বিলে মাছ চাষ

 

বিল

বিল বাস্তুতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

বদ্ধ বিলে মাছ চাষের পদ্ধতি

বিলে মাছ চাষের কিছু প্রাথমিক নির্দেশিকা

 

বিল

বিল বা বাওর এক ধরণের প্রাকৃতিক জলাশয়׀ এরা আয়তনে খুবই বড় হয়׀ পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বিল আছে- কোন কোন জায়গায় এরা ছড়া বলে পরিচিত স্থানীয় নামে׀  বিহার, উত্তরপ্রদেশ, আসাম ও মনিপুরেও এই ধরনের জলাশয় রয়েছে׀ সাধারণত দুধরনের বিল দেখা যায়- ১) উন্মুক্ত (OPEN) এবং ২) বদ্ধ (CLOSED)׀

উন্মুক্ত বিল (Open Beel)

নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এই বিলগুলির সৃষ্টি হয়׀ কোন নালার মাধ্যমে নদীর সঙ্গে যোগাযোগ থেকে যায় এবং বর্ষার সময়ে এই ধরণের বিলগুলোতে নদীর জল প্রবেশ করার ফলে প্রচুর মাছ ও চারাপোনা ঢুকে পড়ে׀ এইভাবে উন্মুক্ত বিলগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে মত্স্য সম্পদে ভরে ওঠে׀

 

বদ্ধ বিল (Closed Beel)

এই ধরণের বিল গুলোর সঙ্গে নদীর প্রায় কোন সংযোগ থাকে না׀  নদী ও বিলের সংযোগস্থলে ক্রমশ পলি জমা হয়ে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়׀  ব্যাপক বন্যা ছাড়া এইসব বিলে নদী থেকে জল ঢোকার সম্ভাবনা থাকে না׀  

বিল বাস্তুতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

১) বিলে প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিদজাত পুষ্টিকর উপাদান থাকে এবং মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের       অফুরন্ত ভান্ডার׀

২) জলের গভীরতা কম থাকায় প্রচুর পরিমান ঝাঁঝি (Hydrilla sp)   পাতা ঝাঁঝি (Vallisneria sp), নাজাম (Najas sp)  প্রভৃতি নিমজ্জিত উদ্ভিদ থাকে׀  এছাড়া মুক্ত ভাসমান কচুরীপানা (Eichornia sp) টোপা পানা (Pistia sp), আজোলা (Azolla sp) প্রভৃতি জন্মায়׀  এই সমস্ত বড়  জলজ উদ্ভিদগুলোকে "ম্যাক্রোফাইট" (Macrophyte) বলে׀  এই ম্যাক্রোফাইটগুলো বিলের মাটি ও জলের পুষ্টিকর উপাদানগুলো গ্রহন করে নিজেদের দেহে আবদ্ধ করে রাখে׀  এই উদ্ভিদগুলো মরে গিয়ে পচে যাওয়ার পর পুষ্টিকর উপাদানগুলো মুক্ত হয়׀

৩) বিলের আদর্শ পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যতার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদকূল ও প্রাণীকূল বসবাস ও বংশবৃদ্ধি করে׀  এছাড়া পরিযায়ী পাখীরাও বিলের পরিবেশের প্রতি আকৃষ্ট হয়׀

৪) বিলে সাধারণত কই, মাগুর, শিঙ্গি, শোল, বোয়াল, চিতল, ফলুই, ট্যাংরা বা পুঁটি, মৌরলা প্রভৃতি মাছের আঁতুর ঘর ও লালনক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়׀

বদ্ধ বিলে মাছ চাষের পদ্ধতি

বদ্ধ বিলে পুষ্টিকর উপাদান ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য প্রচুর পরিমাণে মজুত থাকার জন্য মাছের বৃদ্ধি ভাল হয়׀  এছাড়া বদ্ধ বিল যেহেতু নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে না তাই বিল থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়া কিংবা নদী থেকে অবাঞ্ছিত মাছ প্রবেশ করতে পারে না׀  এই সমস্ত সুবিধা থাকার জন্য বিলে মাছ চাষ করে মাছের উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব׀  যদিও বিলে মাছ চাষের জন্য নির্দিষ্ট কোন বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা নেই׀  এর কারণ বিভিন্ন বিলে বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে׀  সাধারণত বিল ফিশারিতে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যবধানে চারাপোনা ছাড়া হয় এবং একটি নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তর বড় মাছগুলো ধরে নিয়ে বাজার জাত করা হয়׀  ইংরাজীতে একে multiple stocking এবং multiple harvesting বলা হয়׀  বিলে কত সংখ্যক মাছ ছাড়তে হবে সে সম্পর্কে কোন সুনির্দ্দিষ্ট তথ্য নেই׀  তথাপি নিম্নলিখিত অবস্থাগুলোর উপর ভিত্তি করে মাছ ছাড়া উচিত

ক) প্রথমেই নজর দিতে হবে বিলের জল ধারণ ক্ষমতা এবং বছরের কত সময় কি পরিমাণ জল থাকে׀

খ) বিলে প্রাকৃতিক খাদ্যকণার পরিমাণ কত অর্থাত সেচি ডিস্কের মাধ্যমে জলের স্বচ্ছতা বা প্রাকৃতিক খাদ্যকণার ঘনত্ব নির্ধারণ করতে হবে׀

গ) ফাইটোপ্ল্যাক্টটনের প্রাচুর্যতা ও জলে নিমজ্জিত ম্যাক্রোফাইটের পরিমানের উপর ভিত্তি করে সঠিক প্রজাতির চারা পোনা নির্বাচন করতে হবে׀

ঘ) বিলে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকার আমাছা (পুঁটি, মৌরলা, কই, চাঁদা প্রভৃতি) এবং শিকারী মাছেদের (শোল, শাল, বোয়াল প্রভৃতি) উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে চারা পোনা ছাড়ার সংখ্যা এবং চারা পোনার মাপ নির্ধারন করা দরকার׀

বিলে মাছ চাষের কিছু প্রাথমিক নির্দেশিকা

১) বড় বড় জলজ আগাছা (ম্যাক্রোফাইট) নিয়ন্ত্রণ׀

২) অবাঞ্ছিত মাছ ও শিকারী মাছ অপসারণ׀

৩) চুন প্রয়োগ-  ৪০-৫০ কিগ্রা / হেক্টার চুন প্রয়োগ করা দরকার׀  এরপর প্রতি মাসে দুটো কিস্তিতে (প্রতি কিস্তি ১৫-২০ কিগ্রা) চুন দেওয়া যেতে পারে׀

৪) সার প্রয়োগ- সাধারনভাবে বিলে জৈব বা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করার দরকার নেই׀

৫) বিলে চারাপোনা মজুত-  ১২-১৫ সেমি দৈর্ঘ্যযুক্ত মাছ ছাড়া দরকার׀  কারন এর চেয়ে ছোট মাছ ছাড়লে শিকারী মাছ এদের খেয়ে ফেলবে׀  ১২-১৫ সেমি সাইজের ৪০০০-৫০০০ প্রতি হেক্টরে চারাপোনা ছাড়া যেতে পারে׀

৬) নিয়মিত ব্যবধানে জাল টানা׀

৭) মাছ আহরন- সাধারণভাবে মাল্টিপল স্টকিং ও মাল্টিপল হার্ভেস্টিং পদ্ধতি অনুসরণ করা ভাল׀  অর্থাত মাছের ওজন ৩০০-৫০০ গ্রাম হয়ে গেলেই তাদেরকে তুলে বেচে দিয়ে আবার মাছ ছাড়তে হবে׀

৮) বিলে মাছের উত্পাদন-  ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষন ও পরিচর্যা করলে বিলে বছরে হেক্টর প্রতি ১৫০০-১৮০০ কিগ্রা মাছ উত্পন্ন করা সম্ভব׀