পুকুরে চুনের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান

সাধারণ তথ্য

চুনের প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা

পুকুরে ব্যবহৃত চুনের পরিমাণ

চুনের প্রয়োগ পদ্ধতি

চুন প্রয়োগের সময়

সাধারণ তথ্য 

মাছ চাষে চুনের মত এরকম উপকারী দ্বিতীয় আর কোন পদার্থ নেইচুনের প্রধান কাজ হল পুকুরের তলাকার মাটি ও জলের অম্লভাব দূর করা চুনের অন্যান্য গুণগুলো হল :

১) মাছের বৃদ্ধির জন্য পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকা দরকার এই প্রাকৃতিক খাদ্যের পুষ্টির জন্য নাইট্রোজেন দরকার চুন পুকুরের জৈব পদার্থের পচনক্রিয়া দ্রুততর করে পুকুরে ব্যবহার যোগ্য নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, ফলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জন্মায়

২) পুকুরে ফাইটোপ্লাংকটন বা উদ্ভিদকণার বৃদ্ধির জন্য ব্যবহারযোগ্য ফসফেট দরকার ফসফেটের এই ব্যবহার যোগ্যতা মাটির পি.এইচের মানের উপর নির্ভর করে মাটির পি. এইচ মাত্রা ৬.৫ - ৭.৫-এর   মধ্যে থাকলে পুকুরে ব্যবহার  যোগ্য ফসফেট ভাল পরিমাণে পাওয়া যায় কিন্তু মাটির পি. এইচ    মান ৬.৫ -এর কম হলে  অর্থাত মাটি খুব  অম্ল হলে, ফসফেট লোহা ও আলুমিনিয়ামের  সঙ্গে আবদ্ধ থাকে এবং এই ফসফেটকে উদ্ভিদকণা ব্যবহার করতে পারে না চুন প্রয়োগ করলে মাটির অম্লভাব দূর হয় ফলে ফসফেট আবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয় এবং উদ্ভিদকণা ফসফেটেকে ব্যবহার করতে পারে তাই মাছ চাষের পুকুরে সারের সুফল পেতে হলে সার প্রয়োগের আগে পুকুরে চুন প্রয়োগ করে মাটির অম্লভাব দূর করে নিতে হয়

৩) দিনেরবেলা পুকুরে জলের পি. এইচ মানের ওঠা নামা পুকুরের মোট আলকানিটির মানের উপর নির্ভর করেপুকুরে আলকানিটির পরিমাণ খুব কম হলে সকালবেলার পি.এইচ এবং বিকালবেলার পি.এইচ মানের পার্থক্য খুব বেশী পরিমাণে হয়, যা মাছ চাষের পক্ষে ক্ষতিকারক চুন ব্যবহারের ফলে পুকুরে আলকানিটির পরিমাণ বাড়ে এবং এই চুন পুকুরে বাফার হিসাবে কাজ করে ফলে পুকুরের জলের  সকাল ও বিকাল  বেলার পি.এইচ মানের খুব বেশী পার্থক্য হয় না এবং পুকুরে মাছ চাষের পক্ষে অনুকুল   পরিবেশ বজায় থাকে

৪) চুনে ক্যালসিয়াম থাকে তাই চুন প্রয়োগে পুকুরে ক্যালসিয়াম বাড়ে, ফলে পুকুরের উত্পাদন শক্তি বাড়ে

৫) চুন তার অতিক্ষারকীয় বৈশিষ্ট্য দ্বারা মাছের কয়েকটি রোগ নিরাময় করতে সাহায্য করে

৬) চুন জলের ঘোলাটে ভাবকে দূর করে জলের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে পরোক্ষভাবে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে

৭) চুন পুকুরের বিষাক্ত গ্যাস নষ্ট করে৷  

চুনের প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা

 

চুনের নাম

প্রকৃতি

কার্যকারিতা

ক্যালসিয়াম অকসাইড বা কুইক লাইম বা পাথুরে চুন রাসায়নিক সংকেতঃ CaO

১) অম্লত্বপ্রশম করার ক্ষমতা খুব বেশী অর্থাত জল ও মাটির পি.এইচখুব তাড়াতাড়ি বাড়িয়ে তোলে
২) জলে মেশালে তাপ উত্পন্ন হয়

• যে সমস্ত পুকুরের মাটি ও জল খুব অম্লযুক্ত সেই সমস্ত পুকুরে এই চুন ব্যবহার করলে খুব তাড়াতাড়ি উপকার পাওয়া যায়
• মাছ রোগাক্রান্ত হলে এই চুন ব্যবহার করা হয়

ক্যালসিয়াম হাইড্রকসাইড বা হাইড্রেটেড লাইম
বা কলিচুন রাসায়নিক সংকেতঃ Ca(OH)2

১) অম্লত্ব প্রশম করার ক্ষমতা পাথুরে চুন অপেক্ষা কম
২) জলের সঙ্গে মেশালে খুব কম তাপ উত্পন্ন হয়

• পুকুরে এই চুনের ব্যবহার সাধারণত কম

ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা কৃষিকার্যে ব্যবহৃত চুন
রাসায়নিক সংকেতঃ CaCO3

১) অম্লত্বপ্রশমকরার ক্ষমতা খুবই কম অর্থাত জল ও মাটির পি. এইচ হঠাত্ করে বাড়িয়ে তুলতে পারে না
২) জলের সঙ্গে মেশালে তাপ উত্পন্ন হয় না

যদিও এই চুন কৃষিকার্যে বেশী ব্যবহৃত হয় তবুও যে সমস্ত পুকুরের জলের পি. এইচ ৮ বা ৮ এর উপরে থাকে সেই সমস্ত পুকুরে এই চুন ব্যবহার করা ভাল কারণ জলের পি. এইচ মাত্রা হঠাত্ করে বেড়ে যাবে না, উপরন্তু চূনের অন্যান্য উপকারিতাগুলো পাওয়া যাবে

ডলোমাইট রাসায়নিক সংকেতঃ
CaMg(CO3)2

১) অম্লত্ব প্রশম করার ক্ষমতা খুব কম
২) এই চুনে ক্যালসিয়ামের সঙ্গে ম্যাগনেসিয়াম ও থাকে

পুকুরে উদ্ভিদকণার পুষ্টির জন্য কিছু পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম দরকার এই চুন জলে ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি করে উদ্ভিদ কণার পুষ্টিতে সাহায্য  করে যদিও মিষ্টি জলে এর ব্যবহার কম তবুও অন্যান্য চুনের সঙ্গে অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলে ভাল সুফল পাওয়া যাবে

 

 

পুকুরে ব্যবহৃত চুনের পরিমাণ

পুকুরে চুন কতটা দরকার তা জল ও মাটির পি. এইচ ক্রম দেখে নির্ধারণ করা উচিত পুকুরের তলাকার মাটি

ও জল যত বেশী অম্ল হবে চুনের পরিমাণ তত বেশী হবে পুকুরের পি. এইচ প্রায় প্রশম হলে চুন খুব কম

পরিমাণে ব্যবহার করা হয় চুন প্রয়োগের পরিমাণ বিভিন্ন প্রকার মাটিতে নিম্নরূপ-

মাটির পি.এইচ

মাটির প্রকৃতি

চুন প্রয়োগের মাত্রা (কেজি/হেক্টর/বত্সর)

৪.০-৫.০

অতি অম্লীয়

২০০০

৫.১-৬.৫

অল্প অম্লীয়

১০০০

৬.৬-৭.৫

প্রায় প্রশমিত

৫০০

৭.৬-৮.৫

অল্প ক্ষারীয়

২০০

৮.৬ বা তার থেকে বেশী

অতি ক্ষারীয়

চুন প্রয়োগের দরকার নেই

 

 

চুনের প্রয়োগ পদ্ধতি

 

১) মাছ চাষের প্রথম ধাপ পুকুর প্রস্তুতি তাই বর্যার আগে শুকনো পুকুরে চুন মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে লাঙ্গল দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে হবে

২) পুকুরে জল আছে এরকম পুকুরে ক্যালসিয়াম অক্সাইডকে প্রয়োগের ৩-৪ ঘন্টা আগে কোন পাত্রে জলে মিশ্রিত করে, ঐ দ্রবন নৌকা বা বড় কোন পাত্রের সাহায্যে পুকুরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দিতে হবে

 

চুন প্রয়োগের সময়

চুন পুকুরে খুব সকালের দিকে প্রয়োগ করা উচিত কারণ এই সময় জলের পি.এইচ কম থাকে যত রোদ উঠবে তত পুকুরের উদ্ভিদকণার সালোক- সংশ্লেষের হার বাড়তে থাকবে এবং সেই সঙ্গে জলের পি.এইচ মাত্রাও বাড়তে থাকবে তাই বিকালের দিকে চুন প্রয়োগ করলে জলের পি.এইচ হঠাত্ করে বেড়ে যেতে পারে, যা মাছ চাষের পক্ষে ক্ষতিকর