়ে দিতে হবে

মাছের চারা সংগ্রহ ও মজুত-   জেব্রা, খলসে, ঘুঁতে, পুঁটি, ব্যাডিস প্রভৃতি দেশী মাছের বাচ্চা  সাধারণত এর প্রাকৃতিক বাসস্থান খাল, বিল, পুকুর, নদী, নালা, ধানক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা হয় আর গোল্ড ফিস, প্লাটি, মলি, নজেল ইত্যাদি বিদেশী মাছের বাচ্চা হাওড়া বা কলিকাতার হাতিবাগান বাজারে পাওয়া যায় এছাড়া বাড়ীতে প্রজনন ঘটিয়েও এ মাছের চারা চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়  মাছ নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে সমস্ত মাছ  আপনি একত্রে এক চৌবাচ্চায় ছাড়তে চান তারা এক সঙ্গে থাকবার উপযুক্ত মাছ কিনামাছের চারা চৌবাচ্চায় ছাড়ার আগে অবশ্যই শোধন করে নেওয়া উচিত যাতে রোগ জীবাণু থাকলে নষ্ট    হয় চাষের জন্য চারা সর্বদা সুস্থ, সবল এবং ক্ষতশূন্য হওয়া দরকার রুগ্ন বা  অপুষ্ট চারা বেছে বাদ দেওয়াই ভাল  চারা শোধন করার জন্য সাধারণত  পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (Potassium permanganate) ব্যবহার করা হয় ১০ লিটার পরিষ্কার  জলে আঙ্গুলের এক টিপ (FingerTip) পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে মাছের চারাগুলি ৫ থেকে ১০ মিনিট ওই জলে রেখে পরে পরিষ্কার জলে  ধুয়ে চৌবাচ্চায় ছাড়তে  হয় মাছের খাবার প্রয়োগ-  রঙিন মাছ কৃত্রিম জলাশয়ে পালন করা হয় তাই মাছের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য প্রয়োগ করা জরুরী সঠিক খাদ্যের উপর মাছের রং, বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রজনন নির্ভর করে যদিও মাছকে বাজারের বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম খাদ্য দেওয়া হয় তবুও জীবন্ত খাদ্য  (Live  food) একান্ত প্রয়োজন রঙিন মাছের জন্য বিভিন্ন প্রকার জীবন্ত খাদ্য নিম্নরূপ-

ব্রাইন শ্রিম্প (Brine shrimp)-     নোনা জলের এই কবচী প্রাণী যেমন আর্টিমিয়া স্যালিনা (Artemia salina) সদ্য জন্মানো বাচ্চা মাছের খুবই প্রিয় খাদ্য

ইনফুসুরিয়ান্স (Infusorians)-    এককোষী এই প্রাণী যেমন প্যারামেসিয়াম যা সমস্ত জলাশয়ে পাওয়া যায় তা বাচ্চা মাছের প্রথম খাদ্য (First food) রূপে বিশেষ সমাদৃত 

ওয়াটার ফ্লি (Water flea)-   ক্ষুদ্র এই কবচী খাদ্য কণার মধ্যে ডাফনিয়া ও সাইক্লপস উল্লেখযোগ্য   বড়গুলি পরিণত মাছের জন্য এবং বাচ্চাগুলি ঘন কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে সদ্য জন্মানো ছোট্ট মাছকে খাওয়ানো হয়

স্লাডজ ওয়ার্মস (Sludge worms)-  টিউবিফেক্স এক সমাকৃতি পাঁকের কৃমি সব রঙিন মাছের খুবই প্রিয় খাদ্যকেঁচো (Earth worms)-  জীবন্ত কেঁচো অথবা কুঁচানো কেঁচো রঙিন মাছের যথেষ্ট প্রিয় খাদ্য 

ব্লাড ওয়ার্ম (Blood worms)-  পতঙ্গ শ্রেণীর জলজ দশার লার্ভাগুলি কোয়ারিয়াম মাছের বিশেষ খাদ্যরূপে চিহ্নিত যে খাবারই দিন খুব অল্প পরিমাণে দেবেন যা মাছেরা দশ মিনিটের মধ্যে খেয়ে নিতে পারে রোজ সকালে ও বিকালে খেতে দিতে পারলে সবচেয়ে ভাল

জল পরিবর্তন-  নিয়মিত জল পরিবর্তন রঙিন মাছ চাষের জন্য একান্ত প্রয়োজন খাবার বেশী দিলে, মাছেরা  সব খাবার খেয়ে উঠতে পারে না বলে অবশিষ্ট খাবার পচে জল নষ্ট করে এছাড়া মাছের বর্জ্য পদার্থ পড়ে জল ধীরে ধীরে খারাপ হয় জল খারাপ হবার চিহ্ন হল, জলের অক্সিজেনের অভাব হওয়ায় সমস্ত মাছেরা   উপরে উঠে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেবার চেষ্টা করে এ রকম অবস্থা দেখলে তত্ক্ষণাত চৌবাচ্চার জল   পাল্টে দেবেন

জলে বায়ু সঞ্চালন করা-  চৌবাচ্চায় যদি বায়ু সঞ্চালন বা হাওয়ার বন্দোবস্ত করা যায় তাহলে খুব ভাল হয়  হাওয়া বৈদ্যুতিক মোটর ও পাম্পের সাহায্যে দেওয়া যায় হাওয়া দেওয়ার বন্দোবস্ত করলে অক্সিজেনের   অভাব পড়বে না ও সাধারণত চৌবাচ্চায় যা রাখবার নিয়ম তার চতুর্গুন মাছ রাখতে পারবেন

 

রঙিন মাছের বিভিন্ন প্রকার রোগ ও তার প্রতিকার

নিয়ম মেনে পরিচর্যা করলে এ মাছের রোগ বিশেষ কিছু হয় না মাছের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় কয়েকটি বিশেষ করনীয় কাজ

কি করবেন

কি করবেন না

দৈনিক খাদ্যে শুকনো ও জীবন্ত খাবার দিন

কোন সময়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার দেবেন না এতে জল তাড়াতাড়ি নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে

ফিল্টার সর্বদা পরিস্কার রাখুন ও সপ্তাহে ১বার করে আংশিক জল পরিবর্তন করুন

প্রয়োজনের তুলনায় কম খাদ্যও দেওয়া উচিত নয়  এতে মাছ দূর্বল হয়ে রোগগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে

সব সময় সুস্থ, সবল ও উজ্জ্বল রঙিন মাছ বেছে নিন

কোন সময় খুব বড় ও খুব ছোট মাছ একসঙ্গে রাখবেন না

নতুন মাছ ঢোকানোর আগে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট জলে স্নান করিয়ে নিন

হঠাত্ হঠাত্ জল পরিবর্তন করা উচিত নয়  একসঙ্গে পুরো জলও পাল্টানো উচিত নয়

Aquarium-এ গাছ বসানোর আগে শোধন করে নিন

 

সব সময় কোন দূর্বল বা অসুস্থ মাছ কোয়ারিয়াম থেকে সরিয়ে নিন

 

রঙিন মাছ চাষে সচরাচর যে রোগগুলি বা সমস্যা দেখা যায় তা হল-

সাদা দাগ রোগ-     এই রোগে মাছের সারা গায়ে আলপিনের ডগার মত সাদা দাগ দেখা যায়ঋতু পরিবর্তনের সময় এই রোগ বেশী হয়   সাধারণত ডিসকাস, সিবোরাম, টাইগার শার্ক, ক্রোকোডাইল,   পায়রাচাঁদা বেশী আক্রান্ত হয় জলের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বাড়ানো গেলে এই রোগ থেকে  মাছের নিরাময় হয় এছাড়া, আক্রান্ত মাছকে ম্যালাকাইট গ্রীন বা তুঁতে বা লবন জলে স্নান করালে সুফল পাওয়া যায়মাউথ ফাঙ্গাস-      এই রোগে মাছেদের ঠোঁট সাদা হয়ে যায় এবং মাছ খুব দূর্বল হয়ে পড়ে  গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশী দেখা যায় নজেল, মলি, প্লাটি, সোর্ডটেল এই রোগে বেশী আক্রান্ত হয়   প্রতি লিটার জলে ১০,০০০ আই.ইউ (IU) হিসাবে পেনিসিলিন প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া  যায়

লেজ ও পাখনা পচা রোগ-   এই রোগে মাছের লেজ ও পাখনা পচে খসে পড়ে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এই রোগ বেশী দেখা যায়নজেল, সিবোরাম, কিসিং গোরামী, সোর্ড টেল এই রোগে সহজে আক্রান্ত হয় জলাধারের জলে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যায়

ড্রপসি-    মাছের শরীরের মধ্যে জল জমে সমস্ত দেহ অস্বাভাবিক ফুলে যায় আঁশ খাড়া হয়ে ওঠেআঁশ উঠে গিয়ে ঘাও দেখা যায় আক্রান্ত মাছকে আলাদা পাত্রে রাখতে হবে এবং সেই জলে ক্লোরোমাইসেটিন ক্যাপসুল গুলে স্নান করতে হবে

ছত্রাক ঘটিত রোগ-   এই রোগে মাছের গায়ে তুলোর মত জিনিস লেগে থাকতে দেখা যায়আক্রান্ত  মাছকে আলাদা জলাধারে রেখে ম্যালাকাইট গ্রীন বা লবন গোলা জলে স্নান করাতে হবে

হাইড্রা ঘটিত সমস্যা-  অনেক সময় নুড়ি, কাঁচের গায়ে অথবা গাছের পাতায় সাদা সুতার মত প্রায় আধ ইঞ্চি লম্বা প্রাণী দেখা যায় এদের মুখের দিকে ৫-৬ টা ডাল থাকে এরা সাধারণত বাচ্চা মাছ খেয়ে থাকেকোন বাচ্চা মাছ ডালগুলির ভিতর এসে পড়লেই ডালগুলি গুটিয়ে তাদের ধরে ফেলেব্লু  অথবা কসবী গোরামী জলাধারে ছাড়লে খুঁটে খুঁটে সব হাইড্রা খেয়ে নেবে

পায়খানা কষে যাওয়া-    মাছেদের পায়খানা পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যাও মাঝে মাঝে দেখা যায়এসময়ে মাছেদের পেট থেকে কালো সুতার মতন পায়খানা ঝুলতে থাকে  পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাফনিয়া খাওয়ালে পায়খানা পরিষ্কার হবে এবং মাছ সুস্থ থাকবে

 

কোয়ারিয়ামে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় প্রধান কিছু ওষুধ এবং তাদের ব্যবহার বিধি

ওষুধ

প্রস্তুত প্রণালী

প্রয়োগ পদ্ধতি

সাধারণ লবন ( NaCl )

ক)প্রতি লিটার জলে ১৫-৩০ গ্রাম 
খ)প্রতি লিটার জলে ৭ গ্রাম

ক)আক্রান্ত মাছকে ১৫-৩০ মিনিট ডুবিয়ে তবে ছাড়ুন
খ)আক্রান্ত মাছকে ২ ঘন্টা ডুবিয়ে আবার ছাড়ুন

তুঁতে (CuSO4)

প্রতি লিটার জলে ৫০০ মিগ্রা

১ মিনিট স্নান করান

পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KmnO4)

ক)প্রতি লিটার জলে ১ গ্রাম 
খ)প্রতি লিটার জলে ১০ মিগ্রা

ক)১০-১৫ সেকেন্ড স্নান করান
খ)৩০-৪০ মিনিট স্নান করান

ফরম্যালিন ৪০ শতাংশ

ক)প্রতি লিটার জলে ০.২৫ সিসি
খ)প্রতি লিটার জলে ০.০৬৬ সিসি

ক)৪৫-৫০ মিনিট স্নান করান
খ)৩-৪ ঘন্টা স্নান করান

মেথিলিন ব্লু

১ লিটার জলে ৩.৫ গ্রাম মেথিলিন ব্লু মিশিয়ে মজুত দ্রবন তৈরী করুন

১ লিটার জলে ১ মিলিলিটার তৈরী মজুত দ্রবন মিশিয়ে স্নান করান

ম্যালাকাইট গ্রীন

১ লিটার জলে ৫০ মিগ্রা ম্যালাকাইট গ্রীন মিশিয়ে মজুত দ্রবন তৈরী করুন

১ লিটার জলে ১ মিলিলিটার মজুত দ্রবন মিশিয়ে স্নান করান

ক্রিফ্লেভিন

১ লিটার জলে ১০ মিগ্রা ক্রিফ্লেভিন মিশিয়ে মজুত দ্রবন তৈরী করুন

১ লিটার জলে ১ মিলি লিটার মজুত দ্রবন মিশিয়ে স্নান করান

অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, টেরামাইসিন

বাজার থেকে ১০০ মিগ্রার ন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল কিনে নিন

কোয়ারিয়ামে প্রতি ১ লিটার জলে ৫ মিগ্রা হিসাবে ওষুধ মিশিয়ে দিন

ক্লোরোমাইসিটিন

বাজার থেকে ১০০ মিগ্রার ন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল কিনে নিন

জলাধারে প্রতি ১ লিটার জলে ২২ মিগ্রা হিসাবে ওষুধ মিশিয়ে দিন

 

 

রঙিন মাছ চাষের আয় ব্যয়

রঙিন মাছের চাষ শুরু করতে হলে প্রথমেই গাপ্পি, সোর্ডটেল, মলি বা প্লাটি দিয়ে শুরু করা ভাল এই মাছ  খুব কষ্ট সহনশীল, সহজে প্রজনন করে এবং পালন করাও সহজ বেকার ভাই-বোনেরা এবং গ্রাম ও শহরের মায়েরাও এই মাছের চাষ শুরু করে বাড়তি আয় করতে পারেন একটু সচেষ্ট হলেই প্রতি মাসে আনুমানিক ২,৫০০.০০ - ৪,৫০০.০০ টাকা সহজেই আয় করা সম্ভব

প্রকল্প-১
স্বল্প খরচে রঙিন মাছের (যেমন,গাপ্পি) প্রজননের আয়-ব্যয়ের হিসাব

মূলধনী খরচ- কাঁচের জলাধার (২ খানি) প্রতিটি ১৪০০.০০ টাকা হিসাবে    

২,৮০০.০০ টাকা

৪৮ × ১৮ × ১৮ ইঞ্চি সিমেন্টের জলাধার (৩ খানি) প্রতিটি  ১২০০.০০ টাকা হিসাবে

৩,৬০০.০০ টাকা

৬০ × ৩০ × ১৮ ইঞ্চি বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র (৩ খানি) প্রতিটি  ২০০.০০ টাকা হিসাবে 

৬০০.০০ টাকা

বায়ু সঞ্চালক যন্ত্র লাগাবার ব্যবস্থা, ছাঁকনি জাল, বালতি, মগ, প্ল্যাঙ্কটন নেট, পাইপ  ইত্যাদি বাবদ 

১,০০০.০০ টাকা

মোট- 

৮,০০০.০০ টাকা

 

পরিবর্তনশীল খরচ-

প্রজননক্ষম মাছ  ২০০টি স্ত্রী প্রতিটি ১.০০ টাকা হিসাবে

২০০.০০ টাকা

৫০টি পুরুষ প্রতিটি ৩.০০ টাকা হিসাবে  

১৫০.০০ টাকা

খাদ্য 

৩,৬০০.০০  টাকা

অন্যান্য

১,০০০.০০  টাকা

মোট-

৪,৯৫০.০০  টাকা

মোট খরচ-           (১ এবং ২)  =    

১২,৯৫০.০০  টাকা

উত্পাদন-  মাসে  ৫০০০  পিস  হিসাবে   এক  বছরে   ৬০.০০০ পিস৷

৪০ শতাংশ  পুরুষ- ২৪,০০০ পিস৷

৬০ শতাংশ স্ত্রী  -   ৩৬,০০০ পিস৷

মোট আয় - ২৪,০০০ পিস পুরুষ মাছ প্রতিটি  ১.২৫  টাকা হিসাবে

৩০,০০০.০০  টাকা

মোট আয় - ৩৬,০০০ পিস স্ত্রী মাছ  প্রতিটি ০.৩০ টাকা হিসাবে

১০,৮০০.০০  টাকা

মোট আয়

৪০,৮০০.০০  টাকা

নীটলাভ =    মোট আয়-মোট খরচ

(৪০,৮০০.০০ টাকা - ১২,৯৫০.০০ টাকা )   ২৭,৮৫০.০০   টাকা

 

প্রকল্প-২
রঙিন মাছের প্রজনন এবং আয়-ব্যয়-

মূলধনী খরচ-

কাঁচের জলাধার  ৪৮×১৮×১৮ ইঞ্চি (৬টি)  প্রতিটি ১৪০০.০০ টাকা হিসাবে 

৮,৪০০.০০ টাকা

কাঁচের জলাধার  ২৪×১২×১২ ইঞ্চি (১২টি) প্রতিটি ৬০০.০০ টাকা হিসাবে

৭,২০০.০০  টাকা

স্ট্যান্ ৪৮×১৮ ×১৮ ইঞ্চি (৬টি) প্রতিটি ৭৫০.০০ টাকা হিসাবে

৪,৫০০.০০  টাকা

স্ট্যান্ ২৪×১২×১২ ইঞ্চি (১২টি)  প্রতিটি ৪০০.০০ টাকা হিসাবে

৪,৮০০.০০  টাকা

সিমেন্টের জলাধার (৬টি) ৬০×৩০×১৮ ইঞ্চি প্রতিটি ১২০০.০০ টাকা হিসাবে

৭,২০০.০০ টাকা

এয়ার কম্প্রেসার (১টি) (০.৫ অশ্বশক্তি সম্পন্ন)

৪,৫০০.০০ টাকা

প্ল্যাঙ্কটন নেট, এয়ার কম্প্রেসারের যন্ত্রাংশ, ছাঁকনি জাল, বালতি, মগ  ইত্যাদি 

১,৪০০.০০ টাকা

  মোট - 

৩৮,০০০.০০ টাকা   

পরিবর্তনশীল খরচ-

প্রজননক্ষম মাছ ২০০ জোড়া

১০,০০০.০০ টাকা

খাবার, সার, রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদি

৭,৩০০.০০ টাকা

বিদ্যুত খরচ

১,৮০০.০০ টাকা

রক্ষণাবেক্ষণ

১,২০০.০০ টাকা

মোট -

২০,৩০০.০০  টাকা

স্থায়ী খরচ- মূলধনী খরচের সুদ ১৬ শতাংশ হারে

৬,০৮০.০০ টাকা

কার্যকরী খরচের সুদ ১৬ শতাংশ হারে 

৩,২৪৮.০০ টাকা

অবক্ষয় ২০ শতাংশ হারে 

 ৭,৬০০.০০ টাকা

মোট -

১৬,৯২৮.০০ টাকা

মোট খরচ   (খ এবং গ) ২০,৩০০.০০ টাকা + ১৬,৯২৮.০০ টাকা

৩৭,২২৮.০০ টাকা

মোট আয় সব ধরনের মাছ ১ লক্ষ পিস,  ৯০.০০টাকা প্রতি  ১০০ পিস বাবদ      

৯০,০০০.০০  টাকা

নীট আয়-  মোট আয়-মোট খরচ  (৯০,০০০.০০ টাকা - ৩৭,২২৮.০০ টাকা)

৫২,৭৭২.০০  টাকা

 

 

ক্যাপটেন ভেড়ি মত্স্য গবেষণাগারের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান

মাছ পরিবহনের সময় মাছেদের বিভিন্ন কারণে শ্রান্তি (Stress) হতে পারে শ্রান্তি (Stress) বেশী হলে   মাছ দূর্বল হয়ে মারা পর্যন্ত যায় এক্ষেত্রে Valium 5 (৫) ppm - 6 (৬) ppm হারে জলে মিশিয়ে    দিয়ে সেই জলে মাছ পরিবহন করলে মাছের শ্রান্তি (Stress) কম হয় ও বাঁচার হার বৃদ্ধি পায়যে কোন মাছকে সুদীর্ঘ পথ পরিবহনের পর তাদের শ্রান্তি (stress) কমানোর জন্য ১৫ লিটার জলে ১টি সপিরিন জাতীয় ট্যাবলেট দিয়ে সেই জলে তাদের ঘন্টাখানেক ছেড়ে রাখলে মাছ সুস্থ হবে তাড়াতাড়িকোন মাছকে প্রয়োজন   সাপেক্ষে হাতে ধরে নাড়াচাড়া করতে হলে তাকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন হতে পারেএক্ষেত্রে    ৩৬-৪০ পি.পি.এম (ppm) হারে Clove oil (লবঙ্গ তেল) ব্যবহার করলে ভাল কাজ পাওয়া যায়৷  চিকিত্সার জন্য বড় মাছকে এইভাবে অজ্ঞান করে ইনজেকসন দেওয়া সহজ হবে কিন্তু একটা বিষয়      উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিড়াল মাছের (Cat Fish) ওপর Clove oil সেরকম একটা প্রভাব ফেলতে পারে নামাছের গায়ে ছত্রাক আক্রমণ করলে কিটোকোনাজল বা ফ্লুকোনাজল গ্রুপের ঔষধ (যেমন সিসকান)   ১৫ লিটার জলে একটি ট্যাবলেট গুলে মাছকে ১৫-২০ মিনিট রেখে তুলে নিলে উপকার পাওয়া যায়   অনেক সময় মাছের গায়ে অসংখ্য সাদা বুটি (White Spot) বেরোতে দেখা যায় এরকম হলে কোয়ারিয়ামের জলে ব্রাইন শ্রিম্প ছেড়ে দিন এরা মাছকে ঐ রোগের হাত থেকে সারিয়ে তুলবে       পরিণত মাছকে জ্যান্ত কেঁচোখাওয়ালে প্রজননে ভালো ফল পাওয়া যায়

সবশেষে মনে রাখা দরকার যে, মাছের রোগ যাই রোগ হোক না কেন,  রোগাক্রান্ত মাছ যতশীঘ্র সম্ভব অন্য জলাধারে সরিয়ে সেই ট্যাঙ্কে যথেষ্ট অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করে প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করতে হবেমাছটিকে তখনই মূল জলাধারে ফিরিয়ে দেবেন যখন নিশ্চিত হবেন যে মাছটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে নতুন মাছ জলাধারে ছাড়ার আগে ০.০১ পি.পি.এম মিথিলিন ব্লু  দ্রবণে ৩০ মিনিট রেখে ছাড়লে বাইরে থেকে আনা নতুন কোন রোগ সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকা যায় তবে সব চেয়ে বড় কথা হ’ল কোয়ারিয়ামের প্রাণীদেরকে ভালবাসা এবং গভীর পর্যবেক্ষণ, যার সাহায্যে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয় কেননা কোন    সন্দেহ নেই আপনার কোয়ারিয়ামের পুষ্যিরাই তাদের অস্বাভাবিক ব্যবহার দিয়ে আপনাকে সিস্টেম এর  গন্ডগোল সম্পর্কে সচেতন করে দেয়, জানিয়ে দেয় তার শরীরে সবে আশ্রয় নেওয়া রোগের কথা

 

কিছু তথ্য

পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা শহরের গ্যালিফ স্ট্রীটে প্রতি রবিবার বোধহয় রঙিন মাছের সবচেয়ে বড় হাট বসে এখানে আসছে White milk চিকলিড, ব্যানানা চিকলিড, জাকু, সিলভার সার্ক, চেন্নাইয়ের ব্লু রাগাস, সিলভার ডলার, মোনো ঞ্জেল, আসাম থেকে জেব্রা (নদীর মাছ),  সিঙ্গাপুর থেকে সিঙ্গাপুর অস্কার, কাকদ্বীপ থেকে সার্জেন্ট মাছ, পাফার এরকম আরো অনেক নিত্য নতুন মাছ  মাছ বিক্রি করছেন সুপ্রিয় রায় ডানকুনি থেকে, অসিত দে বরানগর থেকে, ভাস্কর দাস কাকদ্বীপ থেকে এবং এরকম অসংখ্য যুবককোন প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই তারা রোজগারের খাতিরে জানেন অনেক তথ্য প্রতিদিন সংযোজিত হচ্ছে আরও নতুন তথ্য৷   কিন্তু এরা সবাই মিলে এখনও পর্যন্ত তথ্য আদান প্রদান করার মত জায়গা বা ব্যবসায়িক সংগঠন তৈরী করতে পারেন নি এর ফলে সম্পদ অনুযায়ী দেশ এবং বিদেশের ক্রেতাদের জন্য বাজার এখনও তৈরী হয়নি     রঙিন মাছ ও তার চাষ সম্পর্কে শেষ কথা কোনদিনই বলা যাবে নাআশা রাখি সম্পূর্ণ বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ভাবে রঙিন মাছ চাষীদের কাছে কিছুটা পথনির্দেশিকার কাজ করবে উত্সাহী কোয়ারিস্ট / জলবাগানের মালীরা আগে বিদ পড়াশুনা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সুসংহত উন্নত ভবিষ্যতের দিকে  এগিয়ে যাবেন এমনই এক বাস্তব স্বপ্নের শুভেচ্ছা থাকলো এই একুশ শতকে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার    দুজনেই এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন পরিকল্পনা, আর্থিক অনুদান দিতে শুরু করেছেন এটাই আশার কথা