ভেড়া পালন

 

 

ভেড়া পালনের লাভজনক দিকগুলি

ভেড়ার প্রজনন

বিভিন্ন জাতের ভেড়া

ভেড়ার শরীরবৃত্তীয় মানদন্ড

ভেড়া পালনের নিয়ম এবং ভেড়ার ঘর

ভেড়ার বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার

ভেড়ার খাবার

ভেড়াজাত পণ্য দ্রব্য

ভেড়ার পরিচর্যা

নমুনা প্রকল্প

 

পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুতে ভেড়া খুব সহজেই পোষা যায় ভেড়া পুষতে খরচ হয় খুবই কম, লাভ ভালই থাকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি কিংবা ভূমিহীন কৃষকদের কাছে ভেড়া পালন জীবন ধারণের প্রধান উপায় মূলত রাজস্থান, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে ব্যাপক আকারে ভেড়ার চাষ হয়

           পশ্চিমবঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নতপ্রজাতির ভেড়া আছে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় এদের বেশী দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অধিক প্রজননক্ষম ভেড়ার প্রজাতি যেমন বরুলা ইত্যাদির অধিক প্রজনন ক্ষমত্র উত্স আমাদের রাজ্যের গাড়ল ভেড়া সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে এই মূল্যবান ভেড়ার প্রজাতি আমাদের রাজ্যে অবলুপ্তির পথে এর মূল কারণগুলি হল পরিকল্পনাবিহীন প্রজনন প্রক্রিয়া, উপযুক্ত পরিচর্যা ও পুষ্টির অভাব এবং সুচিকিত্সার অপ্রতুলতা স্বাভাবিক বাসস্থানে এদের সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত প্রজনন ক্রিয়া এবং খুব সামান্য পরিচর্যার মাধ্যমে এদের অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো প্রয়োজন   

                                                                                                                             

ভেড়া পালনের লাভজনক দিকগুলি

১)       ভেড়া পালনের জন্য বড় বাড়ি ঘরের প্রয়োজন হয় না ভেড়া চরানোর জন্য মজুরি খরচও বিশেষ হয় না

২)       ভেড়া চাষ শুরু করতে বিরাট কোন অর্থ লগ্নির দরকার হয় না কিছুদিনের মধ্যে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি হতে শুরু হয়

৩)      ভেড়া নানান ধরণের ঘাষ, গুল্ম, আগাছা, লতাপাতা, বুনোজঙ্গল, গাছের পাতা, শেকড়, ছাল ইত্যাদি খেয়েই বেঁচে থাকতে পারে

৪)       ছাগলের মতো মূল্যবান গাছপালাও নষ্ট করে না

৫)      আগাছা খেয়ে ফেলে চাষির উপকার করে

৬)       সারা বছর ধরে লোম (উল), মাংস, চামড়া ও সার (মল থেকে) চাষিকে পয়সা যোগায়

৭)      কোন ধর্মেই ভেড়ার মাংস খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই

                                                                                                                             

বিভিন্ন জাতের ভেড়া
ক্রমিক সংখ্যা অঞ্চল / ভেড়ার জাত উপযোগিতা বৈশিষ্ট্য
পশম মাংস
অ) হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল    
১) গুয়েরেজ +++ + কাশ্মির, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের পার্বত্য অঞ্চলের এই ভেড়াগুলি সাধারণতঃ ছোট খাট কিন্তু শক্ত সমর্থ হয় লোমের (উল) মান অত্যন্ত উন্নত ও সুক্ষ্ম কম্বল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়
২) ভাকারওয়াল +++ +
৩) কারনাহ্ +++ +
৪) গাদ্দী +++ +
৫) রামপুর বুসির +++ +

 

 

ক্রমিক সংখ্যা

অঞ্চল / ভেড়ার জাত

উপযোগিতা

বৈশিষ্ট্য

পশম

মাংস

আ)

অনুর্বর উত্তর পূর্বাঞ্চল

 

 

রাজস্থান, গুজরাট এবং পাঞ্জাবে এদের দেখতে পাওয়া যায় আকারে প্রধানতঃ বড় এবং মজবুত হয় শিং প্রায় দেখা যায় না লোমের মান সুক্ষ্ম না হওয়ায় সাধারণতঃ কার্পেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়

১)

বিকানিরী

+++

++

২)

মাড়ওযারী

+++

+

৩)

লোহি

++

++

৪)

কুটছি

++

++

৫)

কাথিয়াওযারী

++

+

৬)

চোকলা

++

++

৭)

মাগরা

++

++

 

ক্রমিক সংখ্যা

অঞ্চল / ভেড়ার জাত

উপযোগিতা

বৈশিষ্ট্য

পশম

মাংস

ই)

দক্ষিণাঞ্চল

 

 

মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের এই ভেড়া আকারে লম্বা ও রোগাটে হয় মূলতঃ মাংসের জন্য বিখ্যাত

১)

নেল্লোরী

--

+++

২)

ডেকানি

+

+++

৩)

মান্তিয়া

+

+++

৪)

বান্দুর

--

+++

৫)

বেলারী

--

+++

 

ক্রমিক সংখ্যা

অঞ্চল / ভেড়ার জাত

উপযোগিতা

বৈশিষ্ট্য

পশম

মাংস

ঈ)

পূর্বাঞ্চল

বিহার, ওড়িষা, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে দেখা যায়

১)

সাহাবাদি

++

++

 

ক্রমিক সংখ্যা

অঞ্চল / ভেড়ার জাত

উপযোগিতা

বৈশিষ্ট্য

পশম

মাংস

উ)

সংকর জাতের ভেড়া

সংকরজাতের ভেড়ার লোম এবং মাংস দুটোই উন্নত মানের

১)

মেরিনো ক্রশ

+++

+

২)

রাম্বুলেট

++

++

৩)

কোরিয়াডেল

+++

+

             ( + চিহ্নটি উত্পাদনের মাত্রা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে )

                                                                                                                             

ভেড়া পালনের নিয়ম এবং ভেড়ার ঘর

ভেড়াদের মাঠে ছেড়ে পুষলে খাবার কম লাগে সাধারণতঃ শুকনো মাঠে এক মিটার উচ্চতার বেড়া দিয়ে ঘিরে ভেড়া পালন করা যায় গরমের সময় সামান্য গাছের ছায়াই যথেষ্ট অন্য সময়ের জন্য চাই ভেড়া প্রতি ২০ বর্গ ফুটের ঘর ৫ টি ভেড়া রাখতে হলে ১০ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া ঘরের দরকার, ছাদ কমপক্ষে ৬ ফুট উঁচু হওয়া ভাল ঘরে যেন জল না জমে - মেঝে ঢালু হতে হবে আলো বাতাস চলাচলের সুবিধা রাখতে হবে ঘরে নালার ব্যবস্থা ঠিকমতো রাখা প্রয়োজন দড়ি দিয়ে বেঁধে ভেড়া পোষা উচিত নয়

                                                                                                                             

ভেড়ার খাবার

চরে বেড়ানো ভেড়া মূলতঃ বুনো ঘাস, গুল্ম আগাছা, লতাপাতা, গাছের ছাল, শেকড়, পাতা ইত্যাদি খেয়ে থাকে এর সাথে বাদাম খোল কিংবা সূর্য্যমূখী খোল খাওয়ালে ভেড়ার উত্পাদন ক্ষমতা বাড়ে সাধারণতঃ ঘাস খাওয়ার সাথে সাথে ভেড়াপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম খোল খাওয়ানো প্রয়োজন

বাচ্চা ভেড়ার খাবার

ভুট্টা ভাঙ্গা        --       ২২ ভাগ

ছোলা ভাঙ্গা      --       ২০ ভাগ

বাদাম খোল     --       ৩৫ ভাগ (অথবা সরষে খোল)

গমের ভূষি       --       ২০ ভাগ

খনিজ লবন      --       ২.৫ ভাগ

খাবার লবন      --       ০.৫ ভাগ

বড় ভেড়ার খাবার

ভুট্টা ভাঙ্গা        --       ৩৭ ভাগ

ছোলা ভাঙ্গা      --       ১৫ ভাগ

বাদাম খোল     --       ২৫ ভাগ

গমের ভূষি       --       ২০ ভাগ

খনিজ লবন      --       ২.৫ ভাগ

খাবার লবন      --       ০.৫ ভাগ

খাবার সব সময় শুকনো জায়গায় রাখা দরকার

ভেড়ার সবুজ খাবার

যদিও ভেড়া সব ধরণের লতাপাতা খায়, তবুও জল কলমি ও সুবাবুল পাতা দেওয়া উচিত নয় কাঁঠাল, সজনে, কাঁটানটে, নটে, কপি, মুলো, পালং, গাজর সীম, বরবটি ও অড়হর পাতা ভেড়ার খুব ভাল খাবার

মাঠে চরা ভেড়ার খাদ্য

 একই চারণ ভূমিতে ভেড়ারা একটানা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে না তাই মাঠে চরে বেড়ানো ঘাস খাওয়া ভেড়াকেও বিশেষ বিশেষ ঋতুতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ গ্রাম সুষম খাদ্য খাওয়ানো প্রয়োজন

গাভীন ভেড়ার খাদ্য

গাভীন ভেড়ার রোজ ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম সুষম খাবার চাই এর সাথে চাই পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস তবে বাচ্চা দেবার এক সপ্তাহ আগে সুষম খাবার কিছুটা কমানো দরকার

সদ্যজাত ভেড়ার খাদ্য 

জন্মের প্রথম ৪৮ ঘন্টা ভেড়ার পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সদ্যজাত ভেড়াকে তার ইচ্ছে অনুসারে মায়ের দুধ (কলস্ট্রাম) খেতে দেওয়া উচিত

বাচ্চা ভেড়ার খাদ্য  

বাচ্চা ভেড়া প্রথম ২-৩ সপ্তাহ কেবলই মায়ের দুধ খাবে এর পরে মায়ের দুধ ছাড়াও অল্প অল্প করে সুষম খাদ্য ও সবুজ খাদ্যের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে ১৩-১৪ সপ্তাহ থেকে মায়ের দুধ ছাড়িয়ে দিতে হবে

ভেড়ার জল পান 

ভেড়াকে সর্বদা পরিশ্রুত পানিয় জল সরবরাহ করা প্রয়োজন গরমের সময় দিনে ৪-৫ বার ও শীতের দিনে ২-৩ বার জল খাওয়ানো দরকার

                                                                                                                             

ভেড়ার পরিচর্যা

ভেড়ারা খুবই শান্ত প্রকৃতির এবং অনুগত স্বভাবের হয় ভেড়া পালন করতে হলে একপাল ভেড়া একসাথে পালন করতে হয় একটি বা দুটি ভেড়া চাষ করলে লাভ হয় না ভেড়া পরিচর্যার জন্য কয়েকটি বিষয়ের ওপরে বিশেষ নজর দিতে হয় - যেমন, (১) জলবায়ু (২) ডিপিং (৩) লোমকাটা (৪) চিহ্নাদিকরণ ও (৫) খোজাকরণ

(১)    জলবায়ু

 (ক)     শীতকাল - এই সময় দেশের বেশীরভাগ অঞ্চলেই চারণভূমিতে ঘাস অপ্রতুল হয়ে পড়ে ফলে সুষম খাদ্যের পরিমান বাড়ানো প্রয়োজন এই সময়েই প্রাপ্ত বয়স্ক ভেড়ারা প্রজননক্ষম হতে শুরু করে

 (খ)     বসন্তকাল - এই সময় মাঠে নতুন ঘাস গজাতে শুরু করে গাছে নতুন পাতা গজায় প্রচুর খড় পাওয়া যায় এই ঋতুতে ভেড়ার ওজন বৃদ্ধি হয় গরম বাড়ার ফলে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ে লোম ছাঁটার সময় এটা এই ঋতুর শেষের দিকে ভেড়ার প্রজনন ঋতু শুরু হয়

 (গ)     গ্রীষ্মকাল - জলের চাহিদা বাড়ে চারণভূমিতে ঘাসের আকাল হয় ফলে কাটা খড় ও সুষম খাদ্য খাওয়ানো প্রয়োজন এ ঋতুতে ভেড়ার প্রজনন ঘটে গর্ভবতী ভেড়ার বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন

 (ঘ)     বর্ষাকাল - এ সময় চারিদিকে সবুজ হয়ে যায় সবচেয়ে ওজন বৃদ্ধিও হয় এ সময় গর্ভবতী ভেড়ার বাচ্চা প্রসব হয় সদ্যজাত ভেড়ার বিশেষ যত্ন নিতে হয়  

(২)    নিমজ্জন

ভেড়ার গায়ে বিভিন্ন ধরণের এঁটুলি হয়  এঁটুলি দমন করার জন্য বছরে অন্ততঃ ২ বার (বসন্তের শেষে এবং বর্ষার শেষে) ভেড়াদের রাসায়নিক মিশ্রিত জলে নিমজ্জন (ডিপিং) করা প্রয়োজন  ৩ মিটার লম্বা, ১ মিটার চওড়া এবং ১.৫ মিটার গভীরতা যুক্ত টৌবাচ্চা ভেড়ার ডিপিং-এর পক্ষে আদর্শ

 নিমজ্জনের কার্যকারিতা

(ক)     এঁটুলি নিয়ন্ত্রণ করে  ফলে ভেড়া অনেক মারণ ব্যধির হাত থেকে রক্ষা পায়

(খ)     লোমের গায়ে লেগে থাকা চর্বিজাতীয় পদার্থ, ধুলো, ময়লা, বিষ্ঠা ইত্যাদি পরিস্কার হয়  ফলে লোম ছাঁটার সুবিধা হয় এবং লোমের
         মূল্য বৃদ্ধি হয়

(গ)     বিভিন্ন রকম চর্মরোগের হাত থেকে ভেড়াকে বাঁচানো যায় ও চামড়ার দাম বেশী পাওয়া যায়

কিছু সাবধানতা

(ক)     প্রজননের পরে ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে ডিপিং করানো উচিত নয়. এতে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে

(খ)     ডিপিং-এর ঠিক আগে ভেড়াকে পর্যাপ্ত জল পান করানো উচিত, নতুবা তৃষ্ণার্ত ভেড়া ঐ চৌবাচ্চার জল পান করে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে

(৩)    লোম ছাঁটা

খুব গরমে অথবা খুব ঠান্ডায় লোম ছাঁটা উচিত নয়  প্রধানতঃ বসন্তের শেষে বা গ্রীষ্মের শুরুতে লোম ছাঁটা হয়  কোন কোন ক্ষেত্রে বছরে ২ বারও লোম ছাঁটা হয়  লোম ছাঁটার আগে ভেড়ার গা অবশ্যই পরিস্কার করে নিতে হয়, এক্ষেত্রে ডিপিং-এর সাহায্য নেওয়া যায়

(৪)    খোজাকরণ বা নির্বীজকরণ

তিনটি পদ্ধতিতে খোজাকরণ করা হয়, (ক) রবার রিং, (খ) বার্ডিজো ক্যাস্ট্রেটর ও (গ) শল্য চিকিত্সার দ্বারা অন্ডকোষ অপসারণ  শেষের দুটি পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রাণী চিকিত্সকের সাহায্য নেওয়া উচিত

                                                                                                                             

ভেড়ার প্রজনন

ভেড়া ২ বছর বয়সে যথার্থ প্রাপ্তবয়স্ক হয় যদিও আমাদের দেশে পুরুষ ও মায়া ভেড়ার মিলন ঘটানো হয়ে থাকে ৯-১৪ মাস বয়সেই, কিন্তু এই বয়সে ভেড়ার সমস্ত অঙ্গের প্রকৃত বৃদ্ধি হয় না তাই ২ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত ভেড়ার প্রজনন করানো উচিত নয়

মিলনকাল এবং ঋতুচক্র

বছরের কোন এক বিশেষ সময়ে ভেড়ার একাধিক ঋতুচক্র ঘটে থাকে এর কোন একটিতে ভেড়া গর্ভবতী হতে পারে সাধারণতঃ আমাদের দেশে গ্রীষ্মের প্রথমদিক, বর্ষাকাল এবং হেমন্তকাল ভেড়ার প্রজননঋতু

বয়ঃসন্ধি (মাস)

ঋতুচক্রের বিস্তার (দিন)

গরম দশা

৮-১২ (গড় ৯ মাস)

১৬

১-২ দিন (গড় ৩০ ঘন্টা)

গরম হওয়ার লক্ষণ

ভেড়ির গরম হওয়ার বিশেষ কোন বাহ্যিক লক্ষণ নেই ফলে পুরুষ ভেড়া না থাকলে ভেড়ির গরম হওয়ার লক্ষণ বোঝা বেশ কঠিন

গর্ভাবস্থা

ভেড়ির গর্ভাবস্থার স্থিতি গড়ে ১৫০ দিন হয় গর্ভাবস্থার কয়েকটি লক্ষণ হল ঋতুচক্রের বিরতি, ভেড়ি অপেক্ষাকৃত শান্ত হয়ে যায়, স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে, পেটের আকার ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায় সবশেষে স্তনের আকার বৃদ্ধি পায় এবং স্তনের বোঁটার আগায় মোমের মতো প্রলেপ সৃষ্টি হয় এসময়ে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা উচিত

প্রসব

 প্রসবের সময় আসন্ন হলে ভেড়ি একটু চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে মাটিতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রসব যন্ত্রনা শুরু হলে প্রসবের জন্য পেটের পেশীতে চাপ দিতে থাকে এবং প্রথমে জলথলি বেরিয়ে আসে যোনিদ্বার দিয়ে প্রসবের সময় অসুবিধা দেখা দিলে প্রাণী চিকিত্সকের সাহায্য নেওয়া জরুরী

       সদ্যজাত ভেড়ার নাভিতে টিংচার আয়োডিন লাগাতে হয় - এতে রোগ সংক্রমনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বাচ্চা যদি জন্মের সময় দূর্বল হয় এবং নিজের থেকে মায়ের দুধ টেনে খেতে না পারে, সেক্ষেত্রে হাতে করে দুধ টেনে বাচ্চাকে পান করানো প্রয়োজন 

       প্রথম ২ সপ্তাহ বাচ্চা কেবলই মায়ের দুধ পান করবে এরপর ক্রমশঃ সুষম খাদ্যের অভ্যাস গডড়ে তুলতে হবে ১৩-১৪ সপ্তাহ পরে মায়ের দুধ ছাড়াতে হবে 

                                                                                                                             

ভেড়ার শরীরবৃত্তীয় মানদন্ড

তাপমাত্রা

(ফা.)

শ্বাস প্রশ্বাসের হার (প্রতি মিনিটে)

আয়ু

(বছর)

হৃদস্পন্দন

(প্রতি মিনিটে)

নাড়ী স্পন্দন

(প্রতি মিনিটে)

১০১.৫ - ১০৩

১২-১৫

১০-১৫

৭০-১২০

৭০-৮০

 

                                                                                                                             

ভেড়ার বিভিন্ন রোগ

ক্রমিক সংখ্যা

রোগের নাম

প্রকৃতি ও প্রকাশ

রোগ লক্ষণ

নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণ

১)

এনথ্রাক্স

এই জীবানু মাটির ভিতর বহু বছর জীবিত থাকে এবং বাতাসের সংস্পর্শে এলে স্পোর সৃষ্টি করতে পারে জীবানুটি শরীরের মধ্যে কোন একটি ক্ষতের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে অথবা শ্বাস দ্বারা বা খাদ্যরূপে গৃহীত হয় সুপ্তাবস্থা ১-৫ দিন

বহুক্ষেত্রে রোগটি অত্যন্ত মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং অসুস্থতার কোন পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই নাক এবং পায়ূ থেকে রক্ত স্রাবসব মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায়

মৃত ভেড়াকে মাটির ১.৮ মিটার গভীরে পুঁতে ফেলা দরকার জীবিত ভেড়াদের টিকা দেওয়া প্রয়োজন প্রাণী চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত

২)

ব্ল্যাক কোয়ার্টার

এটি একটি তীব্র সংক্রামক রোগ

প্রথমে খোঁড়াতে দেখা যায়, তারপর পায়ের ওপর দিকে স্ফীতি সৃষ্টি হয় যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং চামড়ার নীচে গ্যাস জমে

চলাফেরা করতে যন্ত্রণা হয়, ক্ষিদে কমে যায় এবং রোমন্থন বন্ধ হয়ে যায় শরীরের তাপমাত্রা ও শ্বাস প্রশ্বাসের হের বেড়ে যায় রোগ সূচনার ১২-৪৮ ঘন্টার মধ্যে আকষ্মিক মৃত্যু হয়

আক্রান্ত অঞ্চলগুলিতে ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত ভেড়াকে লোম কাটার আগেই প্রতি বছর টিকা দিতে হবে

৩)

মারাত্মক ধরণের ইডেমা

ব্ল্যাক কোয়ার্টার-এর সমগোত্রীয়

খোজাকরণ, লোম ছাঁটা, প্রসব এবং শল্য চিকিত্সার সময় যথোপযুক্ত চিকিত্সা করলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাস পায়

৪)

বটিউলিজম

এটি জৈব বিষ উত্পন্ন করে

আক্রান্ত ভেড়াগুলি প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে

আক্রান্ত ভেড়াগুলিকে জবাই করার জন্য আলাদা করে নেওয়া হয় অন্যদের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়

৫)

জোনস্ রোগ

দীর্ঘকাল স্থায়ী, দূরারোগ্য ও সংক্রামক রোগ জল ও খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ায়

আক্রান্ত প্রাণী দূর্বল হয়ে পড়ে বিশেষ গন্ধময়, ফেনাযুক্ত পাতলা পায়খানা হয়

আক্রান্ত ভেড়াগুলিকে জবাই করার জন্য আলাদা করে নেওয়া হয় কঠোর স্বাস্থ্য বিধি পালন করা প্রয়োজন

 

ক্রমিক সংখ্যা

রোগের নাম

প্রকৃতি ও প্রকাশ

রোগ লক্ষণ

নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণ

৬)

নীল জিহ্বা

একটা মশার মতো পতঙ্গের মাধ্যমে ছড়ায়

২-৪ দিনের সুপ্তাবস্থার পর উচ্চ তাপমাত্রা সহ রোগটি আত্মপ্রকাশ  করে প্রাণীটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, খাবারে অরুচি আসে, কিন্তু তৃষ্ণার্ত থাকে গিলতে অসুবিধা হয় আর মুখ থেকে দুর্গন্ধ বেরোয় 

রোদ না লাগিয়ে উপযুক্ত যত্নে রাখা দরকার প্রাণী চিকিত্সকের সাহায্য নেওয়া উচিত 

৭)

ভেড়ের বসন্ত

ছোঁয়াচে রোগ, প্রায়ই দেখা যায়

সুস্থ্য ও আক্রান্ত ভেড়াদের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় উচ্চ তাপমাত্রা, চোখ ও নাক থেকে স্রাব বের হওয়া, মুখ থেকে লাল ঝরা, খাদ্যে অরুচি এবং চলার অক্ষমতা যে অঞ্চলে রোগ দ্রুত ছড়ায় সেখানে রোগটি খুব তীব্র এবং মৃত্যুর হার বেশী হতে পারে

চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া দরকার আক্রান্ত ভেড়াকে মাঠে ছাড়া উচিত নয় মৃত ভেড়াকে চুন মাখিয়ে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হয়

৮)

পেস্টেডেজ পেটিটস রুমিন্যান্টস (পি. পি. আর.)

ভেড়া ও ছাগলের একটি মারাত্মক ভাইরাস ঘটিত রোগ

উচ্চ তাপমাত্রা এবং নাক দিয়ে সর্দি ঝরা দিয়ে সূচনা, যা পরে আরও প্রকট হয় এবং শেষে পাতলা পায়খানা হয় সাধারণতঃ নিউমোনিয়ার ফলে মারা যায়

 

 

                                                                                                                             

ভেড়াজাত পণ্য দ্রব্য

ভেড়া থেকে যেসব অর্থকরী পণ্যদ্রব্য উত্পাদিত হয় তা হল -

(ক)     লোম

(খ)     মাংস

(গ)     ছাল বা চামড়া

(ঘ)     অন্ত্র

(ক)    লোম

বিভিন্ন জাতের ভেড়ার লোমের মান বিভিন্ন হয় একই ভেড়ার দেহের লোমের মানও বিভিন্ন হতে পারে, এমনকি একই ভেড়ার দেহের বিভিন্ন অঞ্চলের লোমের মানের পার্থক্য থাকে

সাধারণতঃ উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি ভেড়াদের লোমের মান সবচেয়ে উত্কৃষ্ট হয় এদের লোমের দৈর্ঘ্য ৫.৫-৬ সে.মি. পর্যন্ত হয় খুবই সুক্ষ্ম হয়, পরিধি মাত্র ২৫-২৮ মাইক্রণ মডিউলেশন শতকরা মাত্র ২৬

শুষ্ক উত্তর পূর্বাঞ্চলের ভেড়াদের লোম অপেক্ষাকৃত কম সুক্ষ্ম হয় এদের লোমের পরিধি ৩৫-৫০ মাইক্রণ হয়ে থাকে মডিউলেশন শতকরা ৩০-৮০

         প্রকৃতি, পরিবেশ এবং যত্ন নেওয়ার ওপরে ভেড়ার লোমের মান নির্ভর করে

যেহেতু ভেড়ার লোম বিদেশে রপ্তানি হয়, তাই ভারত সরকার লোমের গুণগত মানের ওপর আগমার্কা পদ্ধতি চালু করেছে

(খ)    মাংস

সমস্ত ধর্মের মানুষ ভেড়ার মাংস খায় এর গ্রহণ যোজ্যতা খুবই বেশী বিশ্বের নানান দেশে ভেড়ার মাংস রপ্তানি হয়ে থাকে

(গ)    ছাল বা চামড়া

ভেড়ার ছাল যেমন দেশে প্রচুর ব্যহৃত হয় তেমনই এর রপ্তানির পরিমানও ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে

(ঘ)    অন্ত্র

ভেড়ার অন্ত্রগুলিরও পণ্য হিসাবে যথেষ্ট মূল্যবান এর থেকে কেসিং প্রস্তুত হয় এই কেসিং সসেজ নামক মাংসজাত দ্রব্যের প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়,   এটা সসেজের বাইরের আবরণ হিসাবে কাজ করে

                                                                                                                             

 

নমুনা প্রকল্প

ভেড়া পালন

(৫০ টি মাদি ও ৬টি মদ্দা)

স্থায়ী মুলধন

টাকা

ঘর তৈরি - প্রতিটি প্রাণীর জন্য ৮ বর্গফুট (৫০ টাকা বর্গফুট)

২২,৪০০

বাচ্চাদের ঘর তৈরি- প্রতিটি বাচ্চার জন্য ৪ বর্গফুট হিসাবে ১৩০টি বাচ্চার জন্য (২০ টাকা বর্গফুট হারে)

১০,৪০০

প্রাণী ক্রয়- ৬কেজি প্রতি প্রাণী (৭৫ টাকা প্রতি কেজি হারে)

২৫,২০০

আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি

২,০০০

বীমা, ওষুধ ও টিকা

২০০

মোট (ক)

৬০,২০০

অথবা

৬০,০০০

 
 

(খ) কার্যকরী মূলধন

টাকা

খাদ্য বাবদ (২ মাসের জন্য) প্রাণীপিছু প্রতিদিন ২০০ গ্রাম ৬,০০০
মোট প্রকল্প ব্যয় (ক+খ) ৬৬,০০০
 

এক বছরের আয় ও ব্যয়

(ক) আয়

দুধ বিক্রি- ৬ মাসের জন্য ৫০ টি প্রাণী থেকে ১২ টাকা কেজি দরে প্রতিদিন ০.২৫ কেজি

২৭,৩০০

বাচ্চা বিক্রি- ৬ মাসে ৯ কেজি ওজনের প্রতিটি বাচ্চা ৯০ টাকা প্রতি কেজি (১০০টার মধ্যে ১০টি প্রাণী হিসাবে রাখতে হবে)

৭২,৯০০

প্রকল্প মূলধনের ১০% বিক্রি প্রতিটি প্রাণী ১২ কেজি করে

১০,৮০০

মোট

১,১১,০০০

 
(খ) ব্যয়
 

(১) খাদ্য বাবদ

টাকা

(ক) সবুজ ঘাস প্রাণীপিছু প্রতিদিন ৪ কেজি করে (০.১৫ টাকা দরে) ১২,২৬৪
(খ) সুষম খাদ্য প্রাণীপিছু প্রতিদিন ২০০ গ্রাম করে (৭ টাকা দরে) ৫,৪০০
(গ) ৬ মাসের জন্য ১০০টি  বাচ্চাপিছু প্রতিদিন ২ কেজি করে ১২,৬০০
(২) ওষুধ- প্রাণীপিছু ৩০ টাকা করে ১,৬৮০
(৩) অন্যান্য খরচ ৬০০
মোট ৬১,১৬০
বাত্সরিক নিট আয় (ক-খ) ৪৯,৮৪০
মাসিক নিট আয় ৪,১৫০